স্বরূপ গোস্বামী
যখনই কারও হাতে তৃণমূলের পতাকা তুলে দেওয়া হত, তখন মুকুল রায়ের কণ্ঠে সেই চেনা সংলাপ শোনা যেত— ‘মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে রাজ্যে যে বিশাল উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে, তাতে সামিল হতেই সবাই তৃণমূলে যোগ দিচ্ছেন।’
কয়েক বছর পর কথাটা আর মুকুল রায়কে বলতে হত না। ততদিনে সংলাপটা সবার মুখস্থই হয়ে গিয়েছিল। যাঁরা যোগ দিতে আসতেন, তাঁরা জানতেন, কী বলতে হবে। তাঁরা সেই বুলিই আওড়াতেন। ‘বিরোধী দলে থেকে কাজ করতে পারছি না। তাই উন্নয়নে সামিল হতে চাই।’
সেই মুকুল রায় নেই, কিন্তু প্রবাদটা থেকে গেছে। মমতা ব্যানার্জি আছেন ঠিকই, কিন্তু ক্ষমতার বৃত্ত থেকে অনেক দূরে। হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাড়িতে বসে নিশ্চয় মাঝে মাঝে টিভি চালান। হাতে থাকা ফোনেও অনেক ভিডিও চলে আসে। তিনি নিশ্চয় দেখছেন, তিনি যা যা করতেন, নতুন মুখ্যমন্ত্রীও কী সুন্দর তাঁকেই অনুসরণ করছেন। এমন ছাত্র তৈরি করেছেন, গর্ব করতেই পারেন।
নন্দীগ্রামে তৃণমূলের প্রার্থী ছিলেন সঞ্চিতা প্রধান দে। তিনি মনোনয়ন জমা করলেন। প্রচারও শুরু করে দিলেন। এই পরিস্থিতিতে নন্দীগ্রামে তৃণমূল যে জেতার মতো জায়গায় নেই, বিজেপি বিরাট ব্যবধানে জিতবে, এটা সবাই জানে। এটা বোঝার জন্য কোনও রাজনৈতিক বোদ্ধা হওয়ার দরকার নেই। কিন্তু অবাক করল একটি ছবি। মুখ্যমন্ত্রীর উল্টোদিকে বসে আছেন সেই তৃণমূলের প্রার্থী ও তাঁর স্বামী। এবং জানা গেল, তাঁরা মনোনয়ন তুলে নিচ্ছেন। এবং যথারীতি, লড়াই থেকে সরে দাঁড়ালেন।
কিন্তু প্রশ্ন হল, এমন সিদ্ধান্ত তাঁকে কেন নিতে হল? ভোটে দাঁড়ানোর পর হঠাৎ করে কি তাঁর মনে হল, শুভেন্দু অধিকারী খুব ভাল লোক, আর মমতা ব্যানার্জি খুব খারাপ? আগের সরকারও পুলিশকে খুব নগ্নভাবে দলীয় কাজে লাগাত। এই সরকারও তার ব্যতিক্রম নয়। এই আমলেও পুলিশ শাসকের হুকুম তামিল করা পেয়াদা ছাড়া আর কিছুই নয়।
সহজ কথাটা সহজে বলাই ভাল। সঞ্চিতা নিজের ইচ্ছেয় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে আসেননি। তাঁকে আনা হয়েছে। লোভ দেখিয়েও হতে পারে। ভয় দেখিয়েও হতে পারে। আগামীদিনে তাঁর কী পুনর্বাসন হচ্ছে, সেটা দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। এবং নিশ্চিত থাকা যায়, এর জন্য বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে না। খুব দ্রুতই সঞ্চিতা এই ‘পুরস্কার’ পেয়ে যাবেন।
কেউ কেউ এটাকে কৌশল হিসেবে দেখতে চাইছেন। কেউ কেউ শুভেন্দুর বাজিমাত হিসেবেও দেখাতে চাইছেন। কেউ কেউ বোঝাতে চাইছেন, মমতা কতটা অসহায়। নিজের প্রার্থীও তাঁর কথা শুনছেন না।
মমতা কী করলেন? তাঁর প্রার্থী লড়াই থেকে সরে গেছেন। এই অবস্থায় কিছুটা বাধ্য হয়েই কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থন করলেন। এবার কী দেখা গেল? সেই কংগ্রেস প্রার্থীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করল। তাঁর নামে নাকি প্রায় ১৮ বছর আগে একটি মামলা রয়েছে। এমন মামলা তো অনেকের নামেই রয়েছে। স্বয়ং মুখ্যম্ত্রীর নামেও অন্তত পঁচিশখানা মামলা রয়েছে। হঠাৎ, কংগ্রেস প্রার্থীর নামে পুরনো মামলার কথা মনে পড়ল? তিনি তো ফেরার ছিলেন না। গত চার মাসে পুলিশ ধরেনি কেন? সেই পুরনো প্রবাদটা মনে পড়ছে, দুরাত্মার ছলের অভাব হয় না।
যেভাবেই হোক, শাসকের জয়গান করতে হবে। তার হাজারটা খারাপ কাজকেও তারিফ করতে হবে। আগের সরকারের মতো এই সরকারের আমলেও এটাই ধ্রুব সত্য। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী বিপক্ষ দলের প্রার্থীকে প্রার্থীপদ থেকে সরিয়ে দিচ্ছেন। তারপর হুঙ্কার দিচ্ছেন, ‘কী করে ভোট করাতে হয়, আমি জানি।’
মমতা সত্যিই হয়তো অসহায়। কিন্তু তার থেকেও অনেক বেশি অসহায় মনে হল বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীকে। পরিষ্কার করে বলা দরকার, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহারই করলেন। কোনও কৌশল নয়। নিজের চেয়ারকে কলঙ্কিতই করলেন। বিপক্ষ প্রার্থীকে লোভই দেখান, আর ভয়ই দেখান, দুটোই সমান নিন্দনীয়। এর বাইরে তৃতীয় কিছু ঘটেনি। একজন মুখ্যমন্ত্রীর মর্যাদা এতে একফোঁটাও বাড়ল না। বরং অনেকটাই নেমে গেল।
গত পাঁচ বছরে যেভাবে লড়াই করেছেন, সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। বেশ কিছু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু বেশ কিছু ঘটনায় বুঝিয়ে দিচ্ছেন, দলীয় সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে তিনি উঠতে পারছেন না। ইতিহাস বারবার পরীক্ষা নিয়ে যায়। সেই পরীক্ষায় মাঝে মাঝেই তিনি ডাঁহা ফেল করে যাচ্ছেন। নন্দীগ্রাম উপনির্বাচন ছিল তেমনই এক পরীক্ষা। হয়তো বিরাট ব্যবধানে বিজেপি জিতবে। কিন্তু সেটা মোটেই সাফল্য নয়। ক্ষমতার অবপ্যবহার করে একজন বিপক্ষ প্রার্থীকে লড়াই থেকে সরিয়ে দিলেন। অন্য এক বিরোধী প্রার্থীকে আঠারো বছরের পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার করালেন। ভোট এবার কেমন হবে, সেটা বোঝাই যাচ্ছে।
বিরাট ব্যবধানে বিজেপি জিতবে। মুখ্যমন্ত্রী আবার হুঙ্কার ছাড়বেন। সেদিন তাঁকে আরও বেশি করে অসহায় মনে হবে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিজের এলাকায় তিনি একটা ভয়মুক্ত ভোট করাতে পারলেন না। এটা কতবড় কলঙ্ক, এটা বোঝার ক্ষমতাও তিনি হারিয়ে ফেলেছেন।
