রক্তিম মিত্র
দু’বছর আগে কলকাতার রাজপথে একটি স্লোগান উঠেছিল—‘জাস্টিস ফর আর জি কর’।
স্লোগানটি খুব দ্রুত কলকাতার সীমানা পেরিয়ে দেশের নানা প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। চিকিৎসক, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, শিল্পী, সাধারণ মানুষ—রাজনৈতিক পরিচয় ভুলে বহু মানুষ পথে নেমেছিলেন। কোনও রাজনৈতিক দলের ডাকে নয়, কোনও নির্বাচনী স্বার্থে নয়। এক তরুণী চিকিৎসকের মৃত্যু এবং তার পরের তদন্ত নিয়ে মানুষের মনে যে ক্ষোভ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, তারই প্রকাশ ঘটেছিল এই গণআন্দোলনে। কলকাতা তখন গোটা দেশকে দেখিয়েছিল, অরাজনৈতিক গণআন্দোলন কাকে বলে।
আজ, দু’বছর পরে, সেই ভিড় নেই। মোমবাতির মিছিল নেই। পোস্টার নেই। সামাজিক মাধ্যমে প্রতিদিন নতুন নতুন দাবি নেই। শহর নিজের ছন্দে ফিরে গিয়েছে। শুধু প্রশ্নটি রয়ে গিয়েছে।
গত দু’বছরে মামলার পথ কম ঘোরেনি। শিয়ালদহ আদালত থেকে কলকাতা হাইকোর্ট, তারপর সুপ্রিম কোর্ট—সেখান থেকে আবার লোয়ার কোর্ট। বিচারের নানা স্তর পেরিয়েছে ঘটনা। তদন্তের দায়িত্বও বদলেছে। প্রথমে রাজ্য পুলিশের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। পরে সিবিআই তদন্তভার নেয়। একাধিক রিপোর্ট, শুনানি, আবেদন, পাল্টা আবেদন—সবই হয়েছে।
কিন্তু এত কিছুর পরেও সাধারণ মানুষের মনে যে প্রশ্নটি ছিল, সেটি এখনও মুছে যায়নি—ঘটনার সব সত্য কি সামনে এসেছে? আইনের নিজস্ব গতি আছে। আদালতের নিজস্ব প্রক্রিয়া আছে। তদন্তও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে এগোয়। এই যুক্তি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গণতন্ত্রে বিচার শুধু আদালতের রায়ের বিষয় নয়; মানুষের আস্থাও তার একটি বড় অংশ।
সেই আস্থাতেই সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছিল আর জি কর কাণ্ডে। কারণ, মানুষ দেখেছিল, একটি ঘটনার পর তদন্তের প্রাথমিক ধাপ নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। প্রমাণ সংরক্ষণ, ঘটনাস্থল, প্রশাসনের ভূমিকা—সব কিছু নিয়ে বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। তারপর তদন্ত এক সংস্থা থেকে অন্য সংস্থার হাতে যাচ্ছে। আর সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। আসল অভিযুক্তরা আড়ালেই থেকে গেল। বেচারা কোন এক সিভিক ভলান্টিয়ার। রাষ্ট্র তাকে সাজা শুনিয়ে ভেবে নিল, বিরাট এক ন্যায়বিচার বুঝি প্রতিষ্ঠা হল। কিন্তু রহস্যের কিনারা তো দূরের কথা, তার একশো মাইলের মধ্যেও সিবিআই পৌঁছোতে পারেনি। তারা তদন্তের নামে শুধু সময় নষ্ট করে গেছে।
দু’বছর পরে তাই অনেকের মনে হচ্ছে, এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া কি সত্যকে আরও স্পষ্ট করেছে, নাকি মানুষের স্মৃতিকে ধীরে ধীরে ক্লান্ত করে তুলেছে? আর জি কর কাণ্ড আরও একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এনেছিল। রাজ্য সরকার হোক বা কেন্দ্রীয় সরকার—ক্ষমতার কাঠামোর প্রতি মানুষের সন্দেহ কতটা গভীর হয়েছে। রাজ্য পুলিশের তদন্ত নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠল, তখন কেন্দ্রীয় সংস্থার উপর ভরসা করা হয়েছিল। কিন্তু সিবিআই তদন্তের পরেও যদি প্রশ্ন থেকেই যায়, তাহলে মানুষ যাবে কোথায়?
এই প্রশ্নের উত্তর কোনও একটি সরকারকে নয়, গোটা বিচার ও তদন্ত ব্যবস্থাকেই খুঁজতে হবে। দু’বছর আগে অভয়ার নাম ছিল প্রতিবাদের প্রতীক। আজ সেই নাম যেন আমাদের গণতন্ত্রের স্মৃতিশক্তিরও পরীক্ষা। আমরা কি শুধু রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে জানি, নাকি দীর্ঘ সময় ধরে জবাবদিহি দাবি করতেও পারি? ‘জাস্টিস ফর আর জি কর’ স্লোগানটি হয়তো আজ আর তেমন শোনা যায় না। কিন্তু তার ভিতরের প্রশ্নটি এখনও মরে যায়নি।
দু’বছর পরেও যদি তদন্ত শেষ না হয়, দু বছর পরেও যদি মূল প্রশ্ন অজানাই থেকে যায়, তাহলে এমন তদন্তকারি সংস্থা আদৌ রাখার দরকার আছে কিনা, সেই প্রশ্নটাই সবার আগে তোলা উচিত। বিচারের পথ যত দীর্ঘ হয়েছে, মানুষের আস্থা ততটাই কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
আর গণতন্ত্রে বিচার বিলম্বিত হলে শুধু একটি মামলাই দীর্ঘ হয় না, দীর্ঘ হয় মানুষের অপেক্ষাও। মানুষ অনেক সংযম দেখিয়েছে। এবার বিচার বিভাগকেও আয়না দেখানোর সময় এসেছে।
