‌অস্তরাগের আভায় রেঙে উঠুক বিশ্বকাপের আঙিনা

একজন চল্লিশের দোরগোড়ায়। অন্যজন আগেই পেরিয়ে গেছেন চল্লিশের গন্ডি পেরিয়ে গিয়েছেন অনেক আগেই। বিশ্ব ফুটবলের যা গতিপ্রকৃতি, তাতে বলাই যায়, তাঁরা বৃদ্ধ হলেন। কিন্তু কেউ কেউ থাকেন, বয়স যাঁদের সেভাবে স্পর্শ করে না। বয়স যাঁদের কাছে নিছকই একটা সংখ্যা। একজন লিওনেল মেসি, অন্যজন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। দুজনেরই বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হয়েছে সেই ২০০৬ সালে। দেখতে দেখতে এটা তাঁদের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। কিন্তু তারপরও সবাইকে ছাপিয়ে তাঁরাই বিশ্বকাপের তারকা। হয়তো একটু কমিয়ে বলা হল, তারকা নন, তাঁরা নিশ্চিতভাবেই মহাতারকা।

নিছক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা নয়। দুজনেই বরাবর থেকেছেন ফর্মের চরম শিখরে। দুজনের নামের পাশেই রয়েছে বিশ্ব ফুটবলে সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি। মেসি নিজের দেশ আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপে একবার চ্যাম্পিয়ন করেছেন, একবার ফাইনালে তুলেছেন। রোনাল্ডো দেশের ফুটবলে হয়তো তেমন সফল নন, কিন্তু পর্তুগালকে ঘিরে যেটুকু আগ্রহ, তাঁর জন্যই। তাছাড়া দেশের হয়ে ঘাটতি থাকলেও ক্লাব ফুটবলে সেই অপূর্ণতা ঢেকে দিয়েছেন।

ফুটবল নাকি তরুণদের খেলা। এখানে তিরিশ বছর বয়স মানেই ধরে নেওয়া হয়, এবার তিনি বানপ্রস্থে যাবেন। দিকপাল ফুটবলারদের অধিকাংশই তাঁদের সেরা সময়টা তিরিশের আগেই ফেলে এসেছেন। এই বয়সে এসে কেউ কোচ হয়ে যান। কেউ আবার ধারাভাষ্য দিতে শুরু করেন। এই দুজনকে নিয়েও বেশ কয়েক বছর ধরেই উঠে আসছে অবসরের জল্পনা। কিন্তু সব জল্পনা দূরে সরিয়ে তাঁরা স্বমহিমায় উজ্জ্বল। দুজনেই ক্লাব ফুটবলে দাপিয়ে খেলেছেন ইউরোপের বিভিন্ন দলের হয়ে। এখন মেসির ঠিকানা মার্কিন মুলুক। আর রোনাল্ডো এসেছেন আরব দুনিয়ায়। তাঁদের দুজনকে ঘিরে এই দুই দেশে তৈরি হচ্ছে ফুটবলের নতুন সম্ভাবনা।

বিশ্বমানের তারকাদের অধিকাংশই টানা এতদিন খেলার মতো জায়গায় থাকেন না। পেলে বিশ্বকাপে খেলেছেন ১২ বছর, মারাদোনাও তাই। সেখানে মেসি–‌রোনাল্ডোরা বিশ্বকাপের আঙিনায় খেলছেন কুড়ি বছর। তারপরও তাঁদের ফিটনেস নিয়ে একফোঁটা প্রশ্ন নেই। মেসি এখনও তিন–‌চারজনকে অনায়াসে কাটিয়ে গোল করছেন। রোনাল্ডো এখনও স্পট জাম্প করে বাকিদের পিছনে ফেলে দিচ্ছেন। কখনও গোলার মতো শটে বল পাঠাচ্ছেন জালে। দুজনকে ঘিরেই এখনও আতঙ্কে থাকতে হয় বিপক্ষের ডিফেন্ডারদের। সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় বিপক্ষের কোচদের। আর তামাম ফুটবল প্রেমী জনতা এখনও তাঁদের নিয়েই মাতোয়ারা। মিডিয়ার আকর্ষণের কেন্দ্রেও তাঁরাই।

বিশ্বকাপ মানেই অনেক তারকার জন্ম। অনেকে আবার তরুণদের ভিড়ে হারিয়েও যান। কিন্তু এই দুজন এখনও উজ্জ্বল। যতটা নামে, ততটাই ফর্মে। প্রথম ম্যাচেই মেসির দুরন্ত হ্যাটট্রিক। পরের ম্যাচে জোড়া গোল। মিরোস্লাভ ক্লোজেকে টপকে বিশ্বকাপের সর্বাধিক গোলের নায়ক হয়ে গেছেন। অন্যদিকে, রোনাল্ডো প্রথম ম্যাচে কিছুটা নিষ্প্রভ থাকলেও পরের ম্যাচেই পেলেন জোড়া গোল। বুঝিয়ে দিলেন, তিনিও পিছিয়ে নেই। বয়স ৪১ হলেও তিনি দলের বোঝা নন। বরং, এই বয়সেও তিনিই সেরা সম্পদ।

দুজনেরই হয়তো এটাই শেষ বিশ্বকাপ। কাউকে হয়তো মাঝপথেই থেমে যেতে হবে। কিন্তু ষষ্ঠ বিশ্বকাপেও দুই মহাতারকা যেভাবে ফর্মের শিখরে আছেন, তাঁরা দুজনেই যেন নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। সারাজীবন যেমন উজ্জ্বল হয়ে থেকেছেন, তাঁদের বিদায়বেলাও তেমনই উজ্জ্বল হয়ে উঠুক। অস্তরাগের আলোয় দুজনেই রাঙিয়ে দিয়ে যান বিশ্বকাপের আকাশ।

Previous post কোনও তদন্ত নয়, নির্লজ্জ ছ্যাবলামিই আমাদের প্রাপ্য
Next post রামরাজ্য দেখিনি, তবে আমরাজ্য দেখছি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *