উত্তম জানা
বছর দুই আগের কথা। এঁরাই বলেছিলেন, ‘আমাদের নেত্রী দেশের সেরা মুখ্যমন্ত্রী। তাঁকে এবার প্রধানমন্ত্রীর আসনে দেখতে চাই।’ এখানেই নেমে থাকেননি। এঁরাই বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশকে রসাতলে পাঠাচ্ছেন। বিজেপি দেশের সংস্কৃতিকে উচ্ছন্নে পাঠাচ্ছে।
অর্থাৎ, একদিকে নেত্রীর ঢালাও প্রশস্তি। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর নামে তীব্র সমালোচনা। অথচ, বিধানসভার ফল একটু উল্টে যেতেই এঁদের অবস্থান যেন একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গেল। এখন তৃণমূল নামটা শুনতেও এঁদের যত আপত্তি। অন্যদিকে, দন্ত বিগলিত করে প্রধানমন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর কথা শুনছেন। এখন তাঁদের কথা শুনে মনে হবে, তৃণমূলের মতো খারাপ দল নেই। আর বিজেপির মতো ভালো দল সারা পৃথিবীতে নেই।
তাঁদের এখন ঠিকানা কী? তাঁরা নাকি এনডিএ–র শরিক। তাঁরা নাকি এখন এনসিপিআই–এর সাংসদ। অথচ, কয়েক মাস আগে এই সাংসদেরা এই দলটির নামই শোনেননি। কিন্তু এনসিপিআই বললে যদি এলাকায় কেউ পাত্তা না দেয়! যদি বিজেপি কর্মীরা বিক্ষোভ দেখান! যদি পরেরবার টিকিট না পাওয়া যায়! তাই এঁদের অধিকাংশই সরাসরি বিজেপিতে যাওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করছেন। আপাতত বিজেপি অবশ্য সরাসরি দরজা খুলতে খুব একটা উৎসাহী নয়।
রাজনীতিতে দলবদল নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। যে ভোটে একজন প্রার্থী নির্বাচিত হলেন, সেই ভোটের রাজনৈতিক পরিচয়টুকু কি তাঁর সঙ্গে থাকবে না? তৃণমূলের প্রতীকে ভোট দিয়ে যে মানুষটি একজন সাংসদকে দিল্লিতে পাঠালেন, তিনি কি তাঁকে এনডিএ–র সাংসদ হিসেবে পাঠিয়েছিলেন? অবশ্যই নয়। তিনি ভোট দিয়েছিলেন একটি নির্দিষ্ট দল, তার প্রতীক এবং তার রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে। অথচ নির্বাচনের পর সেই অবস্থান বদলে গেল। যুক্তি হতে পারে—জনস্বার্থ, উন্নয়ন, এলাকার স্বার্থ। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই ‘উন্নয়ন’-এর ঠিকানা কি ভোটের আগে জানা ছিল না?
এখানেই গণতন্ত্রের অস্বস্তি। ২০ জন তৃণমূল সাংসদ পৃথক গোষ্ঠী হিসেবে এনসিপিআই–তে যাওয়ার ঘোষণা করেছিলেন এবং পরে এনডিএ–র সংসদীয় বৈঠকে যোগ দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, বাংলার উন্নয়নের স্বার্থেই তাঁরা কেন্দ্রের শাসক জোটকে সমর্থন করছেন। যুক্তিটা শুনতে হয়তো বেশ সুন্দর। কিন্তু গণতন্ত্রে সৌন্দর্যের পাশাপাশি জবাবদিহিও দরকার। ন্যূনতম মূল্যতম, ন্যূনতম চক্ষুলজ্জাটুকু তো থাকতে হয়। এঁরা সেটুকুও বিসর্জন দিয়েছেন। ভোটার যদি বিরোধী দলকে ভোট দেন, আর নির্বাচিত প্রতিনিধি পরদিন ক্ষমতাসীন শিবিরের পাশে দাঁড়ান, তাহলে ভোটের পছন্দটির মূল্য কোথায় থাকে?
এখানে আরও একটি মজার দিক আছে। বিজেপিও আপাতত এই ‘পর্যটকদের’ সবাইকে নিজের ঘরে তুলে নিতে চাইছে না। বঙ্গ বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য জুন মাসেই বলেছিলেন, তৃণমূলের নেতাদের জন্য বিজেপির দরজা বন্ধ; ‘তৃণমূলীকরণ’ হতে দেওয়া হবে না। ’ কিন্তু কতদিন এই দরজা বন্ধ থাকবে! যে কোনওদিন সেই আলিবাবা চল্লিশ চোরের মতো শোনা যাবে, ‘খুল যা সিম সিম’।
একদিকে বিরোধী শিবির থেকে সাংসদ বেরিয়ে এসে শাসক জোটকে সমর্থন করছেন। অন্যদিকে শাসক দলেরই একটি অংশ বলছে—এসে দাঁড়ান, কিন্তু আমাদের দলের সদস্য হওয়ার দরজা এখনই খোলা নেই। রাজনীতির অভিধানে এর নাম হয়তো কৌশল। সাধারণ মানুষের অভিধানে? সুবিধামতো অবস্থান বদল।
আর এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা বিজেপির কাছেও। যদি তৃণমূল থেকে আসা নেতাদের বিরুদ্ধে এতদিন এত অভিযোগ থাকে, তাঁদের ‘দূষিত রাজনীতি’র বিরুদ্ধে এত কথা বলা হয়ে থাকে, তাহলে তাঁদের সমর্থন হঠাৎ এত মূল্যবান হয়ে ওঠে কেন? আবার যদি তাঁরা সত্যিই জনস্বার্থে নতুন অবস্থান নেন, তাহলে তাঁদের গ্রহণ করতে দ্বিধা কোথায়? আসলে উত্তরটা সম্ভবত খুব সরল—রাজনীতিতে নীতি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সংখ্যাও ততটাই। ক্ষমতার অঙ্কে একটি সাংসদ মানে একটি ভোট। একটি ভোট মানে কখনও একটি বিলের হিসাব বদলে যাওয়া। আর সেই অঙ্কে ভোটারের দেওয়া রায় কোথায় থাকে, সেটাই ক্রমশ বড় প্রশ্ন।
দলবদলের এই সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত মানুষকে একটি বিপজ্জনক শিক্ষা দেয়—ভোট আপনার, কিন্তু ভোটের পর সিদ্ধান্ত আমার।তখন নির্বাচিত প্রতিনিধি আর দলের প্রতীকের প্রতিনিধি থাকেন না; হয়ে ওঠেন নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রতিনিধি। গণতন্ত্রের জন্য এর চেয়ে বড় প্রহসন আর কী হতে পারে? ভোটের আগে দরকার জনতার সমর্থন। ভোটের পরে দরকার ক্ষমতার সমর্থন। বেচারা ভোটার! তাঁর ভোটের কোনও মূল্যই রইল না। তাঁর ভোটকে কার্যত নিলামেই তোলা হল।
