স্বরূপ গোস্বামী
নিজেকে ক্রমশ হাস্যকর করে তোলার প্রথা বজায় রেখেছে বিধানসভা। প্রতিদিন নিত্যনতুন কর্মকাণ্ড। তাতেই বোঝা যাচ্ছে, বিধানসভা কাদের হাতে।
গত দুদিন ধরে বিভিন্ন কমিটি নিয়ে জল্পনা চলল। অবশেষে, স্পিকার মশাই সেই তালিকা প্রকাশ করলেন। মারাত্মক চমক। পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান করা হল কানাইয়ালাল আগরওয়ালাকে। কাকে কোন কমিটির চেয়ারম্যান করবেন, সেটা অবশ্যই স্পিকারের এক্তিয়ার। কিন্তু সেই এক্তিয়ার বা সিদ্ধান্ত কখনও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়।
গত দশ বছর ধরে এই কমিটি নিয়ে কার্যত ছেলেখেলা চলছে। এমন এমন লোকেদের এইসব চেয়ারে বসানো হয়েছে, যা বিধানসভার মর্যাদা একটুও বাড়ায়নি, বরং কলুষিত করেছে। পরিষদীয় কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ন্যূনতম শ্রদ্ধা ও ধারণা থাকলে হয়তো এমনটা করা যায় না। পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা থাকলেও এমনটা করা যায় না।
আচ্ছা, এই কমিটির কাজ কী? সহজ কথায় বলতে গেলে, সরকারের আয়–ব্যয়ের হিসেব পরীক্ষা নিরীক্ষা করা, ত্রুটি খুঁজে বের করা, সরকারকে সতর্ক করা, নতুন দিশা দেখানো। কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের রিপোর্ট (সিএজি) এই কমিটি খতিয়ে দেখতে পারে। সেই রিপোর্টে কী কী পর্যবেক্ষণ আছে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা, বিভিন্ন আমলাদের ডেকে পাঠিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া এই কমিটির এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে। সেই নিরিখে তাঁরা বিধানসভার কাছে তাঁদের সুপারিশ তুলে ধরবেন।
সত্যিই, কানাইয়ালালের যে এত প্রতিভা, আমাদের জানাই ছিল না। কানাইয়ালাল সিএজি রিপোর্ট খতিয়ে দেখবেন, তার ভুল বের করবেন, সরকারকে দিশা দেখাবেন। ভাবতে গেলেও বুকের পাটা লাগে। যাঁরা তাঁকে এই কাজের যোগ্য মনে করলেন, তাঁদেরও খুরে খুরে দণ্ডবৎ। আর কোনও লোক পেলেন না! শেষে কানাইয়ালাল!
তৃণমূল সরকারের প্রথম দফায় অরুণাভ ঘোষকে একবার ডেকে পাঠায় বিধানসভার প্রিভিলেজ কমিটি। কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন সোনালি গুহ। অরুণাভবাবুর বক্তব্য ভাল করে না শুনেই মনগড়া একটা রিপোর্ট তৈরি হয়েছিল। প্রায় দেড়শো পাতার রিপোর্ট বিধানসসভায় পেশ হয়। অরুণাভ ঘোষকেও তলব করা হয়। তিনি ভারী মজার একটা মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এই রিপোর্টের তলায় যাঁর সই আছে, তিনি দয়া করে এক পাতা রিডিং পড়ে দিন। যদি রিডিং পড়তে পারেন, যে শাস্তি দেবেন, পাতা পেতে নেব। বলাই বাহুল্য, সেদিন ডেপুটি স্পিকার এই চ্যালেঞ্জটুকু গ্রহণ করার সাহস দেখাননি।
কানাইয়ালাল সম্পর্কেও একই কথা বলতে হয়। কারও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে কটাক্ষ করা হয়তো শোভনীয় নয়। কিন্তু যাঁকে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির মাথায় বসিয়ে দেওয়া হল, তাঁর বিদ্যেবুদ্ধির দৌড় নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। সেদিন অরুণাভ ঘোষ যেভাবে বলেছিলেন, সেই ভাষাতেই বলতে ইচ্ছে করে, সিএজি রিপোর্টের বিশ্লেষণ তো দূরের কথা, ওই রিপোর্ট পড়ে তার পাঁচ পার্সেন্ট বোঝার ক্ষমতা কানাইয়ালালের আছে তো? তিনি সরকারকে দিশা দেখাবেন! কানাইয়ালালের নামে যে ছাপা রিপোর্ট বিধানসভায় পেশ হবে, তিনি নিজে তা একপাতা রিডিং পড়তে পারবেন তো?
সাধারণত, বিরোধী দলের সিনিয়র, লেখাপড়া জানা কোনও লোককে এই কমিটির দায়িত্ব দেওয়া হয়। কাকে চেয়ারম্যান করা হবে, তা বিরোধীদের হাতেই ছেড়ে রাখা হয়। এক্ষেত্রে ঋতব্রত শিবির হয়তো কানাইয়ালালের নামই পাঠিয়েছিল। স্পিকার তাতেই সিলমোহর দিয়েছেন। সেদিক থেকে আইনগত কোনও ত্রুটি নেই। কিন্তু কাকে রাজার পার্ট দেওয়া হচ্ছে, খতিয়ে দেখা হবে না! এক, দুই, তিন করে তিনটি নাম জমা দেওয়ার প্রথা। স্পিকার চাইলে সেই তিনজনের মধ্যে কোনও একজনকে বেছে নিতে পারেন। বেছে বেছে গঙ্গারামকেই কিনা পাত্র হিসেবে বেছে নিলেন!
বাম জমানায় পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান হতেন সুব্রত মুখার্জি, সত্য বাপুলিরা। তৃণমূল প্রথম পাঁচ বছর বিরোধীদের পছন্দকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। কিন্তু ২০১৬ থেকে স্পিকার মশাই নিজের ইচ্ছেমতো চেয়ারম্যান বানাতে শুরু করলেন। কখনও মানস ভুঁইয়া, কখনও শঙ্কর সিং, কখনও মুকুল রায়, কখনও কৃষ্ণ কল্যাণী, কখনও সুমন কাঞ্জিলাল। খাতায় কলমে এঁরা বিরোধী সদস্য। কিন্তু একটা মস্তবড় মিল আছে। এঁরা সবাই দলবদলু। বিরোধীদের টিকিটে নির্বাচিত হয়ে শাসক দলে যোগ দিয়েছেন। অর্থাৎ, পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি যেন দলবদলুদের জন্য সংরক্ষিত হয়ে গেল। দলবদলের পুরস্কার হিসেবে এই পদ উপঢৌকন দেওয়া হল। এঁদের মধ্যে মানস ভুঁইয়ার যোগ্যতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। কিন্তু তিনি ততদিনে শিবির বদলে ফেলেছিলেন। ফলে, সরকারের ত্রুটি তুলে ধরার চেয়ে সাফাই গাওয়ার কাজেই বেশি মনযোগী হয়ে পড়েছিলেন।
এবারও কিছুটা মিল আছে। কানাইয়ালাল তৃণমূলের টিকিটে নির্বাচিত। পরে নেত্রীকে ছেড়ে ঋত শিবিরে। অর্থাৎ, সরকার অনুমোদিত বিরোধী দলে। যাঁরা বিরোধিতার বদলে সরকারকে তোয়াজ করার রাস্তাই বেছে নিয়েছেন। এই কানাইয়ালাল সরকারের ত্রুটি তুলে ধরবেন! হাঁসালেন কত্তা।
মোদ্দা কথা, বিধানসভার সবথেকে মূল্যবান কমিটির চেয়ারম্যানের পদ আবার দলবদলুদের জন্যই। সরকার বদল হল। কিন্তু দলবদলু আর অযোগ্য লোকেদের মাথায় বসানোর প্রথা বন্ধ হল না। বহাল তবিয়তেই চলছে। কানাইয়ালালের প্রতি নয়, বিধানসভার প্রতিই বড় করুণা হচ্ছে।
