রক্তিম মিত্র
রবীন্দ্র সদনে সেদিন যাঁর ভিড় করেছিলেন, তাঁরা আসলে কারা? কেউ কেউ সত্যিই তসলিমা নাসরিনের অনুরাগী। কেউ কেউ মুক্তচিন্তার সমর্থক। কেউ কেউ সত্যিই সেদিন তসলিমাকে স্বাগত জানাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু জয় গোস্বামীর নাম শুনে যারা রে রে করে তেড়ে উঠলেন, তাঁরা আসলে কারা?
বলার চেষ্টা হচ্ছে, তাঁরা নাকি রাষ্ট্রবাদী। তাঁরা নাকি প্রতিবাদী। সত্যি, রাষ্ট্রবাদী, প্রতিবাদী এই শব্দগুলোর কি চমৎকার অপব্যবহার। যার তার নামের পাশে কী অবলীলায় এই শব্দ দুটো জুড়ে দেওয়া যাচ্ছে। একটা নির্লজ্জ অসভ্যতাকে আড়াল করতে কত মিথ্যে বাহানা দিতে হচ্ছে। ঘুরিয়ে পেচিয়ে না বলাই ভালো। এদের সঙ্গে সাহিত্যের ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। এরা না তসলিমার অনুরাগী, না মুক্তচিন্তার সমর্থক। বাংলাদেশ থেকে যাঁরা তসলিমাকে বিতাড়ন করেছেন, তাঁদের সঙ্গে এই অর্বাচীনদের কোনও ফারাক নেই।
অবশ্য জয় গোস্বামীর কবিতা পড়তে এবং বুঝতে যে শিক্ষা ও মনন প্রয়োজন, তার থেকে এরা আলোকবর্ষ দূরে। এরা কবিকে হেনস্থা করেই আনন্দ পান। এরা শুধু রবীন্দ্র সদনে ছিলেন এমন ভাবার কারণ নেই। জেলায় জেলায়, নানা রাজ্যে এরা ছড়িয়ে আছেন। যারা মোবাইলে বাংলার অগ্রগণ্য কবির হেনস্থা দেখে এক বিকৃত আনন্দে গা ভাসাচ্ছেন।
জয় গোস্বামীর অপরাধটা কোথায়? কয়েক বছর ধরেই জয় গোস্বামী খুব সফট টার্গেট। কবির নামে যা খুশি বলা যায়। কবি পাল্টা মার দিতে আসবেন না। কবি ঘরে আগুন ধরাতে আসবেন না। কবি কারও দিকে ঢিল ছুড়বেন না। এমনকি এই নিরীহ কবি সোশ্যাল মিডিয়ায় পাল্টা বাক্যবানও নিক্ষেপ করবেন না। সব অপমান নীরবে হজম করবেন।
তাঁকে সরকারি কয়েকটা অনুষ্ঠানে দেখা গেছে। এক দুটি কমিটিতেও ছিলেন। হাতে গোনা কয়েকটা প্রতিবাদ সভায় হয়তো উপস্থিত থাকতে হয়েছে। জোর করে হাতে মাইক ধরিয়ে দিলে দু চার কথা বলতেও হয়েছে। ব্যাস, এটাই তার অপরাধ। কেউ আখ্যা দিচ্ছেন তৃণমূলের চটি চাটা। কেউ বলে বসেছেন মমতার দালাল। কেউ বলেছেন ক্ষমতার উচ্ছিষ্টভোগী। যার মুখে যা এসেছে, সেটাই বলেছেন। কবি কোনও পাল্টা প্রত্যুত্তর করেননি। এই ভদ্রতার সুযোগ নিয়েছেন একদল মানুষ। এদের কেউ কেউ জয় শ্রীরাম বলেন, কেউ কেউ মোদির নামে জয়ধ্বনি তোলেন। আবার কেউ কেউ ইনক্লাব জিন্দাবাদও বলেন।
তিনি নাকি তৃণমূলের সমর্থক। তর্কের খাতিরে না হয় ধরেই নিলাম। কিন্তু তৃণমূলের কোন দুর্নীতির সঙ্গে এই মানুষটি যুক্ত? তিনি তৃণমূলের টিকেটে এমপি বা এম এল এ হয়েছেন? তৃণমূলের টিকিট পাওয়ার জন্য কখনও তাকে লালায়িত মনে হয়েছে? তিনি অন্য দলের বিধায়ক বা পঞ্চায়েত সদস্যদের দল ভাঙ্গিয়ে তৃণমূল এনেছেন? তিনি বিভিন্ন জেলা থেকে টাকা তুলে মেধা তালিকাকে ডাস্টবিনে ফেলে অযোগ্য লোককে চাকরি দিয়েছেন? বিরোধীদের হুংকার দিয়েছেন? মিথ্যে মামলায় জেল খাটিয়েছেন? কখনও বিরোধী দলের কারও নামে কদর্য আক্রমণ করেছেন? এসবের কোনওটাই তো করেননি। তাহলে তাঁর নামে এত ঘৃণা, এত বিদ্বেষ কেন?
