কত চিঠি লেখে লোকে

স্বরূপ গোস্বামী

চিঠি নিয়ে ভারি মজার একটা কথা লিখেছিলেন হোরেস ওয়ালপোর। I write to you because I have nothing to do.I finish because i have nothing to say. ‌বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়, ‘‌আমার কোনও কাজ নেই, তাই তোমাকে চিঠি লিখছি। আমার কিছু বলার নেই, তাই শেষ করছি।’‌

আসলে, অনেকের কাছে চিঠি মানে একটা আতঙ্ক। চিঠির নাম শুনলেই যেন গায়ে জ্বর আসে। শুরুতে মনে হয়, এ আর কী এমন ব্যাপার!‌ চাইলেই পাতার পর পাতা লেখা যায়। কাগজ–‌কমল নিয়ে যদিও বা লিখতে বসলেন, এক–‌দু লাইন লেখার পরেই মনে হয়, এবার ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি।

সমাজমাধ্যম জুড়ে সেলফির ছড়াছড়ি। নীচে লাইক আর কমেন্টের বন্যা। অদ্ভুত এক আত্মরতির সমাজ। যাঁরা দিনভর ওই যন্ত্রে মুখ গুঁজে আছেন, তাঁদের বলুন তো, একটা চিঠি লিখতে। অমনি শুনতে পাবেন, এখন আবার কেউ চিঠি লেখে নাকি!‌ চিঠি যেন নিতান্তই একটা সেকেলে ও অর্থহীন ব্যাপার। মাঝে মাঝে মনে হয়, এই প্রজন্ম সত্যিই দুর্ভাগা, তাঁরা চিঠি লিখতে শিখল না। চিঠি পেতেও শিখল না।

ইচ্ছে করে, তাঁদের সুকান্ত ভট্টাচার্যর চিঠিগুলো পড়াই। এক কিশোর চিঠির মাধ্যমে নিজেকে কীভাবে উজাড় করে দিয়েছেন। একাধারে কবিতা লিখছেন, ছড়া লিখছেন, কাব্য নাটক লিখছেন, কিশোর বাহিনীর কাছে দিনভর ব্যস্তও থাকছেন। উত্তাল জনপথে মিছিলে পা মেলাচ্ছেন। আবার তারই ফাঁকে কী দুরন্ত সব চিঠিও লিখে যাচ্ছেন। এক ছোট্ট কিশোর। তার মনের মধ্যে কত ভিন্ন সত্তার স্রোত। কখনও তিনি প্রতিবাদী, কখনও প্রেমিক, কখনও নিতান্তই বন্ধু, কখনও জীবনবোধে পরিপূর্ণ নাগরিক, কখনও মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষারত। একেকটা চিঠিতে যেন নিজেকে নতুনভাবে মেলে ধরছেন। এক সত্তার সঙ্গে অন্য সত্তার কোনও বিরোধ নেই। সব যেন মিলেমিশে একাকার। হয়তো অতিশয়োক্তি মনে হবে। তবু, একেক সময় মনে হয়, তিনি যদি কবিতা নাও লিখতেন, শুধু এই চিঠির জন্যই অমরত্ব পেতে পারতেন।

সুকান্ত বলতেই আমরা ভেবে বসি, তিনি একুশ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন। আমরা ধরেই নিই, তাঁর সব লেখাই বুঝি ওই একুশ বছরে লেখা। একুশের পরিণতি বোধ অনুযায়ী তাঁকে মাপার ব্যর্থ চেষ্টা করি। কিন্তু তা তো নয়। অন্তত চিঠির তারিখ থেকে পরিষ্কার, কোন চিঠি তিনি কখন লিখেছেন। কোনওটায় বাংলার তারিখ ও সাল লেখা। আবার কোনওটায় ইংরাজির তারিখ, বছর। এর থেকে বোঝা যায়, দুটো ক্যালেন্ডারকেই মান্যতা দিয়েছেন। অধিকাংশ চিঠি লেখা হচ্ছে ১৯৪২ নাগাদ। হিসেব অনুযায়ী, তখন তাঁর বয়স ষোল বছর। ভাবতে অবাক লাগে, সেই ষোল বছরে কী অদ্ভুত পরিণতিবোধ। নিছক ‘‌আমি ভাল আছি, তুমি কেমন আছো’‌ মার্কা বার্তা বিনিময় নয়। ধরা দিয়েছে সমাজ, সমকাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই দামামার সময়ে কলকাতার চেহারা কতটা থমথমে ছিল, তার ছবি যেন এঁকে দিয়ে গেছেন সেই চিঠিতে।

চিঠি থেকেই বোঝা যায়, তাঁর অন্তরতম বন্ধু ছিলেন কবি অরুণাচল বসু। তাঁর কাছে নিজেকে যেভাবে মেলে ধরেছেন, আর কারও কাছে সেভাবে উন্মুক্ত হননি। সেখানেই তাঁর যাবতীয় আবদার। সেখানেই তাঁর পরম আশ্রয়। এমনকী নিজের প্রেমের কথা, অভিমানের কথাও অকপটে বলতে পারেন তাঁর কাছেই। অরুণাচল তখন কলকাতা থেকে অনেক দূরে, সুদূর যশোরে। তখনও ছিল না সীমান্ত। তখনও বসেনি কাঁটাতারের বেড়া। চিঠির নদী যেন আপনবেগে পাগলপারা হয়ে ছুটে গেছে সেই যশোরেই। বন্ধু অরুণের মতোই সুকান্তর জীবনে বড় এক স্নেহের আশ্রয় ছিলেন অরুণের মা, সরলা দেবীও। কোনও চিঠি লিখেছেন বন্ধু ভূপেনকে, কোনওটা আবার মেজ বৌদিকে। কোনওটা কিশোর বাহিনীর কোনও তরুণ সতীর্থকে। কোনওটা নিতান্তই কেজো চিঠি, কোনওটা শুরু হতে না হতেই শেষ, আবার কোথাও দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর।

কখনও লিখছেন বেলেঘাটা থেকে, কখনও শ্যামবাজার থেকে, কখনও সুদূর রাঁচি থেকে, আবার কখনও যাদবপুরের টিবি হাসপাতালের বিছানা থেকে। বিচিত্র সব সম্বোধন। যা একদিকে বুঝিয়ে দেয় সম্পর্কের গভীরতা, অন্যদিকে খুনসুটি। সুকান্তে গায়ে ‘‌প্রতিবাদের কবি’‌ তকমা বসে গেলেও তাঁর সেন্স অফ হিউমার যে কী তীব্র ছিল, এইসব বিচিত্র সম্বোধন থেকেই বোঝা যায়। কখনও লিখছেন, ‘‌স্বামী অরুণাচল মহারাজ সমীপেষু’‌, কখনও আবার, ‘‌সবুরে মেওয়াফল-দাতাসু’‌, কখনও, ‘‌শতশত সেলাম পূর্বক নিবেদন’‌, কখনও ‘‌বন্ধুবৎসলেষু’‌।

বেশ কিছু চিঠির ফটোকপিও পাওয়া যায়। কী পরিচ্ছন্ন হাতের লেখা। কাটাকুটি নেই বললেই চলে। অথচ, আগে লিখে পরে ফেয়ার করেছেন, এমনও নয়। শব্দ ও বাক্যের ওপর কী নিয়ন্ত্রণ!‌ কোথায় গিয়ে থামবেন, তিনি যেন সেই গন্তব্য জানেন। যদি বিষবৈচিত্রের দিকে তাকানো যায়, তাহলে সেখানেও ক্যানভাসটা অনেক বড়। কোথাও ধরা দিয়েছে ব্ল্যাকআউট আর কালোবাজারির সেই কলকাতা, কোথাও উঠে এসেছে বিশ্ব রাজনীতি, কোথাও কমিউনিস্ট আন্দোলনের নানা দিক, কোথাও নিখাদ সাহিত্য আলোচনা, কোথাও ব্যক্তিগত মান–‌অভিমান, কোথাও দাঙ্গা জর্জরিত কলকাতা, আবার কোথাও ছবি এঁকেছেন রাতের স্তব্ধতার। একদিকে প্রেমিকসত্তা, একদিকে কবিসত্তা, আবার তারই ফাঁকে উঁকি দিয়ে গেছে কর্মীসত্তা।

সরাসরি তাঁর লেখনিতে কয়েকটা চিঠির কিছু অংশে চোখ বোলালে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হবে। সময়টা ১৯৪২। তখনও দেশজুড়ে ‘‌ভারত ছাড়ো আন্দোলন’‌ এর ডাক দেওয়া হয়নি। শহর কলকাতা যেন থমকে আছে। যে কোনও মুহূর্তেই সে তলিয়ে যাবে বিস্মৃতির অতল গহ্বরে। সুকান্তর বয়স তখন সবে ষোল বছর। একদিকে কবিতায় তিনি লিখছেন, ‘‌আমার বসন্ত কাটে খাদ্যের সারিতে প্রতীক্ষায়,/‌আমার বিনিদ্র রাতে সতর্ক সাইরেন ডেকে যায়।’‌ কিন্তু‌‌ তাঁর চিঠিতে কীভাবে ধরা পড়েছিল সেই সময়ের কলকাতা?‌  

বন্ধু অরুণাচলকে লিখছেন, ‘‌কলকাতাকে আমি ভালবেসেছিলাম, একটা রহস্যময় নারীর মতো, ভালবেসেছিলাম প্রিয়ার মতো, মায়ের মতো। তার গর্ভে জন্মানোর পর আমার জীবন এতগুলি বছর কেটে গেছে তারই উষ্ণ–‌নিবিড় বুকের সান্নিধ্যে; তার স্পর্শে আমি জেগেছি, তার স্পর্শে অমি ঘুমিয়ে পড়েছি। বাইরের পৃথিবীকে আমি জানি না, চিনি না, আমার পৃথিবী আমার কলকাতার মধ্যেই সম্পূর্ণ। একদিন হয়তো এ পৃথিবীতে থাকব না, কিন্তু এই মুহূর্ত পর্যন্ত আমি যে কলকাতায় বসে কলকাতাকে উপভোগ করছি! সত্যি অরুণ, বড় ভাল লেগেছিল পৃথিবীর স্নেহ, আমার ছোট্ট পৃথিবীর করুণা। বাঁচতে ইচ্ছা করে, কিন্তু নিশ্চিত জানি কলকাতার মৃত্যুর সঙ্গেই আমিও নিশ্চিহ্ন হব।’‌

আবার সেই চিঠির শেষদিকে লিছেন, ‘‌আবার পৃথিবীতে বসন্ত আসবে, গাছে ফুল ফুটবে। শুধু তখন থাকব না আমি, থাকবে না আমার ক্ষীণতম পরিচয়। তবু তো জীবন দিয়ে এক নতুনকে সার্থক করে গেলাম।’‌

এই স্তব্ধ ও ভীত সন্ত্রস্ত কলকাতার ছবিই ফুটে উঠেছে আরও একটি চিঠিতে, এক্ষেত্রেও প্রাপক সেই অরুণাচল— ‘‌কলকাতা এখন আত্মহত্যার জন্যে প্রস্তুত, নাগরিকরা পলায়ন-তৎপর.‌.‌.‌ কত দ্রুত সবাই করছে প্রস্থান আর শহরটি হচ্ছে নির্জন। তবে এই নির্জনতা হবে উপভোগ্য— কারণ এর জনাকীর্ণতায় আমরা অভ্যস্ত, সুতরাং এর নব্য পরিচয়ে আমরা একটা অচেনা কিছু দেখার সৌভাগ্যে সার্থক হব। .‌.‌.‌ আজকাল রাত একটায় যদি কলকাতা ভ্রমণ কর তাহলে তোমার ভয়ঙ্কর সাহস আছে বলতে হবে। শুধু চোর–‌গুণ্ডার নয়, কলকাতার পথে এখন রীতিমত ভূতের ভয়ও করা যেতে পারে। সন্ধ্যার পর কলকাতায় দেখা যায় গ্রাম্য বিষণ্ণতা।’‌

হয়তো একটু ভারী ভারী হয়ে উঠছে। তাই একটু ভিন্ন স্বাদ জরুরি। আসতেই পারে ব্যক্তিগত জীবন ও খুনসুটির কথা। বন্ধু অরুণের চিঠি দীর্ঘদিন আসছে না। কিছুটা শ্লেষ মিশিয়েই কিশোর কবি লিখলেন, ‘‌অরুণ, তোর কাছ থেকে চিঠির প্রত্যাশা করা আমার উচিত হয় নি, সে জন্যে ক্ষমা চাইছি। বিশেষত তোর যখন রয়েছে অজস্র অবসর–‌ সেই সময়টা নিছক বাজে খরচ করতে বলা কি আমার উচিত? সুতরাং তোর কাছ থেকে চিঠি প্রাপ্তির দুরাশা আমায় বিচলিত করে নি।’‌ আবার এই অরুণ যখন আবার প্রেমে পড়েছেন, সেই খবর পেয়ে চিঠিতে একপ্রস্থ খুনসুটি করার সুযোগটাও ছাড়লেন না—
‘‌তোর তৃতীয় (!?) প্রেমের ইতিবৃত্ত পড়লাম, প’ড়ে খুশিই হলাম।– বরাবরই তোর এই নূতনত্বের প্রীতি আমাকে আনন্দ দিয়েছে। এবারও দিল। ভয় নেই তোর এই ব্যাপারে আমি তোকে নিরুৎসাহ করতে চাই না।
            কারণ তোর মতো বঞ্চিত জীবনে এই রকম নায়িকার আবির্ভাব বারবার হওয়া দরকার। যদিও এ জাতীয় প্রেমোপাখ্যানের স্থায়িত্ব সম্বন্ধে আমি বরাবর অতি-সতর্কতার দরুন সন্দিহান, তবুও এর উপকারিতাকে আমি অস্বীকার করি না।’ ‌
বন্ধুত্ব কতখানি গভীর হলে আর সরবোধ কত প্রখর হলে এমন খুনসুটির চিঠি লেখা যায়। এই ছোট ছোট খুনসুটিগুলোই বোধ হয় বন্ধু্ত্বকে প্রাণবন্ত রেখেছিল। আবার তাঁর নিজের হৃদয়ের একূল–‌ওকুল দুকূল যখন ভেসে যাচ্ছে প্রেমের প্লাবনে, তখন সেই প্রতিবাদের কবিই যেন বেশ লাজুক প্রেমিক। তিনি ‘‌হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল’‌। কিন্তু সাহস করে উঠতে পারছেন না। হারিয়ে যাচ্ছে কথার স্রোত। তখন সেই অনুভূতির কথাও অকপটে মেলে ধরেছেন সেই বন্ধুর কাছেই, ‘‌আমার প্রধান সমস্যা, আমি আজও জানি না ও আমায় ভালবাসে কি না। কতদিন আমি ভেবেছি, ওর কাছে গিয়ে মুখোমুখি জিজ্ঞাসা করব, এই কথার উত্তর চাইব; কিন্তু সাহস হয় নি। একদিন এগিয়েও ছিলাম, কিন্তু ওর শান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে আমার কথা বলবার শক্তি হারিয়ে গেছল, অসাড়তা লাভ করেছিল চেতনা। ভাল ও আমায় বাসে কি জানি না, তবে সমীহ করে, এটা ভালরকম জানি।’‌
আবার এই অরুণ বাবা–‌মাকে ছেড়ে গৃহত্যাগী। কিছুতেই কলকাতায় ফিরছেন না। তখন কিঞ্চিত স্নেহের শাসন, কিঞ্চিত হুমকি। সাধুভাষায় কিঞ্চিত ভর্ৎসনাও। অসুস্থ বাবা–‌মার পাশে থাকার চেয়ে বৃহত্তর ও মহত্তর কাজ কিছু হতে পারে না, এ কথা যেমন স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তেমনই তাঁকে কলকাতায় ফিরে আসার নির্দেশও দিয়েছেন। চিঠিটি পড়লেই এর পরতে পরতে অন্য এক সুকান্তকে খুঁজে পাওয়া যাবে—

‘‌শতশত সেলাম পূর্বক নিবেদন,
পরমারাধ্য বাবাজী, আপনার আকস্মিক অধঃপতনে আমি বড়ই মর্মাহত হইলাম। ইতোমধ্যে শ্রবণ করিয়াছিলাম আপনি সন্ন্যাস অবলম্বন করিয়াছেন, তখন মানসপটে এই চিন্তাই সমুপস্থিত হইয়াছিল যে ইহা সাময়িক মত্ততা মাত্র; কিন্তু অধুনা উপলব্ধি করিতেছি আমার ভ্রম হইয়াছিল। এমতাবস্থায় ইহাই অনুমিত হইতেছে যে কাহারও সুমন্ত্রণায় আপনি এই পথবর্তী হইয়াছেন। অতএব আমার জিজ্ঞাস্য এই যে, বৃদ্ধ পিতা এবং অসুস্থা মাতার প্রতি ঐহিক কর্তব্যসকল পদাঘাতে দূরীভূত করিয়া কোন নীতিশাস্ত্রানুযায়ী পারলৌকিক চরমোন্নতি সাধনের নিমিত্ত আপনি এক মোহমার্গ সাধনা করিতেছেন? এক্ষেত্রে আমার নিবেদন এই যে, অচিরে এই সৎসঙ্গ পরিত্যাগপূর্বক আপনার এই অস্বাভাবিকতা বর্জন করিয়া স্বীয় কর্তব্যকরণে প্রবৃত্ত হউন। আপনার পিতাঠাকুরের নির্দেশমত আপনার কলিকাতায় আসিয়া থাকাই আমার অভিপ্রায়। এ স্থানেও সৎসঙ্গের অনটন হইবে না, উপরন্তু আমার মতো অসতের সহিত দুই-চারিটা কথোপকথনের সুবিধাও মিলিবে, অবশ্য ইহা আমারই সৌভাগ্যজনক হইবে। যদিচ এ আশা নিত্যন্তই অকল্পেয়, তথাপি চিন্তা করিতে দোষ কি? আমার দুইখানি পত্রে যে সকল আবেগময় গোপন কথা লিখিয়াছিলাম, তাহার উত্তরের আশা বিসর্জন দিয়াছি; কিন্তু এ পত্রের বিস্তৃত উত্তর না পাইলে ইহাই আমার শেষ চিঠি জানিবেন।

ইতি-
দাসানুদাস,
সেবক-শ্রীসুকান্ত’‌

একদিকে যেমন বন্ধু অরুণকে নানা বিষয়ে লিখে গেছেন, তেমনই কিশোর বাহিনীর কর্মসচিব সুকান্ত আবার অন্য ঘরানার। বিভিন্ন জেলা থেকে সতীর্থরা চিঠি লিখতেন। কী কী করণীয়, জানতে চাইতেন। তাঁদের প্রতিটি চিঠির উত্তর দিতেন। সেই চিঠি হয়তো খুব দীর্ঘ নয়। কিন্তু একজন কমিউনিস্ট কর্মীর কী করণীয়, সেই দিকনির্দেশ এখনও বেশ প্রাসঙ্গিক। ভারী ভারী তাত্ত্বিক কথা নয়। জ্ঞানগর্ভ নির্দেশ নয়। খুব সহজ ভাষায়, সহজ কর্তব্যটুকু বুঝিয়ে দিয়েছেন। সেখানে তিনি অনুজ সতীর্থকে লিখছেন—
‘‌প্রিয় বন্ধু,
            তোমরা কী ধরনের কাজ করবে জানতে চেয়েছ তাই জানাচ্ছি, তোমরা প্রথমে নিজেদের লেখাপড়া ও আচার ব্যবহার-চরিত্রের উন্নতির দিকে নজর দেবে। নিজেদের স্বাস্থ্য ও খেলাধুলার দিকেও নজর দেবে সেই সঙ্গে। তোমরা গরীব ও অসুস্থ ছেলেদের সব সময় সাহায্য এবং সেবা করার চেষ্টা করবে, নিজের পাড়ার বা গ্রামের উন্নতির জন্য প্রাণপণ খাটবে। আর এই সমস্ত কাজ দেখিয়ে অভিভাবকদের মন জয় করার চেষ্টা করবে।’‌

ব্যক্তিগত পরিসরের চিঠিগুলো একটু অন্যরকম। কাশীতে থাকা মেজ বৌদিকে লেখা চিঠিতে সুকান্ত বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি নির্জনতার কবি নন। তিনি জনতার কবিই হতে চান। তিনি যে কমিউনিস্ট, বেশ গর্বের সঙ্গেই এই কথা জানিয়েছেন। টেনে এনেছেন রবীন্দ্রনাথকেও—
‘‌আমরা নির্জনতাপ্রিয় একথা সম্পূর্ণ মিথ্যে। সাময়িকভাবে নির্জনতা ভাল লাগলে যে চিরকালই ভাল লাগবে এমন কথা আমরা বলি না। .‌.‌.‌ আর আমি কবি বলে নির্জনতাপ্রিয় হব, আমি কি সেই ধরনের কবি? আমি যে জনতার কবি হতে চাই, জনতা বাদ দিলে আমার চলবে কি করে? তা ছাড়া কবির চেয়ে বড় কথা আমি কমিউনিস্ট, কমিউনিস্টদের কাজ-কারবার সব জনতা নিয়েই। সুতরাং সংকোচের বিহ্বলতা নিজের অপমান। ’‌
ব্যক্তিগত চিঠির মাঝেও বারেবারেই উঁকি দিয়েছে তাঁর রাজনৈতিক সত্তা। বেড়াতে গেছেন বারাণসীতে। চারপাশে এতকিছু দেখছেন, মুগ্ধ হচ্ছেন। কিন্তু তাঁর মাঝেও তাঁর অবস্থান বড় স্পষ্ট—
‘‌কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় দেখলাম, যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ‘ছাত্র নিবাস-মূলক’ বিশ্ববিদ্যালয়। আর দেখলাম গান্ধীজী পরিকল্পিত ভারতমাতার মন্দির। দুটোতেই ভাল লাগার অনেক কিছু থাকা সত্ত্বেও ধর্মের লেবেল আঁটা বলে বিশেষ ভাল লাগল না। আর সবচেয়ে ভাল লাগল সারনাথ। তার ঐতিহাসিকতায়, তার নির্জনতায়, তার স্থাপত্যে আর ভাস্কর্যে, তার ইটপাথরে খোদিত কর্মগাথায় সে মহিমময়।’‌
‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌
বন্ধু অরুণের মতোই সুকান্তর আরও এক পরম আশ্রয় ছিলেন অরুণাচলের মা সরলা বসু। শৈশবেই মাতৃহারা সুকান্ত অরুণের মা–‌কেও ‘‌মা’‌ বলেই সম্বোধন করতেন। সুলেখিকা সরলাও মাতৃস্নেহে কোনও কার্পণ্য রাখেননি। একদিকে তিনি সুকান্তের লেখার গুণগ্রাহী। অন্যদিকে তাঁর শরীর ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে বেশ উদ্বিগ্ন। শুরুর দিকে সুকান্তর মধ্যে কিছুটা জড়তা ও সংকোচ থাকলেও, যত সময় এগিয়েছে, সরলাদেবীর কাছেও একটু একটু করে মেলে ধরেছেন নিজেকে। চারপাশের জগৎ সম্পর্কে তিনি তখন ক্রমশ বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ছেন। পরম আশ্রয় খুঁজেছেন সেই সরলার মাতৃস্নেহেই। একটি চিঠিতে সুকান্ত লিখছেন—

‘‌ঠিক এই সময়ে আপনার পবিত্র সান্নিধ্য পেলে আমি নিজেকে এতটা অসহায় মনে করতুম না—  এই কথা ভেবে মনে পড়ে। চিঠি লেখার অন্যতম কারণ হচ্ছে এই।
            বাস্তবিক, আমি কোথাও চলে যেতে চাই, নিরুদ্দেশ হয়ে মিলিয়ে যেতে চাই… কোনো গহন অরণ্যে কিংবা অন্য যে কোন নিভৃততম প্রদেশে.‌.‌.‌নিদেনপক্ষে আপনাদের ওখানে যেতে পারলেও গভীর আনন্দ পেতাম, নিষ্কৃতির বন্য আনন্দ, সমস্ত জগতের সঙ্গে আমার নিবিড় অসহযোগ চলছে। এই পার্থিব কৌটিল্য আমার মনে এমন বিস্বাদনা এনে দিয়েছে, যাতে আমার প্রলোভন নেই জীবনের ওপর।… এক অননুভূত অবসাদ আমায় আচ্ছন্ন করেছে। সমস্ত পৃথিবীর ওপর রুক্ষতায় ভরা বৈরাগ্য এসেছে বটে, কিন্তু ধর্মভাব জাগে নি। আমার রচনাশক্তি পর্যন্ত ক্ষীণ হয়ে এসেছে মনের এই শোচনীয় দুরবস্থায়। প্রত্যেককে ক্ষমা করে যাওয়া ছাড়া আজ আর আমার অন্য উপায় নেই। আচ্ছা, এই মনোভাব কি সবার মধ্যেই আসে এক বিশিষ্ট সময়ে?’‌

সুকান্তর আরও এক সুহৃদ ছিলেন মাসতুতো ভাই ভূপেন। তাঁকেও বেশ কিছু চিঠি লিখেছেন। উঠে এসেছে অবসাদের কথা, ‘‌আমার কর্মশক্তিও যাত্রার প্রারম্ভেই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ছে এই ধুলিধূসরিত কুয়াশাচ্ছন্ন পথেই। অবসাদের শূন্যতা জানিয়ে দেয় পথ অনেক কিন্তু পেট্টোল নেই। তোমারা দিতে পার এই পেট্টোলের সন্ধান? বহুদিন অব্যবহৃত ষ্টীয়ারিংএ মরচে পড়ে গেছে, সে আর নড়তে চায় না, ঠিক পথে চালায় না— আমাকে। তোমরা মুছিয়ে দিতে পার সেই মলিনতা, ঘুচিয়ে দিতে পার তার অক্ষমতা?’‌
হাসপাতাল থেকেও ভূপেনের উদ্দেশে লিখেছেন চিঠি—            
‘‌হাসপাতালের ছককাটা দিন ধীর মন্থর গতিতে কেটে যাচ্ছে। বিছানায় শুয়ে সকালের ঝকমকে রোদ্দুরকে দুপুরে দেবদারু গাছের পাতায় খেলা করতে দেখি। ঝিরঝির ক’রে হাওয়া বয় সারাদিন। রাত্রিরে চাঁদের আলো এসে লুটিয়ে পড়ে বিছানায়, ডালহাউসী স্কোয়ারের অপিসে বসে কোনো দিনই অনুভব করতে পারবি না এই আশ্চর্য নিস্তব্ধতা। এখন দুপুর—  কিন্তু চারিদিকে এখন রাত্রির নৈঃশব্দ: শুধু মাঝে মাঝে মোরগের ডাক স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, এটা রাত্রি নয়-দিন।
            রেডিও, বই, খেলাধুলো—  সময় কাটানোর অনেক উপকরণই আছে, আমার কিন্তু সবচেয়ে দেবদারু গাছে রোদের ঝিকিমিকিই ভাল লাগছে। উড়ে যাওয়া বাইরের খণ্ড খণ্ড মেঘের দিকে তাকিয়ে বাতাসকে মনে হয় খুবই উপভোগ্য। এমনি চুপ ক’রে বোধহয় অনেক যুগ অনেক শতাব্দী কাটিয়ে দেওয়া যায়।’‌
সেই হাসপাতাল থেকেই লিখছেন আরও একটি চিঠি। এবারও প্রাপক সেই ভূপেন—
            ‘‌বেশ কাটছে এখানে। সবাই এখানে আপন হয়ে উঠছে, ভালবাসতে আরম্ভ করেছে আমাকে। ডাক্তার রোগী সবারই আনন্দ আমার সঙ্গে রসিকতায়! এক এক সময় মনে হয় বেশ আছি— শহরের রক্তাক্ত কোলাহলের বাইরে এই নির্জন, শ্যামল ছোট্ট একটু দ্বীপের মতো জায়গায় বেশ আছি। .‌.‌.‌ এখন আছি বদ্ধ-দীঘির জগতে; সেখান থেকে লাফ দিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে মাছের মতো, কর্মচাঞ্চল্যময় পৃথিবীর স্রোতে।’‌

এবার ঠিকানা বদল। পার্টির রেড কিওর হোম নয়, এবার তাঁকে আনা হল যাদবপুর টিবি হাসপাতালে। সময়টা ১৯৪৭। দেশ স্বাধীনতার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এদিকে, যেন মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন কিশোর কবি। সেই সময়ের নানা লেখায় ঘুরেফিরে এসেছে সেই মৃত্যু চেতনা। কেউ কেউ এসে দেখা করে যাচ্ছেন। বারবার চাইছেন, অরুণ একে একবার দেখা করে যান। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক, এক সপ্তাহ পরেও অরুণ আসেননি। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই লিখলেন চিঠি। এটাই ছিল প্রাণের বন্ধু অরুণকে লেখা শেষ চিঠি—
            ‘‌সাতদিন হয়ে গেল এখানে এসেছি। বড় একা-একা ঠেকছে এখানে। সারাদিন চুপচাপ কাটাতে হয়। বিকেলে কেউ এলে আনন্দে অধীর হয়ে পড়ি। মেজদা নিয়মিত আসে, কিন্তু সুভাষ নিয়মিত আসে না। কাল মেজবৌদি, মাসিমাকে নিয়ে মেজদা এসেছিল। চলে যাবার পর মন বড় খারাপ হয়ে গেল। বাস্তবিক শ্যামবাজারের ঐ পরিবেশ ছেড়ে এসে রীতিমত কষ্ট পাচ্ছি।
           তুই কি এখনো দাঙ্গার অবরোধের মধ্যে আছিস? না কলকাতায় যাতায়াত করতে পারছিস? যাই হোক, সুযোগ পেলেই আমার সঙ্গে দেখা করবি। দেখা করবার সময়-বিকাল চারটে থেকে ছ’টা। শিয়ালদা দিয়ে ট্রেনে করে আসতে পারিস, কিম্বা ৮এ বাসে। এখানে ‘লেডী মেরী হার্বাট ব্লক’ এক নম্বর বেডে আছি। আশা করি আমার চিঠি পাবি। দেখা করতে দেরি হলে চিঠি দিস।’‌

চিঠির স্রোত থেমে গেল। থেমে গেল একটি জীবনের স্পন্দন। রয়ে গেল কত না লেখা কবিতা। ঠিক কত চিঠি লিখেছেন সুকান্ত?‌ জানার উপায় নেই। কারণ, সেই চিঠি সংরক্ষণের কোনও ব্যবস্থা ছিল না। আপনমনে লিখেছেন, পাঠিয়ে দিয়েছেন। আবার অনেক চিঠি হয়তো না পাঠানোও থেকে গেছে। তিনি কাদের লিখেছেন, তিনিই জানেন। কয়েকজনকে লেখা চিঠি সংগ্রহ করা গেছে। কিন্তু তার বাইরেও আরও কত প্রাপক আছেন, কে জানে!‌ বুদ্ধদেব গুহ লিখেছিলেন, ‘‌একজন মানুষকে সবথেকে ভাল চেনা যায় তাঁর চিঠিতে। সেখানে শুধু তাঁকে নয়, তাঁর চারপাশটাও চেনা যায়। তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষদেরও চেনা যায়।’ রবীন্দ্রনাথও হাজার হাজার চিঠি লিখেছেন। বাংলা পত্রসাহিত্যকে অন্য এক দিশা দেখিয়েছেন। সেই চিঠি তাঁর জীবদ্দশাতেই বই হয়ে বেরিয়েছে। তিনি জানতেন, তাঁর প্রতিটি চিঠির মূল্য কতখানি। তাঁর একটা বেফাঁস মন্তব্য তাঁর ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিতে পারে। তাই চিঠি লেখার সময় রবীন্দ্রনাথ বা দিকপাল মানুষেরা থেকেছেন সতর্ক। কিন্তু সুকান্তর ক্ষেত্রে সে কথা খাটে না। ১৬–‌১৭ বছরের কিশোর সুকান্ত নিশ্চয় ভাবেননি তাঁর চিঠি সংকলন হয়ে বেরোবে। তাই তাঁর সতর্ক থাকার দায় ছিল না। তাঁর ‘‌ডিপ্লোম্যাট’ হওয়ার চেষ্টাও ছিল না।‌ যখন যা মনে এসেছে, অকপটে সেটাই লিখেছেন। তাই সেদিক থেকে দেখতে গেলে এই চিঠি আরও বেশি খাঁটি। কোনও দেখনদারি নেই, নিজের অনুভূতিকে রেখেঢেকে রাখার চেষ্টাও নেই। ‌চিঠির পাতায় তিনি যেন একেবারেই খোলা খাতা। একলহমায় তাঁকে, তাঁর ভাবনাকে পড়ে নেওয়া যায়।

কিন্তু এত বছর পরেও সেই কবিতা, সেই চিঠি যেন ফিরে ফিরে আসে। সিলেবাসে ব্রাত্য করে দিলেও মনের গহিন কোণে কোথাও না কোথাও তিনি থেকে গেছেন। সমকালের চৌকাঠ পেরিয়ে মহাকালে এসেও সেই চিঠির আকর্ষণ ফুরোয় না, বরং শতবর্ষের আলোয় আরও বেশি করে জীবন্ত হয়ে ওঠে।  

**********

Previous post মন জুড়ে তখন শুধুই রঞ্জিত মল্লিক
Next post হিন্দিতে অগ্নীশ্বর করতে চেয়েছিলেন অমিতাভ!‌

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *