সরল বিশ্বাস
সত্যিই, আজব এক গ্রন্থাগার মন্ত্রী জুটেছেন।
গত পনেরো বছরে যাঁরা যাঁরা এই পদটি অলঙ্কৃত করেছেন, কেউ তেমন উজ্জ্বল ছাপ রেখে যেতে পারেননি। এই দপ্তরটিকে কার্যত কোমায় পাঠিয়ে বসে আছেন।
আর এখন যিনি দায়িত্বে এসেছেন, তিনি যেন পূর্বসূরিদেরও ছাপিয়ে যাচ্ছেন। তিনি এই দপ্তরটিকে কার্যত ছ্যাবলামির স্তরে নিয়ে যেতে উদ্যত।
তাঁর হুঙ্কার, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর লেখা কোনও বই লাইব্রেরিতে থাকবে না।
আসলে, এইসব বললে কাগজে খবর হয়, টিভিতে দেখানো হয়, সহজে নিজের নামটা ছড়ানো যায়। তাই সেই সহজ পথটাই বেছে নিয়েছেন।
লাইব্রেরি দপ্তরের আসল সমস্যা কোনগুলো, সেগুলো বোঝার মতো সময় বা ইচ্ছে, কোনওটাই তাঁর আছে বলে মনে হয় না। কত গুলো লাইব্রেরি বন্ধ হয়ে পড়ে আছে, কতজন গ্রন্থাগারিকের পদ শূন্য আছে, এগুলো নিয়ে তাঁর কোনও মাথাব্যথাই নেই। থাকলেও কাগজে প্রকাশিত খবরে তা অন্তত প্রকাশ পায়নি।
এই পর্যন্ত ঠিক ছিল। কাগজে নাম তুলতে এবার তিনি অন্য একটি বোমা ফাটালেন। আগের মুখ্যমন্ত্রী নাকি বিধানসভার লাইব্রেরি থেকে ‘সঞ্চয়িতা’ বইটি নিয়ে গেছেন। যেভাবেই হোক, তিনি সেই বই আদায় করে ছাড়বেন। এর জন্য নাকি আইনি ব্যবস্থা নেবেন।
ভাগ্যিস বলেননি আগের মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করবেন।
এইসব হুঙ্কারকে কী বলা যায়? এক কথায় বলতে গেলে, ছ্যাঁচড়ামি।
যদি একটি ‘সঞ্চয়িতা’ আগের মুখ্যমন্ত্রী তুলেও থাকেন, সেটা নিয়ে হুঙ্কার দিতে হবে? সেটা যে প্রকাশ্যে এভাবে বলাটা শোভনীয় নয়, সেটা এই অর্বাচীন লোকটিকে কে শেখাবে?
হতেই পারে, মুখ্যমন্ত্রীর কোনও অফিসার বা কর্মী হয়তো তাঁর অফিসে কোনও কারণে নিয়ে গিয়েছিলেন। দপ্তরে খোঁজ করলে পাওয়া যেতেও পারে। যদি নাই পাওয়া যায়, তাই বলে এভাবে প্রকাশ্যে তাঁর নামে আক্রমণ করতে হবে? একটা শিষ্টাচার, একটা ন্যূনতম ভদ্রতা থাকবে না?
সবিনয়ে একটা কথা জানতে ইচ্ছে করে, বিধানসভার লাইব্রেরি থেকে যদি একান্তই কোনও বই নিয়ে যাওয়া হয়, তার জন্য বিধানসভা কর্তৃপক্ষ আছেন। বিধানসভার লাইব্রেরি কমিটি আছে। স্বয়ং স্পিকার আছেন। এটি যে গ্রন্থাগার মন্ত্রীর এক্তিয়ারেই নয়, সেটাও কি তাঁর জানা নেই? তাঁকে সেই বই আদায় করার ‘মহান দায়িত্ব’ কে দিল?
এবার তাঁর হুঙ্কার, সব লাইব্রেরিতে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির বই থাকবে। তাঁকে নিয়ে লেখা বই থাকবে। থাকুক, কে বারণ করেছে? বিভিন্ন লাইব্রেরি তাঁদের পছন্দ অনুযায়ী বই কিনবেন। এখন বিজেপির সরকার। স্বাভাবিকভাবেই শ্যামাপ্রসাদের বই থাকবে। এটাও যে উপর থেকে এভাবে চাপিয়ে দিতে নেই। বা সেটা প্রকাশ্যে বলতে নেই, এটাই বা তাঁকে কে বোঝায়!
শ্যামাপ্রসাদের লেখা বা শ্যামাপ্রসাদ সংক্রান্ত বই থাকুক না, আপত্তির কী আছে? তাই বলে, এত ঘটা করে বলতে হবে কেন? তাছাড়া, শ্যামাপ্রসাদের বই লাইব্রেরি থেকেই পড়তে হবে কেন? শ্যামাপ্রসাদকে ভালবাসলে, তাঁর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে শ্রদ্ধা থাকলে তো এক দুটো বই কিনেও পড়া যায়। মুশকিল হল, শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, এমন লোকের সংখ্যা বিজেপিতেও বড্ড কম। তাঁরা যে দু–চার কথা বলেন, সেগুলো সব হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটির ফসল। এটা–ওটা ভিডিও আসে। দু একটা ভুলভাল তথ্যে ভরা লেখার লিঙ্ক আসে। এঁরা সেগুলোই আউড়ে যান। শ্যামাপ্রসাদ সম্পর্কে খুব সাধারণ দু একটা প্রশ্ন করলে হয় তোতলাতে থাকেন, নইলে মেজাজ হারিয়ে ফেলেন।
মমতা ব্যানার্জির বই যেমন তৃণমূলের লোকেরা পড়তেন না, এমনকী লাইব্রেরিতে রেখেও লোককে পড়ানো যায়নি। শ্যামাপ্রসাদকেও কি সেই স্তরে নামিয়ে আনতে চান? খুব সহজ কথা, শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে আগে নিজেরা দু একটা বই পড়ুন। তারপর না হয় লাইব্রেরিতে সেই বই রাখার ফরমান জারি করবেন।
