‌নেপথ্যের সেই সংবাদ–‌সৈনিকদের কথা মনে পড়ে!‌

সরল বিশ্বাস

বিশ্বকাপ ফাইনাল বলে কথা। সারা পৃথিবীর চোখ সেইদিকে। কোথাও তখন সকাল, কোথাও দুপুর, কোথাও সন্ধে, আবার কোথাও মাঝরাত। ভারত হল সেই মাঝরাতের তালিকায়। শুরু হল ভারতীয় সময় রাত সাড়ে বারোটায়। বিরতি, ইনজুরি টাই, সেইসঙ্গে নব্বই মিনিট। সবমিলিয়ে অন্তত দু’‌ঘণ্টার ব্যাপার। কিন্তু ফাইনালের মাঝে ছিল নাচ–‌গানের আয়োজন। ম্যাডোনা, সাকিরা–‌সহ নানা প্রদর্শনী। তার ওপর নব্বই মিনিটে শেষও হল না। গড়াল এক্সট্রা টাইমে। অর্থাৎ শেষ বাঁশি বাজতে আরও প্রায় একঘণ্টা অর্থাৎ, খেলা শেষ হতে প্রায় সাড়ে তিনটে।

ওই যে বললাম, ফাইনাল বলে কথা। শেষ হয়েও হইল না শেষ। কারও উল্লাস, কারও কান্না। হাসি–‌কান্নার পর্বটাও অন্তত আধঘণ্টার। তারপর পুরস্কার বিতরণী। ট্রফি দেওয়া হয় সবার শেষে। তার আগে রেফারি থেকে শুরু করে প্রতিটি ফুটবলারের গলায় মেডেল পরিয়ে দেওয়া। নানা বিভাগে সেরাদের পুরস্কার দেওয়া। ট্রফি দেওয়া, ট্রফিকে নিয়ে মাঠ প্রদর্শন, গ্রুপ ছবি, উল্লাস— এসব পর্ব হতে হতে প্রায় ভোর সোয়া চারটে।

কিন্তু তারপরেও আপনার বাড়িতে সাতটার মধ্যে কাগজ পৌঁছে গেল। আপনি এখন বিস্মিত হতে ভুলে গেছেন। নইলে, অবাক হতেন কীভাবে সাড়ে চারটেয় ট্রফি দেওয়ার ছবি সকাল সাতটায় হাতে পেয়ে গেলেন। আচ্ছা, আপনার হকার কোথা থেকে কাগজ তুলেছেন। হাওড়া, শিয়ালদা, টালিগঞ্জ, শ্যামবাজার বা করুণাময়ী থেকে। অর্থাৎ, সেইসব সেন্টারে সাড়ে পাঁচটা/‌ছটার মধ্যেই কাগজ পৌঁছে গেছে। কীভাবে এই অসম্ভবটা সম্ভব হল, কখনও ভেবে দেখেছেন?‌

এর পেছনে থাকে বিরাট এক টিম ওয়ার্ক। আপনি হয়তো লক্ষ করেছেন, ফাইনালের ম্যাচরিপোর্ট কোনও প্রাক্তন ফুটবলারের নামে। তিনি সুব্রত ভট্টাচার্য হোন বা গৌতম সরকার। যে রিপোর্টার বিশ্বকাপ কভার করতে গেছেন, তাঁর নামেও বেশ কিছু লেখা। না, সেই প্রাক্তন ফুটবলার লেখেন না। তিনি বাড়িতেই ম্যাচ দেখছেন। তাঁর নামাঙ্কিত লেখাটি লেখেন আড়ালে থাকা কোনও সাংবাদিক। তিনি আগে থেকেই তৈরি থাকেন। ম্যাচ রিপোর্ট লিখতে গেলে যা যা তথ্য লাগবে, হাতের সামনে তৈরি রাখেন। তিনি সব ফুটবলারদের চেনেন। কোচেদের স্ট্র‌্যাটেজি বোঝেন। প্রাক্তন ফুটবলার হয়তো বিরতির সময় তাঁর কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরলেন। তার ভিত্তিতে কিছুটা এগিয়ে রাখা। শেষ পর্বে এসে আরও একবার সেই প্রাক্তন ফুটবলারের সঙ্গে কথা বলা। ম্যাচও শেষ, লেখাও শেষ। কত জায়গা থাকবে, কত শব্দের মধ্যে লিখতে হবে, পেজ ডিজাইনার আগাম তাঁকে জানিয়ে দেন। কম লিখলে বাড়াতে হয়, বেশি লিখলে কাটতে হয়।

এবার যিনি বিদেশে আছেন, তিনিও সেখানকার মুড কপি বিরতির পর থেকেই লিখতে শুরু করেছেন। ম্যাচ শেষের পর এক প্রস্থ পাঠিয়েও দিলেন। এবার নজর রাখলেন ম্যাচের পর কে কী করছেন। মেসি কী করলেন। ইয়ামাল এসে মেসির সঙ্গে কীভাবে হ্যান্ডশেক করলেন। মেসিই বা কীভাবে শুভেচ্ছা জানালেন। ট্রফি নেওয়ার পর স্পেনের ফুটবলাররাই বা কীভাবে সেলিব্রেট করলেন। মেসি তখন কী করছিলেন। এইসব মুহূর্ত তাঁর লেখায় বন্দি হচ্ছে। সেটিও যথাসময়ে পৌঁছে গেল। এদিকে, যাঁরা অফিসে আছেন, তাঁরা শেষ মুহূর্তে চোখ বোলালেন। রিপোর্টারের লেখায় কিছু ভুল তথ্য থাকলে ঠিক করা, কোনও তথ্য বাদ গেলে, জুড়ে দেওয়া। তাড়াহুড়োয় কোনও বাক্যে বা বানানে গন্ডগোল থাকলে ঠিক করা। কত শব্দ বরাদ্দ, সেই মাপে রাখা।

এদিকে ছবি দেখে চলেছেন এক বা একাধিক কর্মী। কোনটা লম্বা, কোনটা চওড়া, কোন ফ্রেমে কে আছেন, কোন ছবির কোয়ালিটি কেমন, দ্রুত বাছা। কখনও এজেন্সি, কখনও এক্স হ্যান্ডল, কখনও ফেসবুক। দ্রুত নামিয়ে ফেলা। সেগুলি ফটোশপে মেরামত করা। যে ‘‌র’‌ ছবিটা নামানো হয, সেটা কাগজে ছাপা হলে আবছা এসে যাবে। তাই কোয়ালিটি ঠিকঠাক করে ছাপার উপযোগী করে তোলা। দ্রুত তার ক্যাপশন রেডি করা। কেউ ভাবছেন শিরোনাম নিয়ে। ভোর রাতে নানা অ্যাঙ্গেল থেকে কপি হয়েছে। কতটা জায়গা, সেই অনুযায়ী কত শদের শিরোনাম হবে। একটি ভাবলে চলবে না। প্ল্যান এ, প্ল্যান বি, এমনকী প্ল্যান সি–‌ও ভেবে রাখা। ছবি বসাতে গিয়ে দেখা গেল, অমুক কপিটা দেড়শো শব্দ কাটতে হবে। দ্রুত কেটে ফেলা। বা পঞ্চাশ শব্দ বাড়াতে হবে, দ্রুত তা বাড়িয়ে ফেলা। সবটা খুব মসৃণভাবে হয়, এমনটাও নয়। এর পেছনে অনেক তর্ক বিতর্ক থাকে। নানা মত থাকে। নানা মতের স্তর পেরিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াও থাকে।

নিখুঁত একটা টিমওয়ার্কে কাজটা পনেরো কুড়ি মিনিটের মধ্যে হয়ে যায়। তারপর যতটা সম্ভব নির্ভুল পাতা তৈরি করে পিডিএফ করে প্রেসে পাঠানো। সেখানে প্লেট তৈরি। তারপর মেশিনে তোলা। তার আগে প্রেসের নানা রকমের টেকনিক্যাল কাজ। একদিকে ছাপা হচ্ছে, একদিকে দ্রুত বান্ডিল হচ্ছে। কোনও বান্ডিলে একশোটা, কোনও বান্ডিলে দুশো কপি, কোনওটা আবার পঞ্চাশ কপি। একের পর এক ট্রাক, মিনি ট্রাক দাঁড়িয়ে। কতগুলো বান্ডিল হাওড়ার গাড়িতে উঠবে, কতগুলো শিয়ালদার গাড়িতে উঠবে। কোনটা ধর্মতলা, কোনটা টালিগঞ্জ, কোনটা শ্যামবাজার যাবে।

ভোর সোয়া চারটেয় ট্রফি দেওয়ার পরেও, এতগুলি প্রক্রিয়া পেরিয়েও, সকাল ছটার মধ্যে কাগজের সেন্টারে কাগজ পৌঁছে যাচ্ছে। আপনার বাড়িতে সাতটায় ডেলিভারিও হয়ে যাচ্ছে। যাঁরা ভিনরাজ্যে থাকেন, তাঁদের জন্য সকাল ছটায় পিডিএফ কপিও আপলোড হয়ে যাচ্ছে।

এমনিতেই কাগজ পড়ার রেওয়াজ কমছে। তার মধ্যেও যাঁরা সকালে কাগজটা হাতে নিচ্ছেন, তাঁরা কি একবারও ভেবে দেখেছএন এই বিশাল কর্মকাণ্ড মাত্র এক দেড় ঘণ্টার মধ্যে কীভাবে সম্পন্ন হচ্ছে!‌ নেপথ্যে থাকা সেই সংবাদ–‌সৈনিকদের কথা আড়ালেই থেকে যায়।

Previous post আপনার হাতে রইল শুধুই ডিম, ঘোড়ার ডিম
Next post এমন এক্সক্লুসিভ ছবি আর হল কই!‌

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *