রক্তিম মিত্র
সেই বাম জমানার কথা। পাতিপুকুর রেল লাইনের ধারে পাওয়া গেল রিজওয়ানুর রহমানের দেহ। আত্মহত্যা নাকি খুন, তা নিয়ে উত্তাল হয়ে উঠল বঙ্গ রাজনীতি। যদি আত্মহত্যা হয়, তবে প্ররোচনা কার? পদত্যাগ করতে হল পুলিশ কমিশনারকে। সরকারের বিরুদ্ধে ছড়িয়ে দেওয়া হল তীব্র ঘৃণা। ভাবখানা এমন যেন, স্বয়ং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যই খুন করিয়েছেন। তৃণমূলের বিভিন্ন সভায় নিয়ম করা বক্তৃতা করানো হল রিজওয়ানুরের মাকে। দাদা রুকবানুরকে দেওয়া হল বিধানসভার টিকিট। পরপর তিনবার তিনি নদিয়ার চাপড়া থেকে বিধায়কও হলেন।
পনের বছর পেরিয়ে গেল। খুন না আত্মহত্যা, আজও জানা গেল না। কিন্তু যাঁদের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ! অভিযুক্ত পুলিশরা পেলেন প্রোমোশন। অভিযুক্ত নেতা হয়ে গেলেন ক্যাবিনেট মন্ত্রী। মেয়ের বাবা হয়ে গেলেন তৃণমূলের মারওয়াড়ি সেলের সভাপতি।
রিজওয়ানের মায়ের খবর অনেকদিন পাই না। সেই কিসোয়ার জাহান বেঁচে আছেন কিনা, তাও জানা নেই। তবে সরকার পাল্টাতেই দেখা গেল যে যাঁর মতো পাল্টে গেছেন। সেই অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা এবারও জিতেছেন। তবে শিবির বদলে ফেলেছেন। মমতার ছবি আর টাঙান না। সেই ব্যবসায়ী ঘটা করে নতুন কারখানা চালু করলেন। সাড়ম্বরে উদ্বোধন করে এলেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী।
বছর দুই আগের কথা। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে প্রাণ হারালেন এক চিকিৎসক। সেই অভয়ার ন্যয়বিচারের দাবিতে কত সভা, কত মিছিল। তদন্ত গেল সিবিআই–এর হাতে। দু’বছর পর নিট ফল কার্যত শূন্য। রাজ্য সরকার ধামাচাপা দিয়ে যে তত্ত্ব হাজির করেছিল, সিবিআই–ও যেন তারই জেরক্স কপি জমা দিল। কারা আসল মাথা, সেদিকে হাত বাড়ানো তো দূরে থাক, তদন্তকে যতটা বিপথে চালানো যায়, সিবিআই ঠিক সেটাই করল। আদালত বারবার ভর্ৎসনা করেছে। টনক নড়েনি। আর দশটা দুর্নীতির মামলায় সিবিআই যেমন অশ্বডিম্ব প্রসব করেছিল, এক্ষেত্রেও তাই। তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে তারা কতটা ব্যর্থ ও অপদার্থ, সেই ধারাবাহিকতা যথারীতি বজায় রেখেছে সিবিআই।
কিন্তু আবার আসরে এক ‘মা’। অভয়ার মা দাঁড়িয়ে পড়লেন নির্বাচনে। যে সিবিআই তাঁর মেয়ের হত্যা রহস্যকে প্রহসনে পরিণত করেছে, সেই সিবিআই–কে যারা চালায়, সেই শাসক দলের হয়েই। সহানুভূতির হাওয়ায় জিতেও গেলেন। রাজ্য সরকারও শুরুতে দেখাল, তারা বিরাট তৎপর। কিন্তু প্রায় পাঁচ মাস হতে চলল। ন্যয়বিচার তো দূরের কথা, তার ধারেকাছেও পৌঁছোতে পারেনি সিবিআই। আসলে, অভয়ার মায়ের হাতে বিধায়ক নামক ললিপপ ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সিবিআই যাই করুক, তাঁর মুখে কুলুপ পড়েই গেছে।
এবার আরও এক ‘মা’। শুভেন্দু অধিকারীর আপ্ত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথের মা। ভোটের ফল বেরোনোর দুদিনের মাথায় খুন হলেন চন্দ্রনাথ। চার মাস পেরিয়ে গেল। এবারও তদন্তে সিবিআই। কয়কেটা সুপারি কিলার, ভিন রাজ্য থেকে কয়েকজন ভাড়াটে খুনি ধরপাকড় হল। কিন্তু আসল মাথা কে, তা এখনও বেশ ধোঁয়াটে। কেনই বা খুন, তাও পরিষ্কার নয়।
এক্ষেত্রে অবশ্য সিবিআই আদালতে একটা চার্জশিট জমা দিয়েছে। কোন পথ দিয়ে আততায়ীরা এসেছিল। কোন বন্দুকে খুন করা হয়েছিল। সেই বন্দুক কোথায় কেনা হয়েছিল। গাড়ির নম্বর প্লেট কোথায় বদল করা হয়েছিল। এমন নানা রোমহর্ষক বর্ণনা আছে। কিন্তু এবারও আসল জায়গায় অষ্টরম্ভা। আসল খুনি কে, কী তার উদ্দেশ্য, এটা নিয়ে যা দাবি করা হয়েছে, তাকে আষাড়ে গপ্প বলেই মনে হচ্ছে। বাস্তবের সঙ্গে তেমন সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না।
কিন্তু সহানুভূতি দরকার। তার থেকেও বড় কথা, মায়ের মুখ বন্ধ করা দরকার। অতএব, তাঁকেও টিকিট দিয়ে দাও। নন্দীগ্রামে তিনিই বিজেপির প্রার্থী। অভয়ার মায়ের মতো তিনিও নিশ্চিতভাবেই জিতে যাবেন। কিন্তু যথাযথ তদন্ত বা বিচার হবে কি? সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
একদিকে, সিবিআই চার্জশিটে ভিনরাজ্যের একজনকে মূল অভিযুক্ত বলে দাবি করল। অন্যদিকে, আমাদের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনী ময়দানে হাওয়া গরম করতে নেমে পড়লেন। তিনি বলে বসলেন, এটা ভাইপো গ্যাংয়ের কাজ। একজন মুখ্যমন্ত্রী নিজেকে কোন বালখিল্যতার স্তরে নামাতে পারেন, আরও একবার দেখা গেল। প্রশাসনির প্রধান হয়ে তদন্তের আগেই দুম করে এভাবে বলে দেওয়া যায়? দায়িত্বজ্ঞানহীনতায় মমতার সঙ্গে তাঁর কোনও তফাতই থাকছে না। যদি সত্যিই ভাইপো জড়িয়ে থাকেন, তাহলে সিবিআই চার্জশিটে তো তাঁর নামটুকুও উল্লেখ নেই। তাহলে হিম্মৎ বলুন, সিবিআই গাঁজা খেয়ে ভুল চার্জশিট দিয়েছে।
ভাইপোর নানা অপকীর্তি আছে। কারণ, ভাইপো জানেন, দিল্লিতে তাঁর প্রভাবশালী মামারা আছেন। তাঁকে কেউ ছুঁতে পারবে না। কিন্তু এই খুনের সঙ্গে ভাইপোর যোগসূত্র থাকার সম্ভাবনা একেবারেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। চন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর কীসের শত্রুতা? বরং, চন্দ্রনাথের মৃত্যুর আসল কারণ সামনে এলে তা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর কাছে খুব একটা স্বস্তিদায়ক হবে না।
এক্ষেত্রেও ন্যায়বিচারের সম্ভাবনা কম। ললিপপ হিসেবে আরও একজন মা বড়জোর বিধায়ক হবেন। তাঁর মুখ চিরচরে বন্ধ হয়ে যাবে।
অনেক হল। এবার এই ভণ্ডামি বন্ধ হোক। শাসকের কাজ ন্যায়বিচার দেওয়া। সেটা যদি দিতে না পারেন, ললিপপ হিসেবে বিধায়ক পদের টোপ দেবেন না। মায়েদেরও অনুরোধ, অতীত থেকে শিক্ষা নিন। কী আগের সরকার, কী এই সরকার, এঁরা সঠিক তদন্ত করবে না। মুখ বন্ধ রাখার জন্য একটা গাজর ঝুলিয়ে দেবে। ছেলে বা মেয়ের মৃত্যু নিয়ে এমন সওদা নাইবা করলেন!
