‌শহিদ দিবস ও একঝাঁক তামাশা

রক্তিম মিত্র

শহিদ তুমি কার?‌ এটাই যেন এবারের একুশে জুলাইয়ের সবথেকে বড় প্রশ্ন। চার দিকে চারটি অনুষ্ঠান। শহিদদের জন্য কতই না দরদ। এই রাজ্যের দেউলিয়াপনার ছবিটা আরও একবার প্রকট হয়ে গেল।

বিরোধীদের গালমন্দ করাটা নতুন একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। শাসককে প্রশ্ন করা যাবে না। অতএব, দুর্বল বিরোধীদেরই টার্গেট করো। কেন্দ্র হোক বা রাজ্য, মূলস্রোত মিডিয়া মোটামুটি এটাই রাস্তা বেছে নিয়েছে।

কোনও সন্দেহ নেই, ১৯৯৪ থেকে এই দিনটি পালন করে আসছেন মমতা ব্যানার্জি। রাজনৈতিকভাবে তিনি যদি কোনও তারিখকে সবথেকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, তবে তা একুশে জুলাই। সেই আন্দোলন সঠিক ছিল কিনা, তিনি তার রাজনৈতিক লাভ নিতে চাইছেন কিনা, সে অন্য প্রশ্ন। কিন্তু তিনি তিন দশকের বেশি সময় ধরে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দিনটিকে পালন করে আসছেন, এটা নিয়ে কোনও মহলেই দ্বিমত থাকার কথা নয়। তাই একুশে জুলাই শহিদ দিবসের ওপর যদি সবথেকে বেশি কারও অধিকার থাকে, সেটা অবশ্যই মমতা ব্যানার্জি।

অথচ, এবার সরকার যেন ঠিক করেই নিয়েছিল, এই দিনটি সুষ্ঠুভাবে পালন করতে দেবে না। তাই যিনি ৩২ বছর ধরে তিনটি পালন করে আসছেন, তাঁকে দেওয়া হল বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের কাছে ওই সঙ্কীর্ণ জায়গা। আর সেই দলের টিকিটে নির্বাচিত হয়ে হঠাৎ করে বিজেপি ‘‌বি টিম’‌ হয়ে যাওয়া গোষ্ঠীকে দেওয়া হল শহিন মিনার চত্বর। কাগজে কলমে ৬৫ জন বিধায়ক। যাঁরা মাথাপিছু দশজন করে লোক আনতে পারেননি। অর্ধেকের ওপর চেয়ার খালি পড়েছিল।

কংগ্রেস নম নম করে প্রতিবছরই দিনটি পালন করে। যেহেতু মমতা সেই সময় যুব কংগ্রেস নেত্রী ছিলেন, তাই কংগ্রেস এখনও সেই আন্দোলনের কৃতিত্ব হাতছাড়া করতে নারাজ। তবে এবার তারা যেন একটু বেশি উৎসাহিত। তাদেরও মোটামুটি ভাল জায়গাই দেওয়া হল।

এবার দিল্লি বাহিনী। ঋতব্রতরা তবু না হয় নিজেদের ‘‌আসল তৃণমূল’‌ বলে দাবি করছেন। কিন্তু রাতারাতি শিবির বদল করা কুড়িজন এমপি তো নিজেদের নামের সঙ্গে তৃণমূল চিহ্নটুকুও রাখেননি। তাঁরা এনসিপিআই নামের এক অজ্ঞাত কুলশীল দলে যোগ দিয়ে নিজেদের এনডিএ শরিক হিসেবে দাবি করছেন। তাঁরাও রাজঘাটের সামনে শহিদ তর্পণে নেমে পড়লেন।

যিনি একা হাতে তিন দশক ধরে আন্দোলনটা পরিচালনা করলেন, তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক নেই। তাঁর দলের টিকিটে নির্বাচিত হয়ে বিধায়ক বা সাংসদ হলেন। চূড়ান্ত অকৃতজ্ঞ ও নির্লজ্জের মতো অন্য শিবিরে ভিড়ে গেলেন। তাঁরা কিনা একুশে জুলাই পালন করছেন!‌ এইসব পরজীবীদের মুখে শহিদদের নাম মানায়!‌ আজ না হোক কাল, এঁরা সরাসরি বিজেপিতে ভিড়ে যাবেন। সেদিন একুশে জুলাই পালন করবেন তো?‌ তাহলে শহিদদের নাম ভাঙিয়ে এই ভণ্ডামি কেন?‌

কী আশ্চর্য, এমন নির্লজ্জদের মাথায় সরকারের হাত। সরকার নেমে পড়েছে মমতার কর্মসূচিকে বানচাল করতে। সারারাত ধরে পাহারায় বসে থাকতে হল মমতা ব্যানার্জি, কল্যাণ ব্যানার্জি, মহুয়া মৈত্রদের। কখনও মাইকের তার কেটে দেওয়া, কখনও বাইক বাহিনী এনে পণ্ড করে দেওয়ার চেষ্টা। পুলিশ কী ভূমিকা পালন করল?‌

এটা ঘটনা, মমতার এবারের সভায় সেই জৌলুস ছিল না। থাকার কথাও নয়। নিজের দলের জেতা বিধায়করাই গা ঢাকা দিয়ে পালিয়ে গেছেন, সিনেমা–‌সিরিয়ালের লোকেরা তো পালাবেই। কিন্তু ভিড়ের নিরিখে, জনতার অংশগ্রহণের নিরিখে বাকি তিন উদ্যোগকেই দশ গোল দিয়েছেন মমতা। শাসক থেকে সভা করা আর বিরোধী থেকে সভা করার মাঝে ফারাক অনেক। সেটা তৃণমূলও হাড়ে হাড়ে বুঝল। মমতাকে দেখে অনেকের খারাপ লাগতেই পারে। অনেকের করুণা হতেই পারে। কিন্তু তার থেকেও অনেক বেশি করুণা বোধ হয় শাসকদলের প্রাপ্য। হেরে যাওয়া মমতাকে আটকাতে এত নীচে না নামলেও পারতেন!‌

Previous post লিখে রাখলেই স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাবে
Next post যাক, বিধানসভা কিছুটা হলেও প্রাসঙ্গিক হল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *