কাকে দিলি রাজার পার্ট

সরল বিশ্বাস

বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, কাকে দিলি রাজার পার্ট!‌ বাংলার নতুন গ্রন্থাগার মন্ত্রীর কর্মকাণ্ড দেখে সেই প্রবাদটাই বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে।

তিনি দপ্তরের দায়িত্ব নিয়েই ঘোষণা করলেন, ‘‌লাইব্রেরি থেকে মমতা ব্যানার্জির বই সরিয়ে ফেলা হবে।’‌ একেবারে খাসা হেডলাইন হওয়ার মতোই কথা। এসেবারে সাজিয়ে দেওয়া বল। গোলে ঠেললেই হল। রিপোর্টার বা সাব এডিটরদের আর ভাবতেই হল না। একেবারে রেডিমেড হেডলাইন পাওয়া গেল। কী আশ্চর্য, পরের দিন প্রায় সব কাগজেই এই লাইনেই শিরোনাম।

সত্যিই তো, বাংলার লাইব্রেরি ব্যবস্থায় আর কোনও সমস্যাই নেই। শুধু মমতা ব্যানার্জির কয়েকটা বই আছে, এটাই একমাত্র সমস্যা। হ্যাঁ, লাইব্রেরি সম্পর্কে তাঁর এটাই ধারণা। এই ধারণা নিয়েই তিনি শপথ নিয়েছেন। যখন দপ্তর জানতে পারলেন, এই ধারণা নিয়েই ঘটা করে সেজেগুজে প্রেস কনফারেন্স করতে চলে এসেছেন।

আচ্ছা, এই মুহূর্তে কতগুলো লাইব্রেরি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে আছে?‌ কতগুলো আংশিক বন্ধ?‌ শূন্যপদ কত?‌ একটা জেলা লাইব্রেরি বা শহর লাইব্রেরিতে কত বই থাকে?‌ দপ্তরের বার্ষিক বাজেট কত?‌ এসব সম্পর্কে কোনও ধারণা আছে?‌ লাইব্রেরিয়ান থাকুক বা নাই থাকুক। লাইব্রেরি না হয় বন্ধই থাকুক। শুধু মমতা ব্যানার্জির বই সরিয়ে দিলেই যাবতীয় সমস্যার সমাধান।

আসলে, লাইব্রেরি দপ্তরটাকে এঁরা হেলাফেলার বিষয় বলেই মনে করা হয়েছে। মমতা ব্যানার্জি যখন মুখ্যমন্ত্রী হয়ে এলেন, লাইব্রেরি মন্ত্রী করলেন আব্দুল করিম চৌধুরিকে। বর্ষীয়ান নেতা। জনপ্রিয় নেতা। কিন্তু ঘটনা হল, এক লাইনও বাংলা পড়তে পারেন না। যিনি বাংলা পড়তেই পারেন না, তাঁকে দেওয়া হল লাইব্রেরির মতো দপ্তর। এরপর এলেন সিদ্দিকুল্লা চৌধুরি। লোক জড়ো করা, ঝামেলা বাঁধানো আর হুমকি দেওয়াই যাঁর একমাত্র যোগ্যতা। তিনি সমানে বলে গেলেন, সিপিএম আমলে মার্কস, লেনিনের বই দিয়ে লাইব্রেরি ভর্তি করা হযেছে। এই বুলি আওড়েই দশটা বছর কাটিয়ে দিলেন। না হল লোক নিয়োগ, বন্ধ হল একের পর এক লাইব্রেরি।

এবার নতুন সরকার। শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছে, শিক্ষা বা লাইব্রেরি সম্পর্কে তাঁদের মনোভাব কী?‌ লাইব্রেরি মন্ত্রী চটকদার শিরোনামটুকুই বোঝেন। হাজার দশেক বইয়ের ভিড়ে যদি মমতা ব্যানার্জির গোটা দশেক বই থেকেও থাকে, কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল?‌ আপনারাও না হয় খান কয়েক মোদির জীবনী, শ্যামাপ্রসাদের জীবনী রাখবেন। না হয় আরএসএসের কিছু বইও থাকল। এবং আপনি চান বা না চান, এসব বই তো ঢুকবেই। তাহলে খামোখা মমতা ব্যানার্জির নামে দোষারোপ কেন?‌

তৃণমূল জমানায় শোনা যেত, লাইব্রেরিতে নাকি শুধু মার্কস, লেনিনের জীবনী আছে। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্রদের বই নেই। কতখানি অজ্ঞ হলে এই জাতীয় কথা বলা যায়। আসলে, এঁদের সঙ্গে লাইব্রেরির ততটাই সম্পর্ক উগান্ডার লোকের সঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীতের যতখানি সম্পর্ক। নতুন লাইব্রেরি মন্ত্রীও যে ব্যতিক্রম নন, প্রথম ইনিংসেই বুঝিয়ে দিয়েছেন।

আচ্ছা, লাইব্রেরি দপ্তরের জন্য যথার্থ শিক্ষত, বই মনষ্ক লোকের কি সত্যিই এত অভাব?‌ এই দপ্তরটাকে আস্তাকূঁড় ভেবে নেওয়া কি খুব জরুরি?‌ মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে বলতে ইচ্ছে করে, কাকে দিলেন রাজার পার্ট?‌

Previous post রামরাজ্য দেখিনি, তবে আমরাজ্য দেখছি
Next post বুদ্ধদেব গুহর বাংলো, চলে গেল অপর্ণা সেনের হাতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *