সজল মুখার্জি
কুণাল ঘোষকে নিয়ে বাঙালির রাজনৈতিক স্মৃতি বেশ বিচিত্র। একটা সময় তাঁকে দেখলেই যেন বিতর্কের গন্ধ পাওয়া যেত। সাংবাদিক হিসেবে পরিচিতি, পরে তৃণমূলের সক্রিয় রাজনীতি—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন এমন এক চরিত্র, যাঁকে নিয়ে মতামত ছিল প্রবল, কিন্তু নিরপেক্ষতা ছিল কম।
কুণাল কিছু বললেই সামাজিক মাধ্যমে ঝড় উঠত। তাঁর পোস্টের কমেন্ট বক্সে যুক্তির পাশাপাশি গালাগালি, ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ—সবই থাকত। বিরোধীদের আক্রমণ করেছেন, আবার নিজের দলকেও সব সময় ছাড় দেননি। ফলে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সমালোচনা যেমন হয়েছে, তেমনই তাঁকে নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা রকম ধারণা।
কিন্তু সময় মানুষকে নতুন করে চিনতে শেখায়। ২০২৬-এর রাজনৈতিক পালাবদলের পর সেই কুণাল ঘোষকেই যেন অন্য চোখে দেখছেন অনেকে। একের পর এক নেতা শিবির বদলেছেন। কেউ নতুন সরকারের দিকে গিয়েছেন, কেউ পুরনো অবস্থান বদলেছেন, কেউ আবার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের হিসাব কষতে ব্যস্ত। কুণাল কিন্তু তৃণমূলেই রয়ে গিয়েছেন। নিজেই বলেছেন, সরকার বদলালেও তিনি তৃণমূলের সৈনিক ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন।
এটাই তাঁর ভাবমূর্তিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এনেছে। যাঁরা একসময় তাঁকে তীব্র সমালোচনা করতেন, তাঁদেরই কেউ কেউ এখন বলছেন—লোকটা অন্তত বিপদের সময়ে পালাননি। এই স্বীকৃতির মূল্য কম নয়। কারণ, রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষা ক্ষমতায় থাকাকালীন হয় না। তখন পাশে থাকা সহজ। আসল পরীক্ষা হয় যখন ক্ষমতা হাতছাড়া হয়, যখন চারপাশের মানুষ একে একে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে শুরু করেন। সেই পরীক্ষায় কুণাল নিজের অবস্থান বদলাননি।
এমনকি দলের সঙ্গে মতবিরোধেও তিনি আগের মতোই সরব। অর্থাৎ আনুগত্য মানে তাঁর কাছে সব বিষয়ে চুপ করে থাকা নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি তাঁর রাজনৈতিক আনুগত্যের কথা তিনি যেমন প্রকাশ্যে বলেছেন, তেমনই দলের ভুল নিয়েও নিজের মত জানিয়েছেন। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও এই দ্বৈত চরিত্রটি দেখা যাচ্ছে। এখানেই হয়তো পুরনো কুণাল আর নতুন কুণালের পার্থক্য।
আগে তাঁর কথা শুনলে অনেকের মনে হত—এই মানুষটি কি শুধুই দলীয় আক্রমণের মুখ? এখন অনেকে তাঁর মধ্যে দেখছেন অন্য কিছু—একজন রাজনৈতিক কর্মীর জেদ। ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটে বেলেঘাটা থেকে তাঁকে প্রার্থী করেছিল তৃণমূল। প্রচারে নিজের পোস্টার পর্যন্ত ছিঁড়ে দিয়ে দলের কর্মীদের ‘বাড়তি উৎসাহ’ না দেখানোর বার্তা দিয়েছিলেন তিনি।
তারপর বিধানসভাতেও তাঁর পুরনো স্বভাব বদলায়নি। কথা বলেছেন জোরে, বিতর্কে জড়িয়েছেন, এমনকি এক পর্যায়ে মার্শাল ডেকে তাঁকে বিধানসভা থেকে বার করে দেওয়া হয় এবং দিনের জন্য সাসপেন্ডও করা হয়। অর্থাৎ কুণাল বদলেছেন, আবার বদলাননি। বদলেছে তাঁকে দেখার চোখ।
একসময় যে মানুষটির প্রতিটি বক্তব্যকে সন্দেহের চোখে দেখা হত, এখন তাঁর সম্পর্কে অন্য একটি কথা শোনা যাচ্ছে—‘লোকটা অন্তত ধান্দাবাজ নয়।’ রাজনীতিতে এই সার্টিফিকেট পাওয়া সহজ নয়। কুণালের পুরনো বিতর্ক মুছে যায়নি। তাঁর রাজনৈতিক অতীতও নতুন করে লেখা সম্ভব নয়। কিন্তু রাজনীতিতে চরিত্রের একটি পরীক্ষা আছে, যার নাম—‘বিপদের সময় পাশে থাকা।’
সেই পরীক্ষায় কুণাল আপাতত পাশ করেছেন বলেই হয়তো তাঁর কমেন্ট বক্সের ভাষাও বদলে গেছে। যেখানে আগে থাকত কটাক্ষ, এখন সেখানে অনেক সময় প্রশংসা। এ যেন রাজনীতির এক অদ্ভুত পরিহাস। যে মানুষটি এত দিন অন্যদের আক্রমণ সামলেছেন, তিনিই এখন প্রশংসা সামলাচ্ছেন।
তিনি এখনও বিতর্কিত, এখনও তীক্ষ্ণ, এখনও বেপরোয়া। কিন্তু একটা জিনিস তিনি প্রমাণ করেছেন—সবাই যখন নিরাপদ দিক খোঁজে, তখনও কেউ কেউ নিজের পুরনো ঘরটাতেই দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। রাজনীতিতে আনুগত্যের মূল্য নিয়ে যত প্রশ্নই থাক, এই দৃশ্যটি অন্তত মনে রাখার মতো। কুণালের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন তাই হয়তো তাঁর মধ্যে নয়। পরিবর্তনটা ঘটেছে তাঁকে দেখার চোখে।
