ধীমান সাহা
ছোট থেকেই একটা কথা শুনে আসছি, দেশপ্রেম। শব্দটা শুনলেই মনের মধ্যে কেমন একটা সম্ভ্রম তৈরি হত। এই শব্দটা শুনলেই দেশ নায়কদের মুখ মনে পড়ে যেত। নিজেদের গর্বিত ভারতীয় বলে মনে হত।
কিন্তু গত কয়েক বছরে এই শব্দটা যেভাবে ব্যবহার হচ্ছে, তাতে সম্ভ্রম বা সমীহ নয়, কিছুটা যেন অরুচি ধরে গেছে। একের পর এক অসভ্যতাকে দেশপ্রেমের মোড়ক দিয়ে চালানো হচ্ছে। যে যখন পারছেন, নিজেদের মূর্খতাকে ও ব্যর্থতাকে আড়াল করতে এই দেশপ্রেম শব্দটাকে ঢাল করছেন। এই পবিত্র শব্দটাকে এমন একটা অবস্থায় এনে ফেলেছেন, দেশপ্রেম শুনলেই কেন জানিনা মনে হচ্ছে এর পেছনে নিশ্চিতভাবেই কোনও ঘৃণার চাষবাস চলছে।
এই মূর্খতা নিজেরা দেখিযেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না, তাদের সুরে সুর না মেলালেই অন্যদের গায়ে দেশদ্রোহী তকমাও এঁটে দিচ্ছেন। নিজেদের মুর্খামি এবং অসভ্যতাকে খেলার মাঠেও জোর করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এশিয়া কাপ জয়ের পর ভারতের মহিলা ক্রিকেটাররা ট্রফি নিতে গেলেন না। তাঁরা ট্রফি বয়কট করলেন। কারণটা কী? যিনি এশিয়া কাপ তুলে দেবেন, তিনি পাকিস্তানের লোক। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সভাপতির নাম মহসিন নাকভি। মাস দুই আগে স্পেন যখন ফুটবল বিশ্বকাপ জিতল, তাদের হাতে ট্রফি তুলে দিলেন ফিফার প্রেসিডেন্ট। ভারত যখন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতল, তখন ট্রফি তুলে দিলেন আইসিসির প্রেসিডেন্ট। এশিয়া কাপ এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল আয়োজিত টুর্নামেন্ট। স্বাভাবিক যুক্তিতেই পুরস্কার তুলে দেওয়ার কথা এসিসি প্রেসিডেন্টের।
কিন্তু ভারতীয় বোর্ডের গোঁ, মহসিন নাকভি ট্রফি দিলে তারা ট্রফি নেবেন না। বোর্ডের নির্দেশ বলে কথা। হরমনপ্রীত কাউর, স্মৃতি মন্ধানাদের সেই নির্দেশ মেনে চলতেই হবে। এক বছর আগেও ঠিক এমনই ঘটনা ঘটেছিল। এবার এশিয়া কাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ভারতের পুরুষ দল। কোচ গৌতম গম্ভীর, অধিনায়ক সূর্য কুমার যাদব। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরেও তাঁরাও ট্রফি নেননি। সেবারও সেই একই যুক্তি, পাকিস্তানের লোকের হাত থেকে ট্রফি নেব না।
পাকিস্তানের প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়ে যাওয়াই কেন্দ্রীয় সরকারের প্রথম এজেন্ডা। নিজেদের যাবতীয় ব্যর্থতা ও অক্ষমতাকে আড়াল করতে তাদের ভরসা সেই পাকিস্তান। অতয়েব, সারাক্ষণ ঘৃণা ছড়িয়ে যাও। আর এই ঘৃণা ছড়ানোর কাজে পেটোয়া চ্যানেলগুলি তো আছেই। লাগাতার এই ঘৃণা বর্ষণকেই দেশপ্রেমের মডেল বলে চালানো হচ্ছে। ঘৃণা করার এই ফতোয়া চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ক্রিকেটারদের ওপরেও। তাদেরও পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে হাত মেলানো চলবে না। পাকিস্তানের লোক ট্রফি দিলে সেই ট্রফি নেওয়া চলবে না।
নিজেদের পলিটিক্যাল এজেন্ডা নিয়ে নিজেরা থাকুন। দোহাই, ক্রিকেটারদের উপর এই ফতোয়া চাপিয়ে দেবেন না। ঘৃণা ছড়ানোর কাজটা শাসক দলকেই ভাল মানায়। যাঁরা সত্যিকারের দেশের হয়ে লড়াই করছেন, দোয়া করে তাঁদেরকে দেশপ্রেম শেখাতে যাবেন না। আপনাদের ঘৃণা নিয়ে আপনারা থাকুন। ওদের মন দিয়ে ক্রিকেটটা খেলতে দিন।
