জুনিয়রকে আমরা কত সহজে ভুলে গেলাম!‌

অজয় নন্দী

সাফল্যের এমন মহিমা, সে আগের সাফল্যকেও সামনে এনে দেয়। ২০১১ সালে ভারত যখন বিশ্বকাপ জেতে, খুব স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে ১৯৮৩–‌র কথা। ওয়াংখেড়েতে সেলিব্রেশনের পাশাপাশি অবধারিতভাবে উঠে আসবে তিরাশিতে লর্ডসের ব্যালকনির কথা। ধোনির ম্যাচ জেতানো ছক্কার পাশাপাশি অবশ্যই ভেসে উঠবে কপিলের সেই দুরন্ত ক্যাচ বা বলবিন্দর সিং সান্ধুর সেই দুরন্ত ডেলিভারির কথা।
ঠিক তেমনই, ইস্টবেঙ্গলের আইএসএল জয়ের পরেও উঠে আসার কথা বাইশ বছর আগের সেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কথা। আমরা বারবার বলছি বাইশ বছরের কথা। অথচ বাইশ বছর আগের সেই সৈনিকদের সম্পর্কে কেমন উদাসীন।

ইউসেফ ইজেজারি। সর্বাধিক গোলের সুবাদে এই স্ট্রাইকার এবার পেলেন সোনার বুট। আচ্ছা, সেবার সর্বাধিক গোলদাতা কে হয়েছিলেন?‌ এমন একজন, ভারতীয় ফুটবল যাঁকে মনে রাখবে একটি মর্মান্তিক মৃত্যুর কারণে। খুব মনে পড়ছে ক্রিস্টিয়ানো জুনিয়রের কথা। ইস্টবেঙ্গল তার কয়েক মাস আগেই আসিয়ান কাপ জিতে ফিরেছে। কে নেই সেই দলে?‌ বাইচুং ভুটিয়া তো আছেনই। বিদেশিদের মধ্যে আছেন ডগলাস, সুলে মুসা, মাইক ওকোরো। আর দেশিদের মধ্যে সংগ্রাম মুখার্জি, সন্দীপ নন্দী, দেবজিৎ ঘোষ, এম সুরেশ, মহেশ গাউলি, সুরকুমার, আলভিটো ডিকুনহা, চন্দন দাস, ষষ্ঠী দুলে, দীপঙ্কর রায়। এঁদের সবাইকে ছাপিয়ে নায়ক হয়ে উঠলেন ব্রাজিল থেকে আসা নবাগত এক ফুটবলার। যতদূর মনে পড়ে, জাতীয় লিগ চলাকালীনই তাঁকে আনা হয়েছিল। শুরুর দিকে কেউ বিশেষ গুরুত্বই দেননি। পায়ে আহামরি শিল্প ছিল, এমন নয়। চোখে লাগার মতো দর্শনীয় ফুটবল খেলেছেন, এমনও নয়। কিন্তু নিঃশব্দে একটি, দুটি করে গোল করে চলেছেন। কখন যে তাঁর গোল সংখ্যা পনেরো হয়ে গেল, কেউ টেরই পাননি।

বাইচুং, ওকোরোদের ছাপিয়ে নায়ক কিনা জুনিয়র!‌ সত্যিই যেন রূপকথার মতো। কিন্তু এই জুনিয়রকে ধরে রাখা যায়নি। নিঃশব্দে তাঁকে তুলে নিয়েছিল ডেম্পো। কী করে ভুলব ফেডারেশন কাপ ফাইনালের সেই মর্মান্তিক ঘটনার কথা!‌ মাঠেই প্রাণ হারিয়েছিলেন আমাদের প্রিয় জুনিয়র। তাঁর শেষ টাচটাও গোলের ঠিকানা চিনে নিতে ভুল করেনি।

সেই যে জুনিয়রের পনেরো গোলের সৌজন্যে চ্যাম্পিয়নের মুকুট মাথায় উঠেছিল, তারপর থেকেই সেই ট্রফি আধরাই থেকে গেছে। জাতীয় লিগের নাম পাল্টে আই লিগ হয়েছে। আই লিগকে ছাপিয়ে আই এস এল এসেছে। কিন্তু সেই ট্রফি আর ইস্টবেঙ্গল তাঁবুতে আসেনি। এল, বাইশ বছর পর ধরা দিল। এই আনন্দের সেলিব্রেশন চলল অনেকদিন ধরে। কিন্তু কী গণমাধ্যম, কী সমাজমাধ্যম। বড়ই উদাসীন রইল জুনিয়রকে ঘিরে। আত্মবিস্মৃত জাতি বলে বিশেষ ‘‌সুনাম’‌ আছে বাঙালির। সে তার ‘‌সুমহান ঐতিহ্য’‌ ঠিক বজায় রেখেছে।

Previous post ট্রেনে কাগজ পড়ার দিনগুলো যেন রূপকথা মনে হয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *