স্বরূপ গোস্বামী
বিধানসভায় আবার যেন রণাং দেহি মূর্তি। একটি বিল আনতে গিয়ে যথারীতি সেই চিৎকারেরই আশ্রয় নিলেন মুখ্যমন্ত্রী। গুন্ডা দমন বিলের ক্ষেত্রে তার শরীরের ভাষা যেমন, শিক্ষা সংক্রান্ত বিলের ক্ষেত্রেও শরীরী ভাষা সেই একই রকম। জনসভার ভাষণ আর বিধানসভার ভাষনের মধ্যে যে একটা মৌলিক পার্থক্য আছে, মুখ্যমন্ত্রী মাঝে মাঝেই সেটা ভুলে যাচ্ছেন।
একটি সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী? যিনি দায়িত্বশীল মন্ত্রী, তাঁর কাছে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো নিজের দপ্তরের অনিয়ম যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা। সরকারের ভেতর থেকে যে দুর্নীতির পরিসর তৈরি হয়, তাকে যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণ করা। সারাক্ষণ আগের সরকার কী করে গেছে, সেটা নিয়ে যারা তোপ দেগে যান, তারা প্রশাসনের অ আ ক খ টুকু এখনও বুঝে উঠতে পারেননি, এটুকু বোঝা যায়। অন্যদের গালমন্দ করা সবচেয়ে সহজ কাজ। আসলে এই সব শাসকরা ভুলে যান শুধু আগের সরকারকে গালমন্দ করার জন্য তাঁদের ক্ষমতায় আনা হয়নি। সরকার চালাতে গেলে ন্যূনতম কিছু দায়িত্ব পালন করতে হয়। সেই দায়িত্বের কথা ভুলে গিয়ে যাঁরা সারাক্ষণ অন্যকে গালমন্দ করেন, তাঁরা আসলে বুঝিয়ে দেন শাসকের চেয়ারে বসার যোগ্যতা তাঁদের নেই।
দিনের পর দিন মুখ্যমন্ত্রী ঠিক সেটাই করে চলেছেন। এমনিতেই বিধানসভার ভেতর বিরোধীদের শক্তি বলতে তেমন কিছু নেই। যাদের মূল বিরোধী দল হিসেবে সরকার দেখাতে চাইছে, তারা যে বকলেস পরা পোষা বিরোধী, এটা এতদিনে দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার। বাকি যে কয়েকজন মৃদু বিরোধিতা করছেন, তাঁদের উপস্থিতি সত্যিই নগণ্য। কিন্তু সেই সামান্য বিরোধীতা কেও এত ভয় পাচ্ছেন কেন?
একটা সরকারকে মিডিয়ার দিক থেকে যে যে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়, তার পাঁচ শতাংশও এই সরকারকে হজম করতে হয় না। অধিকাংশ মূলস্রোত মিডিয়া আগে থেকেই নতজানু। সমাজ মাধ্যমের পরিসর ইতিমধ্যেই শাসকের দখলে। বিরোধী কণ্ঠস্বর দমনের ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা আগের মতই নিন্দনীয়। শাসক হওয়া যে যার তার কম্ম নয়, সেটাও দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার।
শাসক যদি সারাক্ষণ ঘৃণা ছড়ায়, তবে সেই শাসক জঙ্গির চেয়েও নিন্দনীয়। তাদের মুখে আর যাই হোক দেশপ্রেম রাষ্ট্রবাদ এই কথাগুলো একেবারেই বেমানান। দেশদ্রোহী খুঁজতে গেলে অন্য কোথাও যেতে হবে না। এই দেশের ঐতিহ্য ও পরম্পরার প্রতি যদি ন্যূনতম শ্রদ্ধা থাকে, যদি ন্যূনতম পড়াশোনাটুকু থাকে, তাহলে আয়নার সামনে দাঁড়ালেই দেখতে পাবেন এই দেশকে প্রতিনিয়ত অপদস্থ করার ক্ষেত্রে আপনাদের ভূমিকা সব থেকে বেশি।

কাকে বলে দেশপ্রেম?
একের পর এক কারখানায় লাল বাতি জ্বালিয়ে দেওয়া নেতা জ্যোতি বসু দেশপ্রেমিক ছিলেন!
পৈতৃক অর্থে বিলেতে পড়তে গিয়ে ব্যর্থ হওয়া একজন নেতা, যখন পার্টির অন্য কমরেডরা পুলিশের মার খাচ্ছেন তখন বিধান রায়ের ছত্রছায়ায় রাজভবনের আতিথ্য গ্রহণ করে হুইস্কিতে চুমুক দেওয়া নেতা জ্যোতি বসু দেশপ্রেমিক ছিলেন!
পাকিস্তানের মতো একটা ব্যাঙাচি দেশের পাঠানো বোমার ঘায়ে মানুষ যখন প্রাণ হারাচ্ছিল, তখন সেই টেররিস্ট পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রাখার পক্ষে সওয়াল করা সীতারাম ইয়েচুরি, রাহুল গান্ধীদের মতো নেতারাও দেশপ্রেমিক ছিলেন!
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও দেশপ্রেমিক ছিলেন!
অবশ্য, পশ্চিমবঙ্গকে বছরের পর বছর পিছিয়ে পড়তে দেখেই যাঁরা বড় হয়ে উঠেছেন, তাঁদের কাছে এর চেয়ে বেশি কিছু প্রত্যাশা রাখাটাও বোকামি।