কোনও কোনও ইস্যুতে হয়তো তৃণমূলের সমর্থনে মৃদু স্বরে কথা বলেছেন। তার জন্য তাঁকে এত গালাগাল শুনতে হয়। তাহলে তো শুভেন্দু অধিকারী কেও একই কারণে এর ১০০০ গুন বেশি ধিক্কার দেওয়া উচিত। তিনি তো আরও চড়া সুরে তৃণমূলের দালালি করেছেন। প্রতিটি অপকর্মে শুধু শামিল ছিলেন তাই নয়, কার্যত নেতৃত্ব দিয়েছে। এত বছর এমপি, এমএলএ, মন্ত্রী থেকেছেন। অন্যের দল ভাঙ্গিয়েছেন। মিথ্যে মামলায় বিরোধীদের জেল খাটিয়েছেন। জেলায় জেলায় প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে হুংকার দিয়েছেন। বিভিন্ন জেলা থেকে নানা অনিয়মেও তার নাম জড়িয়েছিল। নিজের হাতে ঘুষ নেওয়ার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি। ঘটনাচক্রে আজ তিনি অন্য শিবিরে। তাতে অতীতের অপরাধ মাফ হয়ে যায় না। তাঁর বক্তৃতায় হাততালি দেবেন, তাঁর নামে জয়ধ্বনি দেবেন, আর জয় গোস্বামীকে দেখলে রে রে করে তেড়ে উঠবেন, এ কেমন যুক্তি?
তসলিমার আগে বিজেপির যে দুই মাতব্বর ধর্মীয় উস্কানি ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে গেলেন, তাঁদের নামে ধিক্কার দেওয়ার কথা এই দর্শকদের মনে পড়েনি। তাঁরা বেছে নিলেন এমন এক কবিকে যিনি সম্প্রীতির কথা বলেন। যিনি ধর্মীয় উস্কানি থেকে দূরে থাকেন। জয় গোস্বামী প্রতিবাদ করেননি? তাঁর লেখা কতটুকু পড়েছেন? তাঁর একটি উপন্যাস, একটি প্রবন্ধ কোনও দিন পড়ার প্রয়োজন মনে করেছেন? অবশ্য এগুলো পড়তে গেলে যে শিক্ষার রুচি ও মনোন য় প্রয়োজন, তা এই অর্বাচীনদের নেই।
ধন্যবাদ তাসলিমা। এই উন্মত্ত জনতার কদর্য চিৎকারে তিনি অন্তত শামিল হননি। বিষয়টা যে অপমানজনক, স্পষ্ট ভাষায় তিনি সেটা বলেছেন। তসলিমা সত্যিই সাহসী। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা অনেকটাই বেড়ে গেল। আর যাঁরা তাঁকে বরণ করে নেওয়ার নাটক করলেন, তাঁরা কখনই সাহিত্যের বা মুক্ত চিন্তার সমর্থক হতে পারেন না।, তা আরও একবার বুঝিয়ে দিলেন। বাংলাদেশের সেই ফতোয়া দেওয়া লোকেরা যদি মৌলবাদী হয়ে থাকেন, তবে জয় গোস্বামীকে অপমান করা এই অর্বাচীনরাও কোনও অংশে কম মৌলবাদী নন।
