নীল সাদা কিন্তু থেকেই যাবে, মেসি তো আছেন

অজয় নন্দী

ভোটের আবহ পেরিয়ে গেছে। ফলও আর কারও অজানা নেই। এখন কে বিজেপি, কে তৃণমূল। কে সিপিএম, কেই বা কংগ্রেস। এই সব পরিচয় আপাতত অতীত?‌ এখন কে ব্রাজিলের দিকে, কে আর্জেন্টিনার?‌ কেউ কি জার্মানি বা ফ্রান্সের সমর্থক আছেন?‌ যত দিন এগোবে, বাঙালি একটু একটু কবে ডুব দেবে বিশ্ব ফুটবলের মহাসমুদ্রে।

একটা লম্বা সময় ধরে বাঙালির চিন্তা, চেতনা জুড়ে ছিল শুধুই ব্রাজিল। ছিয়াশির পর সেই সমীকরণটা বদলে গেল। হলুদ জার্সির ব্রাজিলের পাশাপাশি নীল সাদা জার্সির আর্জেন্টিনাও যেন সাড়া ফেলে দিল। দিয়েগো মারাদোনা নামের একটি মানুষ যেন বাঙালির মধ্যে অদ্ভুত এক মেরুকরণ এনে দিলেন। আর্জেন্টিনা জিতলে উত্তাল হয়ে ওঠে কলকাতা, আবার আর্জেন্টিনা হারলে সে কাঁদতেও দ্বিধা করে না।

সময় এগিয়ে গেল নিজের নিয়মেই। সেই পেলেও নেই, সেই মারাদোনাও নেই। খেলার মাঠ তো বটেই পৃথিবীর মাঠ ছেড়েই তাঁরা পাড়ি দিয়েছেন না ফেরার দেশে। কিন্তু আজও বাঙালি পেলের দেশ আর মারাদোনার দেশ— এই দুই দেশেই বিভক্ত। ব্রাজিলের তারকা এখন নেইমার, আর আর্জেন্টিনার অস্তগামী সূর্য লিওনেল মেসি। দেখতে দেখতে ষষ্ঠ বিশ্বকাপের মুখে দাঁড়িয়ে মেসি। নিশ্চিতভাবে এবারই শেষ অভিযান। এতদিন তাঁর ট্রফির ভাণ্ডারে ছিল না শুধু বিশ্বকাপ। চার বছর আগে কাতারে সেই স্বপ্নপূরণও হয়ে গেছে। বয়স আরও চার বছর বেড়েছে ঠিকই, হয়তো নব্বই মিনিট খেলার মতো অবস্থায় নেই। তবুও মেসি এখনও ভয়ঙ্কর। মুহূর্তে ম্যাচের রঙ বদলে দিতেই পারেন।

মেসি ছাড়াও আছেন আরও এক তারকা, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। নিজে যত বড় মাপের তারকা, পর্তুগালকে সেই অনুযায়ী সাফল্য হয়তো এনে দিতে পারেননি। বিদায়বেলায় রাঙিয়ে যাওয়ার হাতছানি তাঁর সামনেও। আগের বিশ্বকাপের ট্র‌্যাজিক নায়ক ছিলেন কিলিয়ান এমবাপে। ফ্রান্সকে ফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন। ফাইনালে কী অনবদ্য লড়াই‍‌!‌ দ্বিতীয়ার্ধে একাই যেন ম্যাচের রঙ বদলে দিলেন। টাইব্রেকারে হারতে হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেদিনই যেন বার্তা দিয়ে রেখেছিলেন, চার বছর পর আসছি। আগেরবার বিশ্বকাপে নিজেকে সেভাবে মেলে ধরতে পারেননি নেইমার। তাছাড়া, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ট্রফির বাইরে ব্রাজিলও। উঠে আসছেন আরও একঝাঁক তারকা। যাঁরা বিশ্বকাপে নিজেদের জাত চিনিয়ে দিতে মরিয়া।

তাছাড়া, বিশ্বকাপ প্রতিবারেই এমন এমন নায়কের সন্ধান দেয়, যাঁদের আমরা এতদিন সেভাবে চিনতামই না। কোচেরাও এই তরুণ প্রতিভাদের আগলে রাখেন। সেইসব তরুণ তুর্কিরা সকলের চোখের আড়ালে যেন গোকূলে বাড়তে থাকেন। এমন তারকাদের বরণ করে নিতে কোনও কার্পণ্য থাকার কথা নয়।

এবার বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসছে আমেরিকা, কানাডা, মেক্সিকো— এই তিন দেশে। এবার আর ৩২ নয়, একেবারে ৪৮ দল। কোনও খেলা রাতে, কোনওটা মাঝরাতে, আবার কোনওটা ভোরের দিকে। অর্থাৎ, খেলা দেখা বাঙালি যে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে যাবে, তারও উপায় নেই। আবার সেই ভোরে উঠে পড়তে হবে। পরেরদিন স্কুল, কলেজ, সেলুন, অফিস, চায়ের দোকান— সর্বত্রই চর্চায় উঠে আসবে বিশ্বকাপ। আর সোশ্যাল মিডিয়া তো আছেই। আমরা সবাই একেকজন খুদে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠব। আমাদের দেশ বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে কোথায় দাঁড়িয়ে, সেই প্রশ্ন আপাতত তোলা থাক। এই একটা মাস আমরা যথার্থই বিশ্ব নাগরিক।

Previous post ট্রেনে তারস্বরে রিলসে লাগাম টানা হোক
Next post বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন মোহনবাগানকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *