অজয় নন্দী
একদিকে দিল্লি, একদিকে দুবাই। দুই জায়গায় খেলতে নেমেছিল ভারতের দুই দল। দিল্লিতে নেমেছিল ছেলেদের দল। বিপক্ষে আফগানিস্তান। আর দুবাইয়ে ছিল মেয়েদের এশিয়া কাপের ফাইনাল। এখানে প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা।
ভারতীয় ক্রিকেট এখন এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের যাবতীয় বিদ্বেষ মূলক কর্মকাণ্ডকে প্রবল উৎসাহে পালন করা হচ্ছে। আর এই দ্বেষ প্রেম কেই দেশপ্রেম বলে প্রবল ঢক্কা নিনাদে প্রচার করা হচ্ছে।
খেলা শুরুর আগে জাতীয় সংগীত গাওয়া অনেক দিনের প্রথা। কিন্তু এবার ভারতীয় দল প্রথমে গাইল বন্দেমাতরম, পরে গাইল জনগণমন। অতীতে কোনও দল এইভাবে দুটি গান গেয়েছে কিনা জানা নেই। টাকার দম্ভে ভারতীয় বোর্ড সারা বিশ্বেই এক দাদাগিরি দেখিয়ে চলেছে। ফলে ভারতের নানা অন্যায় আবদারকে মেনে নেওয়া ছাড়া বাকি দেশ গুলির কোনও উপায়ও থাকে না। শুধু বন্দেমাতরম গাইলেই হবে না, পুরো ছটি স্তবক গাইতে হবে। মোদি বাবুদের তেমনই ইচ্ছা। না মেনে উপায় কী? ফল কী হল? প্রথম স্তবক অনেকেরই পরিচিত। ফলে অনেকেই গলা মেলালেন। কিন্তু পরের পাঁচটি স্তবক? কোনও ক্রিকেটারের ই ঠোট আর নড়ছে না। মাইকে গান বেজে গেল। সকলে মৌন হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
শুধু ক্রিকেট মাঠ নয়। যে পার্লামেন্ট কয়েক মাস আগে ফতোয়া জারি করল যে বন্দেমাতরমের পুরো স্তবক গাইতে হবে, সেখানেও যদি এই গান বাজানো হত, একই রকম ফল হত। বঙ্কিমচন্দ্রের জন্য এবং বন্দেমাতরম এর ছটি স্তবক গাওয়ানোর জন্য যাঁদের ঘুম হচ্ছিল না, তাঁদেরও ঠোঁট নড়ত না। তাঁরাও একেক জন মৌনী বাবা হয়েই দাঁড়িয়ে থাকতেন।
কথায় আছে, আবোধের গো বধেই আনন্দ। সরকারের অধিকাংশ কর্মকাণ্ড দেখে সেই প্রবাদটাই বারবার মনে পড়ে যায়। বন্দে মাতরম এর প্রতি এদের কোন ও শ্রদ্ধা নেই। থাকলে ছোট থেকেই এই গানটা শুনতেন এবং মুখস্থ থাকতো। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিও কোন শ্রদ্ধা নেই। থাকলে সাহিত্য সম্রাটের অন্তত একটা লেখা পড়তেন। যেহেতু গানে দুর্গা কথাটা আছে, যেহেতু মন্দির আছে, অতএব এই গানটা মুসলিমদের দিয়ে জোর করে গাওয়াতে হবে। মাদ্রাসায় চালু করতে হবে। তাহলেই দেশে আর কোনও সমস্যা থাকবে না।
যে গান নিজেরা জানেন না, যে গান বাজলে নিজেদের মুখ বন্ধ করে মৌন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, সেই গান গাওয়া বাধ্যতামূলক, এই মর্মে সংসদে আইন পাশ হয়।
ফলটা কী হল? বন্দেমাতরম গাওয়া হচ্ছে, কারও ঠোঁট নড়ছে না। এতে দেশের সম্মান বাড়ল? কার মুখ পুড়ল? এবার হয়তো বোর্ড মারফত ফতোয়া আসবে, ওই গান গাইতে না পারলে ভারতীয় দলেই আর নেওয়া হবে না। খেলোয়াড়রা ব্যাটিং বোলিং প্র্যাকটিস না করে সারাদিন বন্দেমাতরম মুখস্ত করবেন।
সংসদীয় গণতন্ত্রের ধেড়ে খোকাদের একটাই আর্জি, ক্রিকেটারদের ওপর ফতোয়া জারি করার আগে নিজেরা মুখস্ত করুন। শাসকদলের যে সাংসদরা এই গানটা গোটাটা গাইতে পারবেন না, তাঁরা আগে পদত্যাগ করুন। অনেক সংযম, অনেক শিষ্টাচার দেখানো হয়েছে। কথায় কথায় যারা অন্যদের গায়ে দেশদ্রোহী তকমা এঁটে দেয়, এবার সোচ্চার হয়ে তাঁদের মূর্খ বলার সময় এসেছে। গণ্ড মূর্খ দের হাতে গণতন্ত্র ও সংসদ সুরক্ষিত নয়। মূর্খদের মুখে দেশপ্রেম শব্দটা মানায় না, এটাও আরও জোর দিয়ে বলার সময় এসেছে।
