সরল বিশ্বাস
খেলা শুরু রাত সাড়ে বারোটায়। স্বাভাবিক নিয়মেই খেলা শেষ হতে রাত আড়াইটে বাজার কথা। আপাতভাবে আমরা নব্বই মিনিট ধরি। কিন্তু মাঝে পনেরো মিনিটের বিরতি। দুই অর্ধে দু’বার ইনজুরি টাইম। সবমিলিয়ে অন্তত দু’ঘণ্টারই ব্যাপার।
বিশ্বকাপ ফাইনাল বলে কথা। মাঝে প্রায় আধঘণ্টার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। খেলা নব্বই মিনিটে শেষ হল না। অতএব এক্সট্রা টাইম। মানে, আরও আধঘণ্টা। বিরতি, ইনজুরি টাইম। সবমিলিয়ে আরও প্রায় আধঘণ্টা। অর্থাৎ, শেষ বাঁশি বাজতে রাত পৌনে চারটে। এরপর কেউ উল্লাস করছেন, কেউ হতাশ। কেউ সারা মাঠে ছুটে বেড়াচ্ছেন। মাঠে কাতারে কাতারে লোক। পুরস্কার বিতরণী শুরু হতে অন্তত আধঘণ্টা। সেখানে কাপ দেওয়া হবে সবার শেষে। তার আগে রেফারিদের পুরস্কার। সব দলের ফুটবলারদের আলাদা করে পুরস্কার। নানা বিভাগের সেরাদের পুরস্কার। সবার শেষে কাপ দেওয়া। তারপর সেই কাপ নিয়ে আরও একপ্রস্থ সেলিব্রেশন। এই সব হতে হতে প্রায় ভোর।
খবরের কাগজের ব্যস্ততা তখন কেমন? তা নিয়ে লিখতে গেলে একটা দীর্ঘ উপন্যাস হয়ে যেতে পারে। একেকজন একেক কাজে ব্যস্ত। কেউ বিশেষজ্ঞের লেখা লিখছেন। কেউ মুড কপি লিখছেন। কেউ বিভিন্ন পরিসংখ্যান দেখছেন। কেউ প্রুফ দেখছেন। বিদেশ থেকে দ্রুত কেউ কপি পাঠাচ্ছেন। কেউ এডিট করছেন। কেউ হয়তো ছবি সিলেকশন করছেন। কেউ দ্রুত ছবি কারেকশন করছেন। কেউ ক্যাপশনে মন দিয়েছেন। কেউ ভাবছেন শিরোনাম নিয়ে। কেউ পাতার ডিজাইন সাজাচ্ছেন। ট্রফি দেওয়ার দশ মিনিটের মধ্যেই পেজ রিলিজ হয়ে গেল। তারপর সেটা পিডিএফ হচ্ছে, প্রেসে যাচ্ছে। প্রেসের কর্মীরা নিজের ইনজের কাজে ব্যস্ত। কেউ কেউ গুনে গুনে প্যাকিং করছেন। কেউ গাড়িতে তুলছেন। কোনও গাড়ি ছুটছে শিয়ালদার দিকে, কোনওটা হাওড়ার দিকে। কোনওটা ধর্মতলার দিকে। কেউ আবার বিভিন্ন সেন্টারে যাচ্ছেন কাগজ দিতে।
মোদ্দা কথা, সাড়ে চারটের পর ট্রফি দেওয়া হল। সব রকম কপি ও ছবি সমেত, সেই কাগজ বিভিন্ন সেন্টারে পৌঁছে গেল সকাল সাড়ে পাঁচটা, ছটার মধ্যে। সেখান থেকেই হকাররা কাগজ তুলছেন। আপনার বাড়িতে সেই কাগজ পৌঁছে গেল সকাল ছটা, সাড়ে ছটা নাগাদ, বড়জোর সাততা। কী আশ্চর্য, আপনি কাগজ হাতে নিয়ে দেখছেন, সেখানে প্রায় সবকিছুই আছে। ম্যাচের বিস্তারিত রিপোর্ট আছে, নানা রকম পরিসংখ্যান আছে, বিশেষজ্ঞদের লেখা আছে, আমেরিকা থেকে পাঠানো রিপোর্টারের কপি আছে, গোলের ছবি আছে, সেলিব্রেশনের ছবি আছে, হতাশার ছবি আছে, ট্রফি হাতে দৌড়ের ছবি আছে।
তাহলেই ভেবে দেখুন, ম্যাচ শেষ হওয়ার দু ঘণ্টার মধ্যে এত হাত ঘুরে সেই কাগজ আপনার বাড়িতে চলে এল।
অথচ, সিবিআই বা ইডির চার্জশিট কোর্টে জমা হতে তিন বছর, চার বছর লেগে যায়। একটা শুনানির পর পরবর্তী শুনানির জন্য দু মাস, তিন মাসের সময় দেওয়া হয়। সমস্ত খবরের কাগজের কর্মীরা যেটা দু’ঘণ্টায় করে ফেলেন, রাষ্ট্রের এত এত ক্ষমতা ও প্রযুক্তি নিয়ে সিবিআই সেটা এক বছর লাগিয়ে দেয়। এরপর ভেবে দেখুন, সিবিআই–কে গালাগাল দেবেন নাকি খবরের কাগজকে গালাগাল দেবেন।
এখন নাকি কাগজ পড়া যায় না। সব কাগজ ‘চটিচাটা’— এমনটাই তো গত কয়েক বছরে শুনে এসেছি। অথচ, যে লোকগুলো সিবিআই–কে চালনা করেন, তাঁদের নামে জয়ধ্বনি দেওয়া যায়।
বছরের পর বছর, নানা তদন্তে সিবিআই আর ইডি নামের দুটো সংস্থা যে কী সীমাহীন অপদার্থতার পরিচয় দিয়েছে, তা এর পরেও বুঝবেন না! এই সিবিআই–কে যাঁরা বছরের পর বছর চালাচ্ছেন, তাঁদের কবে আর লজ্জা হবে!
সিবিআই কর্তাদের বরং খবরের কাগজে কয়েক মাসের জন্য ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠানো হোক। কীভাবে দ্রুত কাজ করতে হয়, ভাল করে শেখানো হোক।
