বৃষ্টি চৌধুরি
কোনও ছবির সিকুয়েল হলে, সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জার হয়ে দাঁড়ায় আগের ছবি। কোনও ছবি হিট বা সফল হলে, তখন তার সিকুয়েল বানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। অর্থাৎ, আগের ছবির চরিত্রগুলো এক রেখে, আগের কাহিনির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে, নতুন গল্প। বা বলা যায়, আগের গল্পটাকে আরও একটু এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
প্রায়শই দেখা যায়, প্রথম ছবি যতটা দাগ কেটেছিল, দ্বিতীয় ছবি ততটা ছাপ ফেলল না। হিন্দি, বাংলা সব ভাষাতেই এর ভুরি ভুরি উদাহরণ পাওয়া যাবে। একেবারে সাম্প্রতিক কালের ছবির কথাই যদি ধরা যায়, বেলাশেষে যে উচ্চতায় পৌঁছেছিল, বেলাশুরু তেমন ছাপ ফেলতে পারেনি। সেই শিবপ্রসাদ–নন্দিতা জুটিরই হামি যতটা সাড়া ফেলেছিল, ‘হামি ২’ তেমন মনে ধরেনি। যদি কৌশিক গাঙ্গুলির কথাই ধরা যায়, বিসর্জন যতখানি মানবিক আবেদন নিয়ে হাজির হয়েছিল, বিজয়া সেই উচ্চতায় পৌঁছোতে পারেনি।
তাই কৌশিক যখন অর্ধাঙ্গিনীর দ্বিতীয় পার্ট বানাতে চাইলেন, একটা সংশয় ছিল, পারবেন তো! আগের অর্ধাঙ্গিনীর কাছাকাছি পৌঁছোনো যাবে তো! স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, এই অর্ধাঙ্গিনী (আজও অর্ধাঙ্গিনী) আগের ছবিকেও ছাপিয়ে গেছে। কী চিত্রনাট্যে, কী অভিনয়ে, কী চরিত্র নির্বাচনে, কী সংলাপে। এবারের সংলাপ অনেক বেশি বুদ্ধিদীপ্ত। অনেক বেশি ম্যাচিওরিটির ছাপ। তারই মাঝে উঁকি দিচ্ছে সূক্ষ্ম রসবোধ। চরিত্র নির্মাণে এবার অনেক বেশি যত্নশীল কৌশিক। সাদা আর কালোর মাঝে একটা লম্বা আলপথ আছে। কাউকেই এককথায় ‘সাদা’ বলে চিহ্নিত করা যাবে না। আবার কোনও চরিত্রকেই ‘কালো’ বলে বাতিলও করা যাবে না। ভাল–মন্দের নানা দ্বিধা–দ্বন্দ্ব পথ চলেছে হাত ধরাধরি করে।
মধ্যবিত্ত জীবনের টুকরো টুকরো নানা জট সুন্দরভাবে ধরা দিয়েছে। কেউ একটু দৃঢ়চেতা, কেউ আবার তুলনায় নরম। একই চরিত্রে নানা অভিঘাত। কখনও যেন তাড়া করছে দ্বিধা। পথের নানা বাঁকে এসে নানা চিন্তার স্রোত। কোনটা আসলে সঠিক পথ। উঠে এসেছে নানা প্রশ্নের ঝাঁক। যে যাঁর নিজের মতো করে সমাধানের রাস্তা খুঁজছেন। চিন্তায়, তর্কে উঠে আসছে নানা বিকল্প স্রোত। যা দর্শককে ভাবায়, কখনও ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
তবে সবথেকে বেশি করে যিনি দাগ কেটে যান, তিনি অবশ্যই চূর্ণী গাঙ্গুলি। কেন মূলস্রোত ছবি এমন অভিনেত্রীকে ঠিকঠাক ব্যবহার করতে পারেনি, জোরালো প্রশ্ন যেন তুলে দিয়ে গেলেন স্বয়ং চূর্ণী। এমন একটা চরিত্র, যার মধ্যে ছত্রে ছত্রে চ্যালেঞ্জ। প্রতিটি দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিপুণ অভিনয়ে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন চূর্ণী। নিজের ঘরণিকে এমন চরিত্রে কাস্ট করে কোনও অন্যায় করেননি পরিচালক। এমন মেধা ও মননের বিচ্ছুরণ টলিউডে আর কজনের মধ্যে পাওয়া যেত! এই ছবি জাতীয় পুরস্কার পেলে তা মোটেই অন্যায় হবে না। অভিনয়ের জন্য চূর্ণী বা চিত্রনাট্যের জন্য কৌশিকও পুরস্কার পেতেই পারেন। এই ছবি কোনও পুরস্কার না পেলে সেটাই বরং অবিচার হবে।
আরেক কৌশিক, কৌশিক সেন। তিনি যে কত বড় মাপের অভনেতা, আরও একবার তার ছাপ রাখলেন। ট্রোলের নেশায় মত্ত বাঙালি কৌশিকের প্রতি কখনই সুবিচার করেনি। আর দশজন রাজনীতির কারবারির সঙ্গে তাঁকেও কেমন গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। আপাতভাবে চরিত্রটি কালো রাংতায় মোড়া। কোথাও স্ববিরোধ, কোথাও মধ্যবিত্ত দ্বিচারিতা। কিন্তু বেলাশেষের আয়নায় যেন এই চরিত্রটাই হয়ে ওঠে আরও ঝকঝকে, আরও সাবলীল। এক চরিত্র থেকে নিজেকে ভেঙে এই নবনির্মাণের চ্যালেঞ্জটাও খুব সহজ ছিল না। উতরে গেছেন বললে কম বলা হয়। অম্বরীশ ভট্টাচার্য। বেশ নরম–সরম গোলগাল চেহারা। অদ্ভুত এক ভাল লাগার চাদর যেন গায়ে জড়িয়ে আছেন। পরম মমতায় এই চরিত্রও নির্মাণ করেছেন কৌশিক। অম্বরীশকে বাড়তি কোনও পরিশ্রম করতে হয়নি। তাঁর আচরণ ও শরীরী ভাষার সঙ্গে যেটা মানানসই, সেটাই করে গেছেন। এই না–অভিনয়টাও তো বড় একটা চ্যালেঞ্জ। ওই যে কবি লিখেছিলেন, সহজ কথা যায় না বলা সহজে।
ছবি শুরুই হল ইমনের কণ্ঠে অনুপমের সেই গান দিয়ে। ‘আমি আবার ক্লান্ত পথচারী, এই কাঁটার মুকুট লাগে ভারী। ছুঁতে গিয়েও যেন হাতের নাগালে না পাই।’ আগের ছবির সেই রেশ এই ছবিতে যেন ধরা দিল এই গানের হাত ধরেই। প্রথম থেকে দ্বিতীয় ছবিতে পা বাড়াতে গেলে, তুলনা অনিবার্য। কারণ, আগের ছবি একটা প্রত্যাশার জন্ম দেয়। পরের ছবিতে প্রথমে সেই প্রত্যাশার মর্যাদা রাখতে হয়। তারপর, সম্ভব হলে সেই প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে যেতে হয়। সেই কাজে পুরোপুরি সফল পুরো অর্ধাঙ্গিনী টিম। মেয়েরা নাকি অর্ধেক আকাশ। কিন্তু দুই অর্ধাঙ্গিনী একত্রে যেন ধরা দিলেন ‘পূর্ণাঙ্গিনী’ হয়ে। আর অর্ধেক নয়, আস্ত একটা আকাশ, যে আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরে, যে আকাশে রামধনু খেলা করে।
