অর্ণব দে
ট্রেনে ওঠার আগে একসময় অনেক যাত্রীই খবরের কাগজ খুঁজতেন। প্রায় সব প্ল্যাটফর্মেই খবরের কাগজ, বইয়ের স্টল থাকত। যদি সঙ্গে নিয়ে নাও উঠতেন, তাহলেও চিন্তু নেই। কোনও না কোনও হকার বন্ধু ঠিক কাগজ নিয়ে উঠতেন। অর্থাৎ, ট্রেনেও কেনার সুযোগ ছিল। যাত্রীদের অধিকাংশই মগ্ন থাকতেন বই পড়ায় বা গল্প গুজবে।
মাত্র কয়েক বছর আগের ঘটনা। অথচ, এখন ভাবলে কেমন রূপকথা মনে হয়। ট্রেনে কাগজ পড়া প্রায় উঠেই গেছে। স্টেশন বই বা কাগজের স্টলও তেমন চোখে পড়ে না। ট্রেনে কাগজ বিক্রি করা হকার বন্ধুদেরও তেমন দেখা যায় না। সহযাত্রীদের মধ্যে গল্প বা আড্ডাও অনেক কমে এসেছে।
সবাই মগ্ন মোবাইলে। সবাই মগ্ন মোবাইলে। ট্রেনে ওঠার সাথে সাথেই পকেট থেকে বা ব্যাগ থেকে বেরিয়ে পড়ে ওই যন্ত্রখানা। সিটে বসার আগেই কানে ইয়ার ফোন গোঁজা হয়ে গেল। এবার তিনি শুনবেন। কী শুনবেন, কে জানে! কে কেউ আবার ইয়ার ফোনের ধার ধারেন না। তারস্বরে রিলস চালিয়ে যান। পাশের সহযাত্রীর অসুবিধা হচ্ছে কিনা, ভাবতে বয়েই গেছে।
আচ্ছা, আমরা কি শুধু কাগজ পড়ার অভ্যেস হারিয়ে ফেলেছি? এর পাশাপাশি নিজের অজান্তে আরও অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের সেই ধৈর্য ও সহনশীলতাও আজ হারিয়ে গেছে। কেউ তিন ঘণ্টা ট্রেনে থাকলে অন্তত পৌনে তিন ঘণ্টা তাঁর সঙ্গী মোবাইল। আমরা কেউ অন্যের কথা তিরিশ সেকেন্ড শোনার ধৈর্য দেখাতে পারি না। আমরা এক পাতা পড়তে পারি না। খবরের কাগজের একটা পাতা শেষ কবে পড়েছেন, অধিকাংশ লোক বলতে পারবেন না। অথচ, তিনি যে পড়েন না, এটা স্বীকার করতেও পারবেন না। এমন ভান করবেন যেন তিনি বিরাট ব্যস্ত। তাই কাগজ পড়ার সময় নেই। তিনি যুক্তি দেখাবেন, মোবাইলেই তো সব পাওয়া যায়। কেউ কেউ বলতে থাকেন, কাগজে কিছুই থাকে না। যেন তিনি কতই না পণ্ডিত। তিনি রাজনীতি নিয়ে কত ভাষণ দেন। কত জ্ঞান বিতরণ করেন। অথচ, একটু কথা বললেই বুঝতে পারবেন, তিনি কার্যত কিছুই জানেন না। দেশের পাঁচজন মন্ত্রীর নাম বলতে গেলে তিনটি বলে আর চতুর্থ নাম বলতে পারেন না। অথচ, তিনিই রাজনৈতিক বোদ্ধা।
অনেক বছর ধরে লোকাল ট্রেনে যাতায়াত করছি। দেখতে দেখতে সিনিয়র সিটিজেনের তকমা চলে এল। আগেকার ট্রেন যাত্রা আর এখনকার ট্রেন যাত্রাকে একেবারে মেলাতে পারি না। ট্রেনে যেতে যেতেই কাগজ পড়া হয়ে যেত। নিজেকে কত সমৃদ্ধ মনে হত। সেইসঙ্গে পাশের সহযাত্রীর সঙ্গে নানা আলোচনা, আড্ডায় কত কিছু জানতে পারতাম! এভাবেই কত সহযাত্রী বন্ধু হয়ে গিয়েছিলেন। এখন ভাবলে কেমন অবিশ্বাস্য লাগে। এখন কোনও সহযাত্রীর পাশে যদি তাঁর আত্মীয় বা মাস্টারমশাই এসেও বসেন, সেই সহযাত্রী হয়তো চিনতেও পারবেন না। পাশের লোকটির দিকে তাকানোর সময় কোথায়!
