বৃষ্টি চৌধুরি
প্রিয় তসলিমা,
বয়সে আপনি অনেকটাই বড়। তবু আপনাকে তসলিমা নামেই সম্বোধন করছি। জানি, বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে এমন সম্বোধন কিছুটা বেমানান। কিন্তু কী নামেই বা সম্বোধন করব। দিদি বলতে যে পরিচিতি লাগে, তা তো নেই। তাছাড়া, আপনি যে সময় শহর ছেড়েছেন, আমি তখনও স্কুলে যাওয়াই শুরু করিনি। আপনার বয়স আমার দ্বিগুনেরও বেশি। বয়সের কথা মাথায় রাখলে বলা যেত, আন্টি। কিন্তু কবির বয়স হয় না। তার থেকে ‘তসলিমা’ শব্দটাই ভাল। তসলিমা তো শুধু নাম নয়, তসলিমা একটা সাহস, তসলিমা একটা জড়তার প্রাচীর ভাঙা চরিত্র, তসলিমা নামটা একসঙ্গে অনেক কিছুর প্রতীক।
উনিশ বছর পর আপনি কলকাতায় ফিরেছেন। কথাটা লিখতে গিয়েই কেমন যেন বুকের ভিতরটা ভার হয়ে আসে। ফিরে এলাম বলতেই উনিশ বছর লেগে গেল। উনিশ বছর খুব কম সময় নয়। একটা শিশুর জন্ম হয়, বড় হয়ে স্কুলে যায়, কলেজে ওঠে—এই সময়ের মধ্যে। একটা শহরও বদলে যায়। কত বাড়ি ভাঙে, কত নতুন বাড়ি ওঠে, কত রাস্তার চেহারা পাল্টায়। মানুষ আসে, মানুষ চলে যায়। সরকারও বদলে যায়।
কিন্তু কিছু সম্পর্কের বয়স হয় না। কলকাতার সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা বোধহয় তেমনই। আপনি যখন এই শহর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, তখন আপনাকে চেনার বয়সই হয়নি। একটু বড় হয়ে আপনার বই পড়েছি, আপনার লেখা নিয়ে বিতর্ক শুনেছি, আপনার বিরুদ্ধে কথা শুনেছি, আপনার পক্ষেও শুনেছি। আপনাকে নিয়ে এত কথা হয়েছে যে, অনেক সময় মনে হয়েছে—আপনি বুঝি শুধু একজন লেখক নন, নিজেই একটা বিতর্ক। আপনার সেই বেড়ালকে নিয়ে চূর্ণী গাঙ্গুলির সেই ছবিটাও দেখেছি। চূর্ণীকে অবিকল যেন আপনার মতোই লাগছিল। নির্বাসিতা নারীর যন্ত্রণা কী চমৎকার ফুটিয়ে তুলেছিলেন!
ধীরে ধীরে বুঝেছি, বিতর্কের আড়ালে আসলে একজন মানুষ আছেন। একজন নারী, যিনি নিজের কথা নিজের মতো করে বলতে চেয়েছেন। আর সেই চাওয়াটাই হয়তো অনেকের কাছে এত অসহ্য হয়ে উঠেছিল। আমি নিজেও একজন নারী। তাই আপনার সঙ্গে আমার একটা অদৃশ্য সম্পর্ক আছে।
আপনার সব কথা আমি সমর্থন করি না। আপনার সব মতের সঙ্গে আমার মিলও নেই। কিন্তু একটা জায়গায় আপনাকে অস্বীকার করতে পারি না—নিজের কথা বলার অধিকারটুকু আপনি কাউকে দিয়ে দেননি। এত বছরের নির্বাসন আপনাকে ভেতরে ভেতরে রক্তাক্ত করেছে। কিন্তু আপনার লেখনি থামিয়ে দিতে পারেনি। তা যেন আরও মার্জিত। আরও সংবেদনশীল।
এই শহরেই তো আপনি লিখেছিলেন, ভালোবেসেছিলেন, বন্ধুত্ব করেছিলেন, ঘুরেছিলেন। এই শহরের বইমেলা, কলেজ স্ট্রিট, গঙ্গার হাওয়া, রাস্তাঘাট—সব কিছুর সঙ্গে আপনার কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তারপর একদিন সেই শহরেই আপনার থাকা অসম্ভব হয়ে গেল। একজন মানুষকে তার নিজের শহর থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া কতটা কষ্টের, তা হয়তো বাইরে থেকে বোঝা যায় না। এই যন্ত্রণা ভেতরে ভেতরে আপনি বয়ে বেড়িয়েছেন।
উনিশ বছর পরে আপনি আবার এসেছেন। জানি না এই ফিরে আসাকে আপনি সত্যিই ‘ঘরে ফেরা’ বলে মনে করছেন কি না। ঘর তো শুধু একটা শহর নয়। ঘর মানে নিরাপত্তা। ঘর মানে নিজের মতো করে নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা। ঘর মানে ভয় না পাওয়া। তবু কলকাতা আপনাকে দেখে আজ অন্তত এটুকু বলতে চায়—আপনাকে আমরা ভুলিনি। সেদিন রবীন্দ্র সদনে আমি থাকিনি। থাকার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সেখানে এত মানুষের ভিড়, তাঁদের হাতে নিশ্চয় আমন্ত্রণপত্র ছিল। আমাকে কেই বা আমন্ত্রণ পত্র দেবে! কেনই বা দেবে! তার থেকে মনে হয়েছিল, টিভির সামনে বসে আপনাকে দেখাই ভাল।
এই শহরে আপনার জন্য যেমন সমালোচনা আছে, তেমনই ভালোবাসাও আছে। প্রশ্ন আছে, মতবিরোধ আছে, অভিমান আছে। কিন্তু আপনাকে ঘিরে যে কৌতূহল, যে টান, তা এত বছর পরেও ফুরোয়নি। হয়তো এটাই কলকাতার স্বভাব। যাকে একবার নিজের মানুষ ভাবে, তাকে পুরোপুরি ভুলতে পারে না।
তাই ফিরে আসার এই মুহূর্তে আপনাকে কোনও বড় কথা বলতে চাই না। শুধু বলতে চাই, আবার কলকাতার রাস্তায় হাঁটুন। গঙ্গার ধারে বসুন। বইয়ের দোকানে ঢুকুন। কোনও পুরনো বন্ধুর সঙ্গে চা খান। শহরটাকে আবার নিজের চোখে দেখুন। এ কলকাতার মধ্যে আছে আরেকটা কলকাতা— সেটা আপনার থেকে ভাল কে জানে!
স্বাগতম, তসলিমা। এবার একটু ধীরে হাঁটুন। এই শহরটাকে আবার নতুন করে চিনে নিন। আর যদি কখনও মনে হয়, সত্যিই ঘরে ফিরেছেন—তাহলে জানবেন, কলকাতাও হয়তো আপনাকে নিজের মেয়ে বলেই মনে রেখেছিল।
