রামরাজ্য দেখিনি, তবে আমরাজ্য দেখছি

অন্তরা চৌধুরি

আম! আম! আর আম! গোটা ভাগলপুরের বাজার জুড়ে যেদিকেই তাকাই সেদিকেই শুধু আমের পাহাড়। সেই দৃশ্য না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। এখন এমন একটা সময় যেখানে সবজি বাজারে সবজির দেখা পাওয়া ভার। বাজারের মাঝখান দিয়ে হেঁটে গেলে চারিদিকে রসরাজ আম তাদের নধর চেহারা নিয়ে বিরাজ করছেন। যেমন তার স্বাদ, তেমনই তার সুগন্ধ।

কয়েক মাস আগের কথা। চৈত্র মাসের এক সকালে ভাগলপুর থেকে মাকে নিয়ে যাচ্ছিলাম সুলতানগঞ্জের আজি গৈবিনাথের উদ্দেশে। সেই গৈবিনাথ, যেখানে তপন সিন্‌হার বিখ্যাত সিনেমা ‘বৈদুর্য রহস্য’ শ্যুটিং হয়েছিল। শহর পেরোতেই শুরু হল আমের বাগিচা। মাইলের পর মাইল রাস্তার দু’পাশে শুধুই আম গাছ। আম বাগিচা না বলে আমের অভয়ারণ্য বলাই ভাল। আর সেই গাছে এত আম ধরেছে যে পাতা প্রায় চোখেই পড়ে না। তখন অবশ্য আমগুলো কাঁচা ছিল। কিন্তু সেই অবস্থাতেও আমের ভারে গাছ যেন নুয়ে পড়েছে। একেবারে মাটি পর্যন্ত ঝুলছে। আমার মা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। অনেকটা সেই অপু–‌দুগ্গার ট্রেন দেখার মতোই বিস্ময়। আমাদের সাধের বাংলায় আমরা যে আম বাগান দেখিনি তা নয়। কিন্তু বিঘার পর বিঘা জুড়ে এমন আম–‌বাগান আমরা সত্যি কখনও দেখিনি। গুগল্‌ করে জানতে পারলাম যে, শুধু ভাগলপুরেই ১১,৯০০ হেক্টর আমের জমি আছে যেখানে ১০,০০০ মেট্রিক টন আম বছরে উৎপন্ন হয়।

ছোট থেকেই দেখে আসছি, আমাদের দক্ষিণবঙ্গে (‌এবং উত্তরবঙ্গেও)‌ গাছ থেকে পড়া কাঁচাগুলো কিন্তু ফেলা যায় না। সেই আম পরম মমতার সঙ্গে কুড়িয়ে আমসী, আমসীর টক থেকে শুরু করে কাঁচা আমের আচার, আম তেল কত কিছুই না লোকজন করে। কিন্তু এখানে গাছের তলায় মাঝারি মাপের অজস্র কাঁচা আম পড়ে থাকতে দেখে আমরা আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারলাম না। ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম,

‘আচ্ছা, এখানে এত আম পড়ে আছে, লোকজন খায় না?’

ড্রাইভার ফিচেল হাসি হেসে ভোজপুরি ভাষায় যা বললেন তার অর্থ হল, মানুষ তো ছার, গরু বাছুরও এখানে আম খায় না।

উত্তর শুনে আমরা একে অপরের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। বলার মতো আর কোনও ভাষা সেই মুহূর্তে খুঁজে পাইনি।

এরপর এক মাস গরমের ছুটি কাটিয়ে আবার ভাগলপুরে ফিরে এসেছি। একদিন সকালে আমার এক ছাত্রীর ফোন—

‘ম্যাম, আপনি বিকেলে বাড়িতে থাকবেন? আমি একবার যাব আপনার কাছে।’

ছাত্রী আমার কন্যাসম। বললাম, ‘নিশ্চয়ই আসবে।’

বিকেল নাগাদ সেই ছাত্রী এল বিশাল একখানা পিচবোর্ডের কার্টুন নিয়ে। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম,

‘কী আছে এতে?’

বলল, ‘ম্যাম আপনার জন্য আমাদের বাগিচার আম এনেছি।’

বাংলায় আমরাও কখনও সখনও গাছের কলাটা মুলোটা একে–‌তাকে দিয়ে বলি, ‘আমাদের গাছের’। চার-পাঁচটা পাতি লেবু বা একটা আধটা পেয়ারা বা এঁচোড়–‌কাঁঠাল পাড়া–‌প্রতিবেশীকে দিয়েই নিজেদের দাতা কর্ণ বা রাজা হরিশচন্দ্র ভেবে কেমন একটা শ্লাঘা অনুভব করি। কিন্তু পঁচিশ কেজি বাগিচার আম শিক্ষাগুরুকে দেওয়ার জন্য যত বড় মন লাগে, হলপ করে বলছি, তা আমাদের নেই।

কিছুটা বিস্ময়, কিছুটা আনন্দিত হয়ে কার্টুন খোলার সময় এক সুমিষ্ট গন্ধ নাকে ঝাপটা মারতে লাগল। তারপর পুরোপুরি কার্টুন খোলার পর দেখি প্রমাণ সাইজের দুধিয়া মালদেহ (ভাগলপুরের বিশেষ প্রজাতির আম) থরে থরে সাজানো। এক একটা আমের ওজন প্রায় তিনশো, চারশোর কাছাকাছি। দেখে তো আমার চক্ষু চড়ক গাছ! আমি কিছুটা আমতা আমতা করে জিজ্ঞাসা করলাম,

‘এত আম আমি একা কী করে…?’

আমার কন্যাসম ছাত্রীটি বলল, ‘ম্যাম, জাদা নেহি, সের্ফ পঁচ্চিশ কিলো হ্যায়। দো দিনমে খতম হো জায়েগা। বাদমে আপকো অউরভি দেকে জাউঙ্গি। পার ম্যাম কলেজ মে কিসিকো পাতা নেহি হোনা চাহিয়ে।’

আমি বাক্‌শূন্য হয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলাম। পঁচিশ কিলো আম আমি একা দু’দিনে শেষ করব! বাঁকুড়ায় থাকা আমার পিসিমণিকে ভাগলপুরের প্রায় সব গল্পই বলি। আমকাহিনি শুনে পিসিমণি বলল, ‘এখনকার যুগেও এমন মানুষ আছে!‌’ আম শুধু উপহার নয়। এ যেন এক আত্মীয়তার বন্ধন।

ভাগলপুরের সবচেয়ে বিখ্যাত আম হল জর্দালু। যদিও আমাদের বাংলায় ভাগলপুরী ল্যাংড়াই বেশি প্রসিদ্ধ। কিন্তু এই জর্দালু আম ভাগলপুরকে এক অন্য পরিচিতি দিয়েছে। হালকা হলুদ আভা যুক্ত চমৎকার সুগন্ধী ও পাতলা খোসা বিশিষ্ট এই আম এর অসাধারণ স্বাদের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু এই জর্দালুর কী এমন বিশেষত্ব?‌ ইতিহাস ঘেঁটে দেখলাম, ১৮১০ থেকে ১৮২০ সালের মধ্যে তৎকালীন খড়গপুর হাভেলির মহারাজা রহমত আলি খান বাহাদুর ভাগলপুর অঞ্চলে প্রথম জর্দালু আমের গাছটি লাগিয়েছিলেন। স্থানীয় আম-চাষিদের মতে, সেই প্রথম গাছটি গত দুই শতাব্দী ধরে তাগাইপুর গ্রামে সংরক্ষিত আছে। তবে অন্য জনশ্রুতিও আছে। অনেকে বলেন, অশোক কুমার চৌধুরি যিনি বিহারের ‘ম্যাঙ্গো ম্যান’ নামে পরিচিত, তিনিই নাকি প্রথম জর্দালু আমের চাষ শুরু করেছিলেন।

২০১৮ সালে এই আম মর্যাদাপূর্ণ জিআই ট্যাগ পেয়েছে। ভারতের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং ভিভিআইপিদের কাছে ফি বছর এই আম পাঠানো হয়। তবে সেই আম গরমের শুরুতে খুব অল্প সময়ের জন্যই পাওয়া যায়। অর্থাৎ, সেই আম ‘‌ক্ষণিকের অতিথি’।‌ ভাগলপুরের মানুষ এই আমকে ‘প্রেম কা ফল’ বলেও সম্বোধন করেন। এই আম সহজপাচ্য। বেশি মাত্রায় ফাইবার এবং চিনির পরিমাণ কম থাকায় এই আম দেশে–‌বিদেশে বেশ জনপ্রিয়। দার্জিলিংয়ের সেরা ব্র‌্যান্ডের চা যেমন প্যাকেটবন্দি হয়ে বিদেশে পাড়ি দেয়, জর্দালুও তেমনই ভিআইপি প্রজাতির আম। স্থানীয় বাজারে যা পড়ে থাকে, তা নাকি ঝড়তি–‌পড়তি। একবার আম খেতে বসে অনায়াসেই একডজন খেয়ে ফেলা যায়। তবে আমাদের পশ্চিমবঙ্গও পিছিয়ে নেই। উত্তর দিনাজপুরে এই আম পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন করার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। তবে জর্দালুর পরে যে আমের জন্য ভাগলপুর বিখ্যাত সেটা হল দুধিয়া মালদেহ। এই আমের বিশেষত্ব হল, এর ওপরের অংশটা হালকা সুবুজ মেশানো সাদা। স্বাদে গন্ধে অতুলনীয় তো বটেই। কিন্তু যাদের পাচন শক্তি বেশি মজবুত নয়, তাঁরা এই আম বেশি খেলে শরীরে নানারকম সমস্যা দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ এই আম হজম করা সহজ নয়। এছাড়াও এখানে আরও নানা প্রজাতির আম আছে। যেমন—বোম্বাই, গোলাপখাস, কেশর, মল্লিকা, সফেদা, লক্ষ্মণভোগ, কৃষ্ণভোগ, নীলম ইত্যাদি।

একম আমের নাম শুনে জিভে জল আসতে বাধ্য। কিন্তু মনের কোণে একটা প্রশ্ন নিশ্চয়ই এতক্ষণ উঁকি দিচ্ছে। এত যে আমের কথা বললাম, কিন্তু সেই আমের দাম কেমন? আমাদের বাংলায় একটু ভাল জাতের হিমসাগর বা ল্যাংড়া একশোর নীচে পাওয়া যায় না। তাহলে এখানে আমের দাম কেমন। জর্দালু এখানে ভিআইপি আম হওয়ায় তার দাম একশোর মধ্যেই ঘোরাফেরা করে। এখন দুধিয়া মালদেহ পঞ্চাশ টাকায় বিলিয়ে দিচ্ছে। আরও ক’দিন পর সেই আমের দাম নামতে নামতে দশ টাকা কিলো হয়ে যায়। একটু বেশি সন্ধের দিকে বাজারে গেলে পঞ্চাশ টাকায় পাঁচ কিলো–‌ছয় কিলো দিয়ে দিচ্ছে। যেগুলো একটু নরম, সেগুলো তো পাঁচ টাকা কিলোতেও দিয়ে দিচ্ছে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পারছি। প্রথম প্রথম ব্যাপারটা আমারও ঠিক হজম হয়নি। এত কম দামে আম!‌ নিতে লজ্জাই হত। কেমন একটা অপরাধবোধ কাজ করত। আবার বেশি করে নিয়ে যাব, সেই উপায়ও নেই। এত আম বইবে কে?‌

কিন্তু আমার সেই পঁচিশ কেজি আমের কী হল? প্রথম ক’দিন অতি উৎসাহে ভাত রুটি ছেড়ে শুধু আমই খাচ্ছিলাম। কিন্তু বিহারী–‌আম বাংলা–‌শরীরে সইবে কেন? একটা আম খেলে সারাদিন পেট ভর্তি তো থাকছেই। কিন্তু শরীর আনচান করছে। বুক ঢিপঢিপ করছে। তার সঙ্গে মনও। ভাবলাম, মেয়েটা অত কষ্ট করে দিয়ে গেছে। নষ্ট করব? তার চেয়ে কাজের মাসিকে দিয়ে দিই। তাকে দিতে গেলে সে হাত পা নেড়ে তার দেঁহাতি ভাষায় যা বলল, তার বঙ্গানুবাদ করলে মানে দাঁড়ায়, তার বাড়িতেই প্রচুর আম। কাল সকালে সেই-ই বরং আমাকে পাঁচ কেজি আম দিয়ে যাবার পরিকল্পনা করছে।

কী ভাবছেন? আসবেন নাকি আম খেতে একবার ভাগলপুর?

Previous post ‌অস্তরাগের আভায় রেঙে উঠুক বিশ্বকাপের আঙিনা
Next post কাকে দিলি রাজার পার্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *