এমন এক্সক্লুসিভ ছবি আর হল কই!‌

অজয় নন্দী

ঠিক চল্লিশ বছর আগের কথা। তখনও টেলিভিশন সেভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। টিভি তখনও উচ্চবিত্তের বেড়া ডিঙিয়ে মধ্যবিত্তের ঘরে আসেনি। যাঁদের ছাদে অ্যান্টেনা টাঙানো, তাঁদের দেখে কেমন একটা সমীহই হত।

তখন বিশ্বকাপ মানে অল্পলোকই তার খোঁজখবর রাখতেন। পাড়ায় কারও বাড়িতে বা ক্লাবে গিয়ে খেলা দেখা। সেবার বিশ্বকাপের আয়োজক ছিল মেক্সিকো। ফলে, সেবারও খেলা হত মাঝরাতেই।

তখন জানার মাধ্যম ছিল খবরের কাগজ। কিন্তু ফাইনালের সকালে কাগজ খুল চক্ষু ছানাবড়া হওয়ার জোগাড়। যা দেখছি, ঠিক দেখছি তো?‌ আজকালের প্রথম পাতায় মারাদোনার বিশাল ছবি। ফাইনালে আর্জেন্টিনা খেলছে। মারাদোনার ছবি থাকবে না তো কার ছবি থাকবে?‌ এর মধ্যে অবাক হওয়ার কী আছে?‌

আসলে, মারাদোনার গায়ে সেদিন ছিল একটি নামাবলি। যাতে পরিষ্কার বাংলায় লেখা ‘‌হরে রাম হরে কৃষ্ণ’‌। এখনকার সময় হলে নির্ঘাত বলা হত, এআই দিয়ে বানানো ছবি। কিন্তু সেই ছিয়াশি সাল। এআই তো দূরের কথা, তখন ইন্টারনেট, ইমেল এই শব্দগুলোই আবিষ্কার হয়নি। ডুপ্লিকেট ছবি বানানোর এতরকম ফন্দিফিকিরও লোকের জানা ছিল না।

তাহলে কি ছবিটা ভেজাল?‌ আজ্ঞে না, একেবারেই খাঁটি। মারাদোনা সত্যিই নামাবলি পরেছিলেন। যাতে সত্যিই বাংলায় লেখা ছিল ‘‌হরে রাম, হরে কৃষ্ণ’‌।

একজনের কথা উল্লেখ করতেই হবে। অমিয় তরফদার। দিকপাল ফটোগ্রাফার। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর তোলা একের পর এক ছবি ইতিহাস হয়ে আছে। কত জাতীয়, আন্তর্জাতিক ইভেন্ট কভার করেছেন। তিনি সেবার মেক্সিকো গিয়েছিলেন ফ্রিলান্স ফটোগ্রাফার হিসেবে। তাঁর তোলা ছবি যেমন ইংরাজি কাগজে ছাপা হত, তেমনই বাংলার কাগজের মধ্যে ছবি ছাপা হত আজকালে।

বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে তিনি গিয়েছিলেন কেঁদুলির জয়দেব মেলায়। সেখান থেকে কিনেছিলেন দুটি নামাবলি। একটি তাঁর মায়ের জন্য। অন্যটি ব্যাগে ভরে নিয়ে গিয়েছিলেন মেক্সিকোয়। ইচ্ছে ছিল, কোনও দিকপাল ফুটবলারকে সেই নামাবলি পরিয়ে ছবি তুলবেন।

তখন নিরাপত্তার এত কড়াকড়ি ছিল না। কিন্তু তারকাদের কাছে ঘেঁসা এত সহজও ছিল না। মারাদোনা তাঁকে মুখচেনা চিনতেন। চোখে চোখেই অনেক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি নিরাপত্তার দুর্গ ভেদ করে মারাদোনার কাছে পৌঁছেও গিয়েছিলেন। একটু আবদার করতেই মারাদোনা রাজি। পেলে বা অন্য কেউ হয়তো রাজি নাও হতে পারতেন। কিন্তু মারাদোনা বরাবরই মোস্ট আনপ্রেডিক্টেবল। কখন কী করে বসবেন, কেউ জানে না। কখনও তিনি বিদ্রোহী, আবার কখনও শিশুর মতোই সরল।

মারাদোনা সরল মনে সেই নামাবলি পরেও নিলেন। ছবি উঠল। সেই ছবি থেকে গেল ইতিহাস হয়ে। ছবিটা যেমন থেকে গেল, তেমনই অমরত্ব পেয়ে গেলেন অমিয় তরফদারও। আজ বিশ্বকাপের আঙিনায় এত রিপোর্টার, এত ফটোগ্রাফার। কিন্তু এমন এক্সক্লুসিভ ছবি আর হল কই!‌

Previous post ‌নেপথ্যের সেই সংবাদ–‌সৈনিকদের কথা মনে পড়ে!‌

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *