রাজ্যে একের পর এক ধর্ষণকান্ড। কেন হচ্ছে ? এই চৈত্রমাসে সেটা হঠাৎ করে বেড়ে গেল কেন ? বসন্তের আহ্বান ? নাকি চিরাচরিত চৈত্র সেল! অনেকদিন বিরতির পর আবার স্বমহিমায় ফিরে এলেন। ভিন্নস্বাদের লেখা উপহার দিলেন রবি কর।।
চৈত্র মাস এসে গেছে। চৈত্র মাস এলেই বাঙালির কেনা পায়। চৈত্র মাস মানেই সেল-সেল-সেল। হাতিবাগান, গড়িয়াহাট, শ্রীরামপুর, বর্ধমান, শিলিগুড়ি- সব জায়গায় সেল-সেল-সেল। শুধু এলি-তেলি-লঙ্কাওয়ালির দোকান নয়, প্যান্টালুনস থেকে বাটা সবাই সেল দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। হরেক কিসিমের জিনিস, তার দামে হরেক কিসিমের ছাড়, সেই ছাড়ের হরেক কিসিমের বিজ্ঞাপন।
কিন্তু যে জিনিসের চাহিদা সব থেকে বেশি, যে জিনিস খরিদ করার জন্য মানুষ নালেঝোলে একসা, তার কোনও M.R.P. নেই, দামে কোনও ছাড়ও নেই। তবে বিজ্ঞাপন আছে সর্বত্র। কম্পিউটার খুলে ই-মেল চেক করছি, pop-up window খুলে গেল, “Hi! I am Riya.” মোবাইলে মেসেজ এলো, “ Hi! Main hoon Nisha.” তারা সবাই আমার সঙ্গে ‘মনচলি বাতেঁ’ করতে চায়। খবরের কাগজে শ্রেণিবদ্ধ বিজ্ঞাপনে একের পর এক আহ্বান, ‘বড় ঘরের হাই প্রোফাইল মহিলাদের সঙ্গে bold relation গড়ে তুলে যৌবনের আনন্দ উপভোগ করুন।‘
এই ‘বড় ঘরের হাই প্রোফাইল মহিলা’ বস্তুটি কী, তা জানার জন্য একটু কষ্ট করে পর্ণগ্রাফিক সাইট খুঁজতে হবে। (অবশ্য কষ্ট করার কিছু নেই, ইন্টারনেট খুললে সাইটগুলোই আপনাকে খুঁজে নেবে।) ‘বড় ঘরের হাই প্রোফাইল মহিলা’ হল তারা, যারা আমার নাগালের বাইরে কিন্তু দিবানিশি আমার ফ্যান্টাসিতে হানা দেয়। প্রতিবেশী বউদি, হাসপাতালের নার্স, বিমানসেবিকা, সন্ন্যাসিনী, স্কুলকলেজের ছাত্রী, রাতের বাসে একাকিনী যাত্রী, শ্বেতাঙ্গিনি পর্যটক এবং হা ঈশ্বর মাতা-কন্যা-ভগিনি কেউই ‘বড় ঘরের হাই প্রোফাইল মহিলা’র বাইরে নয়!
এদের বশবর্তী করার পন্থাও সাইটগুলোতে দেখান হয়। ভালো কথায় শুনলে ভালো, নইলে ঝাঁপিয়ে পড়ো, পিষে ফেলো, গুঁড়িয়ে দাও- প্রাথমিক গাঁইগুই ঝেড়ে ফেলে নারী তোমার গলা জড়িয়ে ধরবে। আর যদি গ্রুপ সেক্স করতে পারো তা হলে সে তো তোমার পোষা বাঁদি। মোবাইলে মোবাইলে, স্কুল ছাত্রদের হাতে হাতে ঘুরছে এই সব কীর্তির ক্লিপিংস।
মুশকিল হল, এইসব ক্লিপিংস হাতে পাওয়া যতটা সহজ, ‘বড় ঘরের হাই প্রোফাইল মহিলা’দের হাতে পাওয়া ততটা সহজ নয়। তাই ভরসা সেল-সেল-সেল। সাইটে যেমন দেখায় তেমনটা পেলে ভালো নইলে, কানামাছি ভোঁ ভোঁ যাকে পাবি তাঁকে ছো। সল্টলেকের রাস্তায় বিমানসেবিকার শ্লীলতাহানি, ইংলিশবাজারে বিধবা ধর্ষিতা, শালবনীতে খুড়তুতো বোনকে ধর্ষণ, কাটোয়ায় ৮২ বছরের বৃদ্ধা, রানাঘাটে ৭২ বছরের সন্ন্যাসিনী… আরে বুড়ি তো কী হয়েছে? সেলের আবার ভালোমন্দ!
সেল-সেল-সেল চৈত্র সেল। সেল তো বছরের অন্য সময়ও হয়, কিন্তু এমন ধুম অন্য সময় হয় না। ধর্ষণ তো সারা বছরই হয়, কিন্তু এবছর চৈত্র মাসে পুরো ধুম মচিয়ে দিয়েছে। কাগজ খোল, টি ভি খোল একটাই খবর। অন্য সময় ধর্ষিতার পোশাক-চরিত্র- একা একা কী করছিল ইত্যাদি প্রশ্ন তোলা যায়, কিন্তু এবারের চৈত্র সেলে বুড়িদের ইজ্জতও বিকিয়ে যাচ্ছে। অন্য সময় ধর্ষিতার ভাই-কাকাকে চাকরি দিয়ে ম্যানেজ করা যায়। কিন্তু বুড়ি সন্ন্যাসিনীর আত্মীয়ও নেই, তাঁদের চাকরির লোভও নেই। তাই চৈত্র সেল চলছে চলবে।
এই জমজমাট সেলের বাজারে, পার্ক স্ট্রীটের মেয়েটা বেমক্কা মরে গেল। আর কটা দিন বাঁচলে জেনে যেত, যে দেশে স্কুলের ভিতরে বৃদ্ধা সন্ন্যাসিনীও বাদ যায় না, সেখানে সে তো ডিভোর্সি, নাইট ক্লাবে যাওয়া…।
ইস বেচারি এবারের সেলটা দেখে যেতে পারল না।


