পরিষদীয় আইন কানুন সম্পর্কে এতখানি অজ্ঞতা!‌

ধীমান সাহা

কখনও কখনও খুব সাধারণ বোধ বুদ্ধিও লোপ পেয়ে যায়। বিধানসভায় তৃণমূল পরিষদীয় দলের কর্মকাণ্ড দেখে সেটাই বারবার মনে হচ্ছে। গত বিধানসভায় তৃণমূলের প্রতীকে দুশোর বেশি বিধায়ক ছিলেন। কিন্তু পরিষদীয় নিয়ম কানুন সম্পর্কে অধিকাংশই অবহিত ছিলেন না। হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া বাকিদের ন্যূনতম জ্ঞানটুকুও ছিল না। বিরোধী দলনেতা সংক্রান্ত বিভ্রাটে সেটা আরও একবার পরিষ্কার হয়ে গেল।

বিরোধী দলের সদস্যরা বিরোধী দলনেতা নির্বাচন করবেন, এটা খুব সাধারণ একটা প্রথা। তাঁরা স্পিকারকে চিঠি দেবেন। সেই অনুযায়ী স্পিকার কাউকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে মান্যতা দেবেন। অতীতে সেটাই হয়েছে। স্পিকারের বদলে বিধানসভার সচিবকেও এই চিঠি দেওয়া যায়। কিন্তু তৃণমূল কী করল?‌ অভিষেকর ব্যানার্জির লেটার হেডে লেখা চিঠি পাঠিয়ে দিল স্পিকারের কাছে। হতেই পারেন তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু বিধানসভার কাছে অভিষেক ব্যানার্জি কে? তাঁর চিঠির কী মূল্য আছে?‌ অভিষেক তিনবারের সাংসদ। এখন আবার সংসদীয় দলনেতা। তারপরেও এই সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানটুকু নেই!‌

আচ্ছা, শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যপালের কাছে যে সম্মতিপত্র নিয়ে গিয়েছিলেন, তাতে কার সই ছিল?‌ সেখানে কি অমিত শাহর সই ছিল?‌ নিয়ম অনুযায়ী, বিধায়করা চিঠি লিখে জানাবেন, তাঁদের পরিষদীয় দলনেতার নাম। সেই অনুযায়ী রাজ্যপাল শপথ নিতে ডাকবেন। কে মুখ্যমন্ত্রী হবেন, সেটা অবশ্যই দলীয় সিদ্ধান্ত। অমিত শাহ যতই ঘোষণা করুন, রাজ্যপালকে চিঠি লেখার সময় কিন্তু বিধায়কদেরই সই করতে হয়েছে। এটাই আবহমান কালের নিয়ম। এমনকী পাঁচ বছর আগে শুভেন্দু অধিকারী যে বিরোধী দলনেতা হয়েছিলেন, সেই চিঠি কি বিজেপির লেটারহেডে লেখা হয়েছিল?‌ নাকি বিরোধী বিধায়করা লিখেছিলেন?‌

ঠিক তেমনই, তৃণমূলের কে বিরোধী দলনেতা হবেন, সেই সিদ্ধান্ত অবশ্যই মমতা ব্যানার্জি নেবেন। কিন্তু চিঠি দেওয়ার সময় বিরোধী বিধায়কদেরই দিতে হবে। বর্ষীয়ান শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের এই নিয়ম অজানা থাকার কথা নয়। তিনি বিরোধী দলের হুইপ ছিলেন। শাসকদলের চিফ হুইপ ছিলেন। পরিষদীয় মন্ত্রী ছিলেন। তিনি বেশ ভালই জানেন নিয়মটা কী। কিন্তু কী আর করা যাবে?‌ যুবরাজ যখন চিঠি লিখে পাঠিয়ে দিয়েছেন, তখন তিনি তো আর সেই অর্বাচীনকে নিয়ম শেখাতে যাবেন না!‌

একজন বিধায়কেরও মনে হল না, এটা সঠিক পদ্ধতি নয়!‌ গত পনেরো বছরের স্পিকার বিমান ব্যানার্জি। তিনি তো এবারও জিতেছেন। তিনিও একজন বিরোধী বিধায়ক। তাঁর তো নিয়মটা জানার কথা। আসলে, জানলেও বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?‌ ফল কী হল?‌ বিধানসভার সচিবালয় জানাল, পদ্ধতিগত ত্রুটি আছে। বিধায়কদের সই করা চিঠি দিতে হবে। বিষয়টা এখানেই থেমে যেতে পারত। বিচক্ষণ শোভনদেববাবু বিষয়টা বুঝেছেন। কিন্তু নিয়ম জেনেও তাঁকে বলতে হল, আগে এইরকম হয়েছিল কিনা, খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। অর্থাৎ, তাঁকে কিছুটা বাধ্য হয়ে অভিষেকের অজ্ঞতাকে আড়াল করতে হল।

আসলে, এতদিন থালায় খাবার সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভাত বেড়ে খেতে হয়নি। তাই কতকিছুই অজানা থেকে গেছে। ভাবতেও অবাক লাগে, তিনবারের সাংসদ, লোকসভার দলনেতা। অথচ, সাধারণ নিয়মটুকু জানেন না!‌ আই প্যাক বা আমলারা না থাকলে তিনি কতটা অসহায়, আরও একবার দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। ‌

Previous post ঝোড়ো ইনিংস, ক্যাচও কিন্তু বেশ উঠছে
Next post হানিমুন পিরিয়ডের মাঝেও সংশয় নথিবদ্ধ থাকুক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *