বিশ্বকাপ মিলিয়ে দিয়ে গেল দুই কিংবদন্তিকে

ছয় বলে ছয় ছক্কা!‌ এই টি২০–‌র আবহে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের কাছে এটা আর কোনও বিস্ময় নয়। কিন্তু এই কৃতিত্ব প্রথম কার?‌ এক কথায় উঠে আসবে স্যর গ্যারি সোবার্সের নাম।

সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার কে?‌ সব বিতর্ককে ছাপিয়ে সবথেকে জোরালোভাবে উঠে আসবে যাঁর নাম, তিনি গ্যারি সোবার্স।

টেস্ট ক্রিকেটে সর্বাধিক রানের মালিক কে?‌ এখন উত্তরটা হবে ব্রায়ান লারা। কিন্তু ৩৬ বছর ধরে এই রেকর্ডের মালিক ছিলেন গ্যারি সোবার্স।

টেস্ট ক্রিকেটে সব ইনিংস মিলিয়ে সর্বাধিক রান কার? একসময় উত্তর ছিল স্যর ডন ব্র‌্যাডম্যান। বর্তমান উত্তর শচীন তেন্ডুলকার। কিন্ডু স্যর ডনকে ছাপিয়ে একসময় এই রেকর্ডেরও মালিক ছিলেন স্যর গ্যারি সোবার্স। ‌

এ তো গেল ব্যাটিংয়ের কথা। সেই সময়ে দাড়িয়ে তাঁর উইকেট সংখ্যা ২৩৫। তার থেকেও বড় কথা। বোলার হিসেবে তাঁর পরিচয় লিখতে গেলে তিনরকম পরিচয় দিতে হবে। বাঁ হাতি জোরে বোলার, বাঁ হাতি অফস্পিনার, বাঁ হাতি লেগস্পিনার।

তাঁর সময়ে দাঁড়িয়ে তিনিই সবথেকে লম্বা সময়ের অধিনায়ক। একটানা ৩৯ টেস্টে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

এমন কত রেকর্ড যে তাঁর নামের পাশে ছিল, এখন হিসেব মেলানোই মুশকিল।

আসলে, স্যর গ্যারি সোবার্স এমন একটা নাম পরিসংখ্যান বা রেকর্ড দিয়ে তাঁকে মাপা যাবে না। তবু পরিসংখ্যান অনেক সময় অনেক বিস্ময়কেও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

ক্রিকেট মানেই একটা সময় ছিল অস্ট্রেলিয়া বনাম ইংল্যান্ডের লড়াই। একটা সময় রাজ্যপাট ছিল ডন ব্র‌্যাডম্যানের হাতে। পাঁচের দশকের মাঝামাঝি উঠে এলেন আরও একজন। তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা বার্বাডোজে। ব্র‌্যাডম্যান পরবর্তী সময়ে তিনিই যেন ব্র‌্যাডম্যানের সার্থক উত্তরসূরি। গারফিল্ড সোবার্স হয়ে উঠলেন স্যর গ্যারি।

জন্ম ১৯৩৬। টেস্ট অভিষেক ১৯৫৪তে। অর্থাৎ, মাত্র ১৮ বছর বয়সে। আবির্ভাবেই দারুণ সাড়া ফেলেছিলেন, এমনটা বলা যাবে না। প্রথমবার পঞ্চাশ রানের গন্ডি পেরোন নিজের দশ নম্বর ইনিংসে। প্রথম ১৬টি টেস্টে কোনও শতরান ছিল না। কিন্তু প্রথম যে শতরানটা এল, সেই ইনিংস শতরানে থেমে থাকেনি। ডাবল সেঞ্চুরি ছাপিয়ে এল ট্রিপল সেঞ্চুরি। এখানেই শেষ নয়। যখন থামলেন নামের পাশে অপরাজিত ৩৬৫। পেরিয়ে গেলেন লেন হাটনের ৩৬৪ রানের রেকর্ড। যখন এমন বিরল কীর্তি স্থাপন করলেন, তখন সোবার্সের বয়স মাত্র ২১ বছর। ব্রায়াল লারার ব্যাটে যখন এই রেকর্ড ভাঙল, তখন মাঝখানে ৩৬ বছর পেরিয়ে গেছে।

তিনি ছিলেন ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটের মুক্তির সূর্য। কিংবদন্তি ফ্র‌্যাঙ্ক ওরেলের পর নেতৃত্বের ব্যাটন আসে সোবার্সের হাতে। শ্রেষ্ঠত্বের অভিমুখে ক্যারিবিয়ানদের যাত্রা শুরু। একেবারেই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন। যখন ক্রিকেটের ব্যাট তুলে রাখলেন, নামের পাশে ৯৩ টেস্ট, ৮০৩২ রান, ২৬টি শতরান। আর সর্বাধিক সেই অপরাজিত ৩৬৫ তো আছেই। এরই ফাঁকে কাউন্টি ক্রিকেটে ম্যালকম ন্যাশের ছটি বলে হাঁকালেন ছটি ছক্কা।

মাঠের মধ্যে, মাঠের বাইরে, সবমিলিয়ে স্যর গ্যারি ছিলেন এক বর্ণময় চরিত্র। শুধু নিজের দেশ নয়, সারা পৃথিবীজুড়ে নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করেছেন। কাউন্টিতে দীর্ঘদিন খেলেছেন নটিংহ্যাম শায়ারের হয়ে। এমনকী আমাদের ইডেন গার্ডেন্সেও তিনি দুটি টেস্ট খেলে গেছেন। ১৯৫৮–‌র টেস্টে করেছিলেন দুরন্ত শতরান। আরও একবার খেলেছেন ১৯৬৬–‌তে। সেই টেস্টেও করেছিলেন ৭০ রান। ভারত সম্পর্কে বরাবরই ছিল বাড়তি একটা দুর্বলতা। খেলা ছাড়ার পরেও এসেছেন আমাদের ইডেনে। ইডেনও হৃদয়ের উষ্ণতা দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছে তাঁদের প্রিয় কিংবদন্তিকে।

দুই দশকের ক্রিকেট জীবনে ইতি টেনেছিলেন ১৯৭৪ সালে। পরের বছরই পেয়েছিলেন নাইটহুড উপাধি। বর্ণবৈষম্য যখন অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে, তখন কৃষ্ণাঙ্গদের লড়াই ও আত্মমর্যাদার পতাকাকে তিনি গর্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। ফুটবল মাঠে পেলে, ক্রিকেট মাঠে গ্যারি সোবার্স, দুই কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীড়াবিদ নিজের নিজের খেলায় শাসন করছেন পৃথিবীকে। তখন তা শুধু খেলার মাঠে সীমাবদ্ধ থাকে না। সমাজ বিবর্তনের ইতিহাসকেও যেন নতুন করে লিখেছেন এই দুই কিংবদন্তি।

যতদিন বেঁচেছিলেন, মাথা উঁচু করেই বেঁচেছিলেন। নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি ছিলেন জীবন্ত এক কিংবদন্তি। ক্লাইভ লয়েড থেকে ব্রায়ান লারা, সুনীল গাভাসকার থেকে শচীন তেন্ডুলকার, প্রত্যেকেই তাঁর স্নেহ ও পরামর্শ পেয়েছেন। এই বয়সে, অসুস্থ শরীর নিয়েও মাঠে আসতেন। কয়েকদিন পরেই ছিল তাঁর নব্বই তম জন্মদিন। তার ঠিক কয়েকদিন আগেই থেমে গেল তাঁর জীবনের ইনিংস।

ঠিক চার বছর আগে। বিশ্বকাপ ফাইনালের কয়েকদিন পরেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন ফুটবল সম্রাট পেলে। এবারও ছিল বিশ্বকাপের আবহ। সারা পৃথিবী মেতেছিল বিশ্বকাপে। ফাইনালের ঠিক আগেই চিরঘুমের দেশে স্যর গ্যারি। দুই খেলার দুই কিংবদন্তির কী অদ্ভুত মিল!‌ দুজনকেই অদ্ভুতভাবে মিলিয়ে দিয়ে গেল বিশ্বকাপ।

Previous post তাকদার সেই ব্রিটিশ বাংলোয়
Next post লিখে রাখলেই স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *