ঝোড়ো ইনিংস, ক্যাচও কিন্তু বেশ উঠছে

সৃজন শীল

এ যেন টি২০–‌র ব্যাটিং। শুরু থেকেই একেবারে ঝোড়ো ইনিংস। টি২০ ঘরানায় একটা পাওয়ার প্লে বলে ব্যাপার থাকে। অর্থাৎ, প্রথম ছয় ওভার। খুব মোক্ষম একটা সময়। এই সময় দু’‌জন ছাড়া সব ফিল্ডারকে থাকতে হয় তিরিশ গজ বৃত্তের ভেতরে। এই সময় যত খুশি, তুলে মারো। মিস টাইমিং হলেও ক্যাচ হওয়ার তেমন আশঙ্কা নেই। আর একটু ঠিকঠাক টাইমিং হয়ে গেলে ছয় নিশ্চিত। এমনকী কানায় লেগেও কখনও কখনও ছয়–‌চার হয়েই যাবে।

শুভেন্দু অধিকারী যেন ব্যাট করছেন টি২০–‌র মেজাজেই। একের পর এক সাহসী সিদ্ধান্ত। কোনওদিন এক লহমায় সব কমিটি ভেঙে দিচ্ছেন, কোনওদিন একসঙ্গে তিন আইপিএস–‌কে সাসপেনশনে পাঠাচ্ছেন। আবার উল্টোটাও আছে। ভয় দেখানোর পাশাপাশি ভরসা দেওয়াও আছে। কখনও বলছেন, সামাজিক সব প্রকল্প বহাল থাকবে। আবার সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বয়সসীমা পাঁচ বছর বাড়িয়ে দিচ্ছেন।

আপাতভাবে মনে হতেই পারে, একক প্রদর্শনী। কিন্তু এটা যেহেতু ব্যক্তিকেন্দ্রিক দল নয়, তাই দলীয় স্তরে কোথাও একটা অনুমোদন নিশ্চয় নিয়ে রেখেছেন। কিছুটা খোলা হাতে ব্যাট করার স্বাধীনতা নিশ্চয় তাঁকে দেওয়াও হয়েছে। সবমিলিয়ে পাওয়ার প্লের ওই ছয় ওভারের সময়টা মন্দ নয়।

রাজনীতিতে একটা চালু কথা আছে— হানিমুন পিরিয়ড। অর্থাৎ, কোনও সরকার যখন নতুন দায়িত্ব নেয়, তখন তাকে কিছুটা সময় দিতে হয়। শুরু থেকেই তার ছোটখাটো ভুল নিয়ে বেশি হইচই করা শোভনীয় নয়। আসল কথা হল স্পিরিট। কাজের স্পিরিট ঠিকঠাক আছে কিনা। সদিচ্ছা আছে কিনা। পরিকল্পনা আছে কিনা। বিচক্ষণতা আছে কিনা। এই পরীক্ষায় আপাতত তিনি সসম্মানে উত্তীর্ণ।

শুভেন্দু ভাল করেই জানেন, এই রায় যত না আস্থার, তার থেকে ঢের বেশি অনাস্থার। আগের সরকারের সীমাহীন দম্ভ ও দুর্নীতির কারণেই বীতশ্রদ্ধ ছিলেন মানুষ। কে উপযুক্ত বিকল্প, তা যাচাই করেও দেখেনি। যারা তৃণমূলকে হারাতে পারবে, তাদেরই বেছে নিয়েছে। মানুষ নিজের ভোট নিজে দিতে পারবে, এই ভরসার জায়গাটুকু অন্তত নির্বাচন কমিশন তৈরি করতে পেরেছিল। কেন্দ্রীয় বাহিনী অন্যান্যবার যে ভূমিকা পালন করে, এবার তাদের ভূমিকা অনেক বেশি প্রশংসনীয়। বেশ কিছু নির্বাচনী কৌশলও ক্লিক করে যায়।

তবে, গত পাঁচ বছরে শুভেন্দু যে নিরন্তর পরিশ্রম করেছেন, তা সকলেই একবাক্যে মানবেন। সাহসিকতার সঙ্গে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ছুটে গেছেন। যেখানেই কর্মী আক্রান্ত, বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন। শাসক যে ভাষা বোঝে, সেই ভাষাতেই জবাব দিয়েছেন। কোথাও কোথাও সাম্প্রদায়িক উস্কানি ছিল। হয়তো এতখানি উগ্রতা না দেখালেও পারতেন। কিন্তু একেবারে ভবানীপুরে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়া!‌ বুকের পাটা লাগে বইকি। কোন ওয়ার্ডে তিনি পিছেয়ে থাকবেন, কোন ওয়ার্ডের গণনার পর সমতা ফিরবে। কোন রাউন্ড থেকে এগোতে শুরু করবেন, তাও আগাম বলে দিয়েছিলেন। ভোটের পর দেখা গেল, তা হুবহু মিলে গেল। অর্থাৎ, বেপাড়ায় এসেও স্পন্দনটা তিনি ঠিক টের পেয়েছিলেন।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, প্রথম ছয় ওভারে যে রান উঠল, স্কোরবোর্ডে সেই রানের গতি কুড়ি ওভার পর্যন্ত বজায় থাকবে তো?‌ তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে কোথাও মারাত্মক ভুল হয়ে যাচ্ছে না তো?‌ অতি উৎসাহী হয়ে দলের অন্য নেতারা একটু বেশি লাগামছাড়া হয়ে যাচ্ছেন না তো?‌ প্রশ্ন তোলার বা সংশয়ের অনেক জায়গা কিন্তু এর মধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে। যত দিন যাবে, এই অসঙ্গতি ও সংশয় ক্রমশ বাড়বে। কয়েকটা উদাহরণ তুলে ধরলেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবে। ১)‌ শপথের তিন–‌চার দিনের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা ও মুখ্যসচিব নিয়োগ হয়ে গেল। দুজনেই এক সপ্তাহ আগেও নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। আর কোনও যোগ্য অফিসার পাওয়া গেল না?‌ নির্বাচন কতখানি নিরপক্ষ হয়েছিল, এই প্রশ্ন কিন্তু শুভেন্দু নিজেই তুলে দিলেন। এমনকী সেই অফিসাররাও নিজেদের ঘিরে প্রশ্ন তুলে দিলেন। ২)‌ দপ্তর বণ্টন এখনও হয়নি। কে শিক্ষামন্ত্রী, কে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, এখনও ঘোষণা হয়নি, শপথ নেওয়াও হয়নি। অথচ, এর মধ্যেই কেউ কেউ অতি উৎসাহে কখনও পিজি, কখনও বিকাশ ভবনে গিয়ে অফিসারদের সঙ্গে বৈঠক করতে চলে যাচ্ছেন। কার্যত নির্দেশ দিতেও শুরু করে দিয়েছেন। ৩)‌ কোনও মন্ত্রী বলে বসছেন, সংখ্যালঘুদের উন্নয়নের কোনও দায় নেই। কোনও বিধায়ক প্রকাশ্য সভায় মাইকে চিৎকার করে বলছেন, হিন্দু ছাড়া কাউকে সার্টিফিকেট দেব না। তাঁরা কী শপথ নিয়েছিলেন, তার কী মানে, এই অর্বাচীনরা বোঝেন তো?‌ ৪)‌ যিনি প্রোটেম স্পিকার, যিনি সবাইকে শপথবাক্য পাঠ করালেন, তিনি বিধানসভার ভাষণ শেষে ‘‌জয় শ্রীরাম’‌ বলে চেঁচিয়ে উঠলেন। এটাকে বালখিল্য বললেও কম বলা হয়। সম্মান দিয়ে প্রোটেম স্পিকার করা হয়েছিল, নিজের চেয়ারের কী সম্মানটাই না রাখলেন!‌

যতই হানিমুন চলুক, যতই ফিল গুড আবহ থাকুক, এমন নানা ঘটনাও ঘটছে। এখন কোনও প্রশ্নই উঠবে না। মিডিয়াও তুলবে না। কারণ, তাঁদেরও এখন নতুন সরকারের কাছে আনুগত্যের প্রমাণ দিতে হবে। একচু বেসুরো প্রশ্ন উঠলেই দেশদ্রোহী দেগে দেওয়ার প্রবণতাও চলতেই থাকবে। কিন্তু হানিমুনের আবহেও প্রশ্নগুলো থাকুক। এই অতি উৎসাহ কিন্তু আগামীদেনের অশনি সংকেত। উৎসবের আবহে আত্মসমীক্ষাটুকু যেন হারিয়ে না যায়।

Previous post এমনটাই তো হওয়ার ছিল
Next post পরিষদীয় আইন কানুন সম্পর্কে এতখানি অজ্ঞতা!‌

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *