জটায়ু নির্ঘাত লিখে ফেলতেন, সারান্ডায় স্যারেন্ডার

সৃজন শীল

সারান্ডা। নামটা শুনলেই মনে হয়, গা ছমছমে একটা ব্যাপার। জটায়ু থাকলে নির্ঘাত লিখে ফেলতেন, সারান্ডায় স্যারেন্ডার। ফেলুদা না এলেও মিতিন মাসি এসেছিলেন। উপন্যাসে যেমন আছে, রুপোলি পর্দাতেও তেমনই জমজমাট চেহারায় ধরা দিয়েছে সারান্ডার জঙ্গল।

সারান্ডা যাওয়ার কথা উঠলেই প্রথমে মনে হয়—বেশ দূর তো! কলকাতা থেকে জামশেদপুর, তারপর চাইবাসা। তারপর আরও পথ। ট্রেনের জানলার বাইরের পরিচিত দৃশ্য ধীরে ধীরে বদলে যায়। শহর ফুরোয়, জনপদ ফুরোয়, রাস্তার দু’পাশে গাছের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আর একসময় মনে হয়, শহরকে বেশ অনেকটা পিছনে ফেলে এসেছি।

সারান্ডা মানে সাতশো পাহাড়ের দেশ। নামের মধ্যেই যেন তার পরিচয়। পাহাড়, অরণ্য, উপত্যকা—সব মিলিয়ে এক বিশাল সবুজ ভূখণ্ড। তারই মধ্যে কিরিবুরু। কিরিবুরু নামটির সঙ্গে নানা ব্যাখ্যা জড়িয়ে আছে। কিরি মানে নাকি পোকা, আর বুরু মানে পাহাড়। অর্থাৎ, পোকার পাহাড়। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তিনদিনের ভ্রমণে কোনও পোকার উৎপাত পাইনি, এটুকু বলতে পারি। অতেব, নির্ভয়েই যান। স্থানীয় মানুষের কাছে এই পাহাড়ের নিজস্ব এক পরিচয় রয়েছে। নামের অর্থ নিয়ে যত কথাই থাক, সেখানে গিয়ে প্রথম যে জিনিসটি চোখে পড়ে, তা হল অরণ্য। শালগাছের সারি। মাঝে সেগুন। নাম না জানা আরও কত গাছ। কোন গাছ থেকে কোন পাখি ডেকে উঠছে, কে জানে!‌ কোথাও পাহাড়ের গায়ে ঘন সবুজ, কোথাও হঠাৎ খোলা আকাশ। আর সেই হীরন্ময় নীরবতা।

শহরে আমরা নীরবতাকে প্রায় ভুলেই গিয়েছি। এখানে নীরবতারও একটা শব্দ আছে। দূরে কোনও পাখি ডাকছে। হাওয়ায় পাতার শব্দ। কখনও ঝিঁঝিঁ। তারপর আবার সব চুপ। এই চুপ করে থাকার মধ্যেই সারান্ডার আসল সৌন্দর্য।

দু’তিন দিন অনায়াসে কাটিয়ে দেওয়া যায় এখানে। বিশেষ কিছু না করেও। সকালে উঠে হাঁটতে বেরিয়ে পড়া। রাস্তা ধরে অলস পায়ে এগিয়ে যাওয়া। কোথাও বসে থাকা। দূরের পাহাড় দেখা। আবার ফিরে আসা।
কোনও তাড়া নেই। কোথাও পৌঁছতে হবে না। এই ‘কোথাও পৌঁছতে না হওয়ার’ আনন্দটাই শহুরে মানুষের কাছে সম্ভবত সবচেয়ে বড় বিলাসিতা।

কিরিবুরুর কাছেই মেঘাতুবুরু। নামটাও যেন কবিতার মতো—মেঘের পাহাড়। সত্যিই সেখানে দাঁড়ালে মনে হয়, মেঘ যেন পাহাড়ের গায়ে এসে থেমেছে। কখনও এত নীচে নেমে আসে যে মনে হয় হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। মেঘ এখানে আকাশে শুধু ভেসে বেড়ায় না। যেন চরে বেড়ায়। সেই শক্তি চাটুজ্জে থেকে ধার করে বলতে হয়, এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে। সেই দৃশ্যের ছবি তোলা যায়। কিন্তু ছবিতে তার পুরোটা ধরা যায় না।

সারান্ডার আর একটি বিশেষত্ব—এখানে প্রকৃতি আর মানুষের জীবন পাশাপাশি হাঁটে। একদিকে গভীর অরণ্য, অন্যদিকে বহু পুরনো জনপদ। কিছুটা নেমে গেলেই, লৌহ আকরিকের খনি। ইস্পাত কারখানা। তার আওয়াজ অবশ্য কিরিবুরুতে আসে না। এখানে অনাবিল নিস্তব্ধতা, যেখানে দাঁড়িয়ে মনে হয় পৃথিবীটা বুঝি অনেক পিছনে চলে গেছে।

রাস্তার একদিকে ওড়িশা, অন্যদিকে ঝাড়খণ্ড। সীমানা কাগজে টানা। প্রকৃতির কাছে তার কোনও অর্থ নেই। কোন রাজ্যে কার সরকার, কোন রাজ্যে কে মুখ্যমন্ত্রী, এসব জানতে পাহাড় আর অরণ্যের বয়েই গেছে। পাহাড় একই, অরণ্য একই, বাতাসও একই।

এই অঞ্চলের সঙ্গে সাহিত্যেরও একটা গভীর সম্পর্ক আছে। বুদ্ধদেব গুহর লেখায় যে অরণ্য, যে নিঃসঙ্গতা, যে বুনো সৌন্দর্য বারবার ফিরে আসে, তার সঙ্গে সারান্ডার অনেক জায়গায় আশ্চর্য মিল খুঁজে পাওয়া যায়। চাইবাসা হয়েই আসতে হয়। আর এই চাইবাসাতেই নিয়মিত আনাগোনা ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়দের। মাঝে মাঝে তাঁরাও ঘুরে যেতেন এই অরণ্যে। তাঁদের লেখাতেও ঘুরেফিরে এসেছে এই সারান্ডার কথা। সিনেমার পর্দাতেও এই অরণ্য এসেছে নানা সময়ে। অরণ্য এখানে শুধু পটভূমি নয়, যেন নিজেই একটি চরিত্র।

যাওয়ার পথটাও কম রোমাঞ্চকর নয়। সাধারণত বড়া জামদা বা বারবিলে নেমে সড়কপথে এগোতে হয়। তবে ট্রেনের উপর পুরো ভরসা করার আগে সময়সূচি দেখে নেওয়াই ভাল। বিশেষ করে জনশতাব্দী এক্সপ্রেস ইদানীং বেশ বিড়ম্বনায় ফেলছে। বিশেষ করে ফেরার সময় এই ট্রেনের সময়ের কোনও ঠিকঠিকানা নেই। লেট বললে কম বলা হয়, মহালেট। হাওড়ায় পৌঁছোনোর কথা রাত নটায়। রাত বারোটার আগে ঢোকে না বললেই চলে। কখনও মাঝরাতও হয়ে যাচ্ছে। অতএব, সাবধান।

তবে সারান্ডার সৌন্দর্যের জন্য কিছুটা অনিশ্চয়তা মেনে নেওয়া যায়। নইলে, ফেরার পথে সরাসরি না ফিরে জামশেদপুরে নেমে গেলেন। সেখান থেকে অন্য ট্রেন ধরাই বুদ্ধিমানের কাজ। নইলে, সকালের দিকে লোকাল ধরে জামশেদপুর। সেখান থেকে অন্য ট্রেন।

থাকার জন্য ফরেস্ট রেস্ট হাউস আছে, আছে সেইল-এর গেস্ট হাউসও। আগেভাগে ব্যবস্থা করে গেলে সুবিধা। কারণ এখানে গিয়ে হঠাৎ শহরের মতো হোটেল খুঁজে পাওয়া যাবে—এমন আশা না রাখাই ভাল। তবে কিরিবুরু হিলটপে একটা হোম স্টে আছে। সেখানেও ঠাঁই নিতে পারেন।

সারান্ডাকে দেখতে হলে একটু ধীরে যেতে হয়। দু’দিনের জন্য মোবাইলটা পাশে রেখে, সকালে দরজা খুলে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে, তারপর কোনও নির্দিষ্ট গন্তব্য ছাড়াই হাঁটতে বেরিয়ে পড়তে হয়। একটু গেলেই সেলের প্রচুর কোয়ার্টার। একটা মিনি ভারতবর্ষ। সারান্ডা আসলে দেখার জায়গা নয়, অনুভব করার জায়গা।

সন্ধে নামার সময় পাহাড়ের গায়ে আলো কমে আসে। অরণ্য আরও গাঢ় হয়। দূরে কোনও অচেনা পাখি ডাকে। হঠাৎ মনে হয়, এত দিন আমরা আসলে কোথায় ছুটছিলাম? তবে নির্ভয়ে হেঁটে বেড়াতে পারেন। বন্য জন্তুর আনাগোনা নেই। একসময় মাওবাদি আনাগোনা থাকলেও আপাতত তা অতীত।

স্নিগ্ধতায় মোড়া দু–‌তিনটে দিন। যার রেশ থেকে যাবে ফেরার পরেও। মনে হবে, সারান্ডার সেই রাস্তা, সেই শালবন, সেই মেঘাতুবুরুর মেঘ—সব কিছু বুঝি এখনও পিছনে পড়ে আছে।

Previous post ‘জাস্টিস ফর আর জি কর’ কোথায় হারিয়ে গেল?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *