স্বরূপ গোস্বামী
২০১৫–র জানুয়ারি। ভারত তখন অস্ট্রেলিয়া সফরে। তিনটি টেস্ট হয়ে গেছে। একটা তখনও বাকি। হঠাৎ সাজঘরে সতীর্থদের জানিয়ে দিলেন, ‘তোমাদের একটা কথা জানাতে চাই। আমি আর টেস্টে খেলব না। আমি আমার শেষ টেস্ট খেলে ফেলেছি।’ শেষ টেস্ট টেস্ট বাকি। তারপরই বিশ্বকাপ। এই সময় কেউ এমন ঘোষণা করে! রাতারাতি অধিনায়ক হয়ে গেলেন বিরাট কোহলি।
এবার সময়টা ২০১৭। বিশ্বকাপের জন্য কম্বিনেশন বেছে নেওয়া হচ্ছে। টেস্ট থেকে আচমকা বিদায় নিলেও একদিনের ক্রিকেটে তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। ২০১৯ এ নিশ্চিতভাবেই তিনি ক্যাপ্টেন। কিন্তু এবারও হঠাৎ করে জানিয়ে দিলেন, আর নেতৃত্ব দেবেন না। এবারও নেতৃত্বের ব্যাটনটা এসে গেল বিরাট কোহলির হাতে।
বিশ্বকাপের পর থেকেই অবসরের জল্পনা চলছিল। তিনি প্রকাশ্যে তেমন কিছুই বলছিলেন না। ক্রিকেট থেকে কিছুটা দূরেই ছিলেন। এবার ২০২০–র পনেরোই আগস্ট। সন্ধেবেলায় ইনস্টাগ্রামে ছোট্ট একটা ভিডিও আপলোড। বেজে উঠল মুকেশের সেই বিখ্যাত গান, ‘ম্যায় পল দো পল কা সায়র হুঁ’। অর্থাৎ, দেশের হয়ে শেষ ম্যাচ খেলে ফেলেছি।
মহেন্দ্র সিং ধোনি এরকমই। আগাম ঘোষণা করে কিছু করার বান্দা নন। তিনি বর্ণাঢ্য ফেয়ারওয়েল নেওয়ারও বান্দা নন। এভাবেই হঠাৎ করে জানিয়ে দেন নিজের বিদায়বার্তা। ২০১৫ তেও যেমন, ১৭ তেও তেমন, আবার ২০ তেও তেমনই। হাসতে হাসতে নেতৃত্বের ব্যাটনটা তুলে দিতে পারেন অন্য কারও হাতে।
যখন টেস্টে দাড়ি টানলেন, তখন নামের পাশে নব্বই টেস্ট। আর দশটা টেস্ট তো হেসেখেলেই খেলে দিতে পারতেন। একশো টেস্টের মাইলস্টোন। সেই এলিট ক্লাবে কে না পৌঁছতে চায়! কিন্তু এসব কীর্তির পেছনে ছোটা তাঁকে মানায় না। বরং কীর্তিই তাঁর পেছনে ছোটে। সৌরভ, শচীনরা জানতেন, এটাই তাঁদের শেষ টেস্ট। সারা দেশ জানত। বিদায়বেলায় গ্যালারির যাবতীয় আবেগ যেন তাঁদের ঘিরেই। কিন্তু ধোনিকে কোনও গ্যালারি সেভাবে বিদায় দেওয়ার সুযোগই পেল না। কারণ, আগাম ঘোষণা করে তিনি শেষ ম্যাচ খেলেননি। হয়ত নিজে জানতেন, শেষ ম্যাচ। কিন্তু কাউকে বুঝতে দেননি। অনেক পরে, নিঃশব্দে জানিয়ে দিয়েছেন, শেষ ম্যাচ খেলে ফেলেছি। ফলে, না বোর্ড, না গ্যালারি, না মিডিয়া— কেউই বিদায়বেলায় আবেগে রাঙিয়ে দেওয়ার সুযোগ পায়নি। তিনিও বিদায়বেলায় অস্তরাগের আবির মাখতে চাননি।
অবসর নিয়ে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। ফ্ল্যাশব্যাকে কত মুহূর্ত ফিরে আসে। এতদিনের সংগ্রাম, কত লোকের প্রতি জমে থাকা কত কৃতজ্ঞতা, কত টুকরো অভিমান— সব বেরিয়ে আসে বিদায়বেলায়। ওয়াংখেড়েতে শচীনের বিদায়ীবার্তা তো বহু বছর পরেও ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে গেঁথে থাকবে। আস্ত একটা ভারতবর্ষ সেদিন বসেছিল টিভির সামনে। শুধু অঞ্জলি, সারা বা অর্জুন নন, কত ঘরে সেদিন নিঃশব্দে চোখের জল পড়েছে। কিন্তু ধোনি কখনই বিদায়ী ভাষণ দিলেন না। চোখের জল ফেলার সুযোগ দিলেন না। বলতে পারতেন অনেক কিছুই। কিন্তু কিছুই বললেন না।
আসলে, ঘনঘন টুইট করে, ছবি পোস্ট করে তাঁকে অস্তিত্বের জানান দিতে হয় না। তাই মাসের পর মাস সেনা প্রশিক্ষণে থাকলেও সেই কঠোর পরিশ্রমী জীবনের কথা ঢাক পিটিয়ে বলতে শোনা যায় না। হাতে গোনা কয়েকটা ছবির বাইরে তেমন ছবিও পাওয়া যায় না। নিজের ফার্ম হাউসে মাসের পর মাস ট্রাক্টর চালান, চাষবাস করেন, কেউ জানতেও পারে না। এমন গহিন অরণ্যে হারিয়ে যান, নির্বাচকরাও দিনের পর দিন ফোনে ধরতে পারেন না। চুপিসারে মাসের পর মাস প্রেম করে বিয়ে করে ফেলেন, অনুসন্ধানী মিডিয়া জানতেও পারে না। ভাবতে পারেন, এই শহরেই নিঃশব্দে ঘাঁটি গেড়ে পড়ে থেকেছেন। রাতের বেলায় পিজি হসপিটালের কাছেই ওই চায়ের দোকানে মাটির ভাড়ে দিনের পর দিন চা খেয়ে গেছেন। নিঃশব্দে এই শহরের জামাই হয়ে গেছেন। কেউ জানতেও পারল না।
কী মাঠের মধ্যে, কী মাঠের বাইরে, এই সংযমটাই যেন তাঁর ইউএসপি। এবারের আইপিএলের কথাই ধরুন। ইডেন হোক বা কোটলা, গ্যালারিতে শুধুই হলুদ ঝড়। নিজের শহরের জার্সির বদলে সবার গায়েই চেন্নাইয়ের জার্সি। বোঝাই গেল না, কাদের ঘরের ম্যাচ। কলকাতার গ্যালারিও চাইছে, ধোনির ব্যাটে ঝড় উঠুক, দিল্লির গ্যালারিও তাই চাইছে। ফ্র্যাঞ্চাইজি নিয়ন্ত্রিত ক্রিকেট দুনিয়ায় এমন গণসম্মোহন আর কাকে ঘিরে দেখা গেছে! অথচ, প্রায় সব ম্যাচেই নামলেন আট নম্বরে। কখনও খেললেন তিনটি বল, কখনও একটি। এখনও সাবলীলভাবে হেলিকপ্টার শট নিতে পারেন। এখনও একাই ঘুরিয়ে দিতে পারেন ম্যাচের মোড়। কিন্তু তিনি সেই আট নম্বরে।
আসলে, তাঁর সবকিছুই বড় অদ্ভুত। চেনা ব্যকরণ, চেনা কক্ষপথ তাঁর জন্য নয়। দল জিতলে তাঁকে পাওয়া যাবে না। প্রেস কনফারেন্সে পাঠিয়ে দেবেন ম্যাচের নায়ককে। কিন্তু হারলে জবাবদিহির সব দায় যেন তাঁর।
তাঁর একান্ত সাক্ষাৎকারের জন্য হত্যে দিয়ে পড়ে থেকেছে দেশ বিদেশের তামাম মিডিয়া। ইউটিউব ঘেঁটে দেখুন। একটাও টেস্ট বা ওয়ান ডে খেলেননি, এমন ক্রিকেটারেরও খান পঞ্চাশেক ইন্টারভিউ পেয়ে যাবেন। ধোনির ইন্টারভিউ পেতে আপনাকে হিমশিম খেতে হবে। যেসব ফুটেজ পাবেন, সেগুলোকে ঠিক ইন্টারভিউ বলে না।
এ পর্যন্ত খেলোয়াড়দের নিয়ে যে সমস্ত বায়োপিক হয়েছে, তার মধ্যে সবথেকে দাগ কাটার মতো বায়োপিক তাঁরই। কারণ, সেখানে যথার্থই ‘আনটোল্ড’ স্টোরি। এমন অনেকদিকে আলো পড়েছে, যা এতদিন অন্ধকারেই ছিল। অকপট সত্যিই ছিল নির্যাস। চাঞ্চল্য আনতে কল্পনার রঙ মেশাতে হয়নি। যেমন ধরা যাক, টি২০ বিশ্বকাপে এক লহমায় শচীন, সৌরভ, রাহুলকে বাদ দেওয়ার প্রসঙ্গ। ধোনি তাঁদের দলে চাননি, এমন একটা কানাঘুসো ছিল। নিজের বায়োপিকে অনায়াসেই বিষয়টা এড়িয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু অপ্রিয় হওয়ার যাবতীয় ঝুঁকি নিয়েও এই দৃশ্যটা রাখলেন। স্বীকার করে নিলেন, হ্যাঁ, ওটা আমারই সিদ্ধান্ত ছিল।
পর্দায় নিখুঁতভাবে ধোনি হয়ে ওঠা সেই সুশান্ত সিং রাজপুত। করোনা–কালে বিনা নোটিশে হঠাৎই বিদায় নিলেন। টিভি, কাগজ, সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে প্রতিক্রিয়ার বন্যা বয়ে গেল। কিন্তু যাঁর প্রতিক্রিয়ার দিকে সারা দেশ তাকিয়েছিল, তাঁর একলাইনও বিবৃতি পাওয়া গেল না। আসলে, তিনি জানেন, কথায় কথায় প্রতিক্রিয়া দিতে নেই। আড়ালটুকু বড্ড জরুরি। ‘লিডিং ফ্রম দ্য ফ্রন্ট’ কথাটা চালু আছে ঠিকই। কিন্তু তাঁকে দেখে মনে হয়, আসল নায়ক বোধ হয় আড়ালেই থাকেন।
