স্বরূপ গোস্বামী
ডিমের বড়ই দুঃখ। কোনওদিনই সে বেচারা প্রাপ্য মর্যাদা পায়নি। বিয়েবাড়িতে চিকেন, মাটনের কতরকম পদ। এমনকী নানা রকমের মাছের আইটেমও আছে। কিন্তু ডিম! মেনু কার্ডে সে বেচারার ঠাঁই হয় না।
খাঁসির মাংস আটশো টাকা ছাড়িয়ে গেছে। চিকেনও আড়াইশো। যদি নধরকান্তি ইলিশ নিতে যান, অন্তত হাজার টাকা পকেটে রাখুন। চিংড়ি? সে ব্যাটাও পাঁচশো ছাপিয়ে গেছে। অথচ ডিম! তার দাম যদি আট টাকা থেকে সাড়ে আট টাকা হয়ে যায়, গেল গেল রব ওঠে। ডিমের জন্য ওটুকু খরচও করা যাবে না।
কোথাও যাওয়ার আগে ডিম খাওয়া যাবে না। সেটা নাকি অপবিত্র। ডিম খেয়ে গেলে নাকি ‘যাত্রা’ শুভ হয় না। অথচ, ‘শুভ জন্মদিন’ লেখা কেক আবার ডিম দিয়েই বানানো।
যাই হোক, ইদানীং ডিমের কদর বেড়েছে। বেড়েছে না কমেছে, সেটা ডিমই জানে। এখন যাকে–তাকে ডিম ছুঁড়ে মারা হচ্ছে। টিভিতে সেইসব দৃশ্য দেখানো হচ্ছে। কেউ কেউ নাম দিয়েছেন ডিম থেরাপি। ডিম নাকি প্রতিবাদের অস্ত্র। এত ব্যবহারে মোমবাতি আজ পুরনো। নতুন কোনও আইটেম চাই। অতএব, ডিম ছোঁড়ো।
প্রথম প্রথম এটাকে জনরোষ বলে চালানো হচ্ছিল। মিডিয়াও ফলাও করে তেমনটাই প্রচার করছিল। কী জানি, হয়তো রাগ ছিলও। এতদিনের পুষে রাখা রাগ যদি ডিম ছুঁড়ে একটু কমে, মন্দ কী! কিন্তু যত দিন গেল, পাবলিক হাওয়া হয়ে গেল। আসলে, পাবলিক বলে চালালে দলে নম্বর বাড়বে না। তাই এখন ডিম ছুড়েই জয় শ্রী রাম স্লোগান। বা রে! এটার ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছাড়তে হবে না! দলের নেতারা যদি ফোন ঘাঁটতে গিয়ে একবার দেখে ফেলেন। অন্তত পঞ্চায়েত বা পুরসভায় টিকিট পাওয়ার দাবিদার তো হওয়া যাবে!
একটু ডিম ছোঁড়ো, আর চোর চোর বলে চিৎকার করো। ফোকটে পাবলিসিটির জন্য আর কী চাই! বেশ একটা ‘পোতিবাদী’ ‘পোতিবাদী’ ইমেজ। ঠিক যেন নয়ের দশকের ‘পোসেনজিৎ’। বেচারা ডিম! সে একদিকে প্রচারে একটু কল্কে পেল। অন্যদিকে মিড ডে মিল থেকে ভ্যানিশ হয়ে গেল।
আসলে, কারও হেনস্থা হলে আমরা বেশ মজা পাই। তারিয়ে তারিয়ে অন্যের অপদস্থ হওয়া উপভোগ করি। তাই কাউকে ডিম ছোঁড়া হচ্ছে দেখলে বেশ একটা বিকৃত আনন্দ পাই। এই আনন্দ পেতে পেতে জনরোষ যে কবে পলিটিকাল ইভেন্ট হয়ে গেছে, বুঝতেই পারিনি। প্রতিবাদ যে কবে অসভ্যতা হয়ে উঠেছে, টেরই পাইনি।
আসলে, ভক্ত হওয়ার বেশ একটা মজা আছে। নিজেকে বুদ্ধি খাটিয়ে কিছু ভাবতে হয় না। যুক্তি দিয়ে বিচার করতেও হয় না। হোয়াটসঅ্যাপে যে সব ভিডিও বা লিঙ্ক আসে, সেগুলো দেখলেই হয়। ইউটিউব তো আছেই। একবার ডিম ছোঁড়ার ভিডিও দেখলে বারেবারে সেই লিঙ্কই আসবে। কারণ, ফেসবুক বা ইউটিউব ততদিনে বুঝে নিয়েছে, আমি এই দৃশ্যই দেখতে চাই। কেউ উল্টো যুক্তি দিচ্ছে! দেশদ্রোহী বলে দাও। লোকে এটাও কিন্তু হেব্বি খাচ্ছে।
আপনি তৃণমূলকে চোর চোর বলে এতদিন গালি পাড়লেন। কোন সময়ে তৃণমূলের কুড়ি জন এম পি দিল্লিতে উড়ে গিয়ে এনডিএ–র শরিক হয়ে গেল, বুঝতেও পারেননি। এতদিন এঁদেরই চোর, দেশদ্রোহী, চটিচাটা—কতকিছুই না বলেছেন। এবার মালা নিয়ে তৈরি থাকুন। শহরে এলেই পরিয়ে দিতে হবে তো! পোশাকি নাম যতই এনডিএ শরিক হোক, আসলে এঁরা বিজেপিই হয়ে পড়েছেন। এখন মিউ মিউ করছেন, দুদিন পর আগের মতোই হুঙ্কার ছাড়বেন।
দিল্লিতে যা হচ্ছে হোক। রাজ্যে তো তৃণমূল জব্দ। ও হরি! সেই তৃণমূলের এমএলএ–রা এখন উঠতে বসতে তৃণমূলকেই গাল পাড়ছে। তাঁরা এখন আপনার থেকেও বড় বিজেপি। এবার কোন মুখে তাঁদের ‘চোর’ বলবেন! কদিন পর এঁদের বিজেপি নেতা বলে মেনে নেওয়া ছাড়া আপনার কীই বা করার আছে! দিল্লির ক্ষেত্রে না হয় বলেছিলেন, দেশের স্বার্থে, বিল পাসের স্বার্থে নেওয়া হল। রাজ্যের এমএলএ দের দলবদল নিয়ে কী ব্যাখ্যা দেবেন? আপনাকে ভাবতে হবে না। ততদিনে জুতসই একটা ব্যাখ্যা ঠিক দিয়ে দেওয়া হবে। আপনি শুধু মুখস্থ রাখুন। সময় মতো উগরে দেবেন।
দিল্লি গেল। কলকাতাও গেল। বাকি পড়ে রইল কী? আপনার জেলা? আপনার শহর? আপনার গ্রাম? অপেক্ষা করুন, এখানেও তৃণমূলীকরণ ঠিক হয়ে যাবে। দিল্লির দলবদল হয়েছে ‘বৃহত্তর’ স্বার্থে। এবার না হয় ‘ক্ষুদ্রতর’ স্বার্থে। সেটা ছিল দেশের স্বার্থে, এটা না হয় হবে গ্রাম বা সংগঠনের স্বার্থে।
আপনার হাতে তাহলে কী রইল! ডিম। আস্ত একটি ঘোড়ার ডিম।
