হানিমুন পিরিয়ডের মাঝেও সংশয় নথিবদ্ধ থাকুক

বেঙ্গল টাইমস। ই ম্যাগাজিনের সম্পাদকীয় প্রতিবেদন

এ যেন এক ঝোড়ো বাতাস। এক লহমায় সবকিছু উড়িয়ে নিয়ে গেল। কদিন আগেও যারা ছিল দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসক, তারা কিনা ভেঙে পড়ছে তাসের ঘরের মতো। প্রায় চল্লিশ শতাংশ মানুষের সমর্থন, আশিটি আসন, তারপরও কেমন যেন ছন্নছাড়া তৃণমূল শিবির। এত রাগ, এত ঘৃণা মানুষের মধ্যে জমেছিল?‌ একদিকে সীমাহীন দুর্নীতি, ক্ষমতার দম্ভ। অন্যদিকে তদন্তের নামে, বিচারের নামে নিরন্তর প্রহসন। জনতার ক্ষোভ একটু একটু করে বারুদে বদলে গেছে। একটু ভয়মুক্ত ভোটের আবহ তৈরি হতেই সে দাঁড়িয়েছে লম্বা লাইনে। ইভিএমেই উগরে দিয়েছে যাবতীয় ক্ষোভ, ঘৃণা।

গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়মে এক দলের প্রতি অনাস্থা তৈরি হলে অন্য দলের অনুকূলে হাওয়া বইতে থাকে। যেভাবেই হোক, তৃণমূলকে হারাতে হবে, এমন একটা সিদ্ধান্তে মানুষ এসে গিয়েছিল। কিন্তু বিকল্প কারা?‌ এই প্রশ্নটা মানুষকে সেভাবে ভাবায়নি। বাম বা কংগ্রেস যে অন্তত এখন বিকল্প হয়ে উঠতে পারবে না, এটুকু জনতা ঠিক বুঝেছিল। তাই কোথাও কোথাও তাঁদের জেতাতে গেলে হয়তো ‘‌ভোট নষ্ট’‌ হতে পারে। এতে আখেরে তৃণমূলেরই সুবিধা হতে পারে। কাটাকাটির অঙ্কে আবার তারাই ক্ষমতায় এসে যেতে পারে। এই ভাবনা কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ সংক্রমিত হয়েছে। অবশ্য এই ধারণা তৈরি করতে বিজেপিরও বড় ভূমিকা আছে। গত সাত–‌আট বছর ধরে বিরোধী পরিসর যে তাদেরই দখলে, এ নিয়ে কোনও মহলেই কোনও সংশয় নেই। একদিকে মেরুকরণ, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় আনুকূল্য। ফলে, পরিশ্রমের বিকল্প থাকুক আর নাই থাকুক, বিকল্পের তেমন পরিশ্রম ছিল না। কেন্দ্রের ভূমিকা নিয়ে যত প্রশ্নই থাক, মানুষের কাছে সেগুলো গৌণই থেকেছে।

সরকার বদল হচ্ছে, এমন একটা ইঙ্গিত ছিল। কিন্তু আসন সংখ্যা দুশো ছাপিয়ে যাবে, এতখানি বিজেপি নেতৃত্বও আশা করেননি। আসলে, এই ভোট যতটা অনাস্থার, মোটেই ততটা আস্থার নয়। তাই বিজেপি সরকারে এলেও খুব যে প্রত্যাশার স্রোতে এসেছে, এমনটাও নয়। এখানেই কঠিন চ্যালেঞ্জ। আগের শাসকের প্রতি তীব্র অনাস্থাকে নতুন শাসকের প্রতি আস্থায় পরিণত করা। কোনও সন্দেহ নেই, আস্থা অর্জনের কাজে প্রাথমিকভাবে অনেকটাই সফল নতুন মুখ্যমন্ত্রী। নির্বাচনোত্তর হিংসা ও সন্ত্রাস হচ্ছে ঠিকই, তবে অনেকটাই সামাল দেওয়া গেছে। স্বচ্ছ প্রশাসনের একটা অঙ্গীকার থাকবে, সেটা তো স্বাভাবিক। সেই লক্ষ্যে কিছু বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপও দেখা যাচ্ছে। কতটা বাস্তবায়ন হয়, সেদিকে নজর থাকবে। আপাতত হানিমুন পিরিয়ড। দেনার দায়ে কার্যত দেউলিয়া হয়ে আসা একটা সরকারের হাতে এমন কোনও জাদুদণ্ড নেই, যা দিয়ে রাতারাতি সব মুশকিল আসান হয়ে যাবে। তবু সদিচ্ছা থাকলে, সুষ্ঠু পরিকল্পনা থাকলে, পরিশ্রম ও সততা থাকলে অনেক বাধাকে অতিক্রম করা যায়। কিছুটা সময় অবশ্যই নতুন সরকারের প্রাপ্য। কিন্তু হানিমুনের আবহে যেন বেনোজল বা আত্মতুষ্টি না ঢুকে পড়ে, সেদিকেও সজাগ থাকা জরুরি।

বেঙ্গল টাইমস আগের সরকারের সময়ও স্তাবকতার রাস্তায় হাঁটেনি। তার সীমিত কণ্ঠ নিয়ে নানা বিষয়ে সোচ্চার থেকেছে। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের ভূমিকা তার মতো করে পালন করার চেষ্টা করেছে। বেঙ্গল টাইমসের অন্তত একশোটি ই ম্যাগাজিন তার সাক্ষী। সেগুলো এখনও আর্কাইভে আছে। চাইলেই পড়া যায়। এই সরকারের আমলেও বাকিদের মতো জামা বদলে ‘‌শাসকপন্থী’‌ হয়ে ওঠার কোনও সম্ভাবনা নেই। ভাল কাজকে মুক্ত কণ্ঠে ভাল বলার উদারতাও থাকবে। পাশাপাশি যেখানে বিচ্যুতি, তার উল্লেখও থাকবে। সরকার তার রাজধর্ম পালন করুক। কিন্তু সরকার যদি ঘৃণা ছড়ানো বা বিদ্বেষকে উস্কে দেওয়ার পথে হাঁটে, যদি আগের শাসকেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে, তীব্র ধিক্কারেও কার্পণ্য থাকবে না।

স্বরূপ গোস্বামী
সম্পাদক, বেঙ্গল টাইমস

Previous post পরিষদীয় আইন কানুন সম্পর্কে এতখানি অজ্ঞতা!‌
Next post বেঙ্গল টাইমস।। ই ম্যাগাজিন।। ২০ মে সংখ্যা।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *