কুণাল ঘোষ আর কতটুকুই বা ‘‌কলঙ্কিত’‌ করলেন!‌

রক্তিম মিত্র

দশ বছর শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকলে একজন প্রধান শিক্ষক হওয়ার পরীক্ষায় বসতে পারেন। দীর্ঘদিন আইনজীবী হিসেবে কাজ করার পর একজন বিচারপতির আসনে বসেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিভিন্ন পেশায় এটাই দস্তুর। কিন্তু বিধানসভা যেন এর ব্যতিক্রম। এখানে প্রথমবার জিতেই স্পিকার হয়ে গিয়েছিলেন বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপির জমানাতেও সেই ট্র‌্যাডিশন। প্রথমবার জিতেই স্পিকারের আসনে রথীন্দ্র বসু।

ফল যা হওয়ার, তাই হচ্ছে। বিধানসভা পরিচালনার সাধারণ নিয়মগুলোও ঠিকঠাক জানেন না। অতীতে কী হয়েছে, কী হয়নি, সেই সম্পর্কে ধারণাও নেই। হাতে আড়াই মাসের মতো সময় পেলেন। এই আড়াই মাসে কাজের পদ্ধতি কিছুটা হয়তো শিখে নেওয়া যেত। সেই চেষ্টাটুকুও দেখা যাচ্ছে না।

বলা হয়, স্পিকারের পদটা সম্মানীয় পদ। তাঁকে নাকি অসম্মান করা যায় না। কিন্তু এই পদটা যে সম্মানীয় পদ, তা নিজেকে তো বুঝতে হবে। নিজের চেয়ারের সম্মানরক্ষার সবথেকে বেশি দায়িত্ব তাঁর নিজের। কিন্তু নিজে যদি নিজেকে হাস্যকর করে তোলেন, তাহলে অন্যরা আর কতটুকুই বা সম্মানরক্ষা করতে পারবেন!‌

বিতর্ক তৈরি হয়েছে কুণাল ঘোষকে ঘিরে। দিনের পর দিন বক্তার তালিকায় তাঁর নাম কেটে দেওয়া হচ্ছে। তিনি কাকে বলবেন?‌ সভার অভিভাবককেই বলার কথা। কিন্তু স্পিকার মশাই তাঁকে বলার সুযোগ করে দিতে পারছেন না। উল্টে তাঁকেই মার্শাল দিয়ে চ্যাংদোলা করে বের করে দিলেন। সেদিনের জন্য সাসপেন্ড করে দিলেন।

তিনি ভেবে বসলেন, ইতিহাসে তিনি বোধ হয় প্রথম এই কাজ করলেন। মার্শাল দিয়ে কোনও বিরোধী সদস্যকে বের করে দেওয়া বা শৃঙ্খলারক্ষায় মার্শালের হস্তক্ষেপটা বিধানসভার ইতিহাসে মোটেই নতুন কোনও ব্যাপার নয়। একটা রুটিন ঘটনা। অন্তত পঞ্চাশবার এমনটা ঘটেছে। কিন্তু স্পিকার মশাই না জানলে কী করা যাবে!‌

পরের দিন বলে বসলেন, কলঙ্কজনক ঘটনা। এমনটা নাকি কখনও হয়নি। তিনি জানেন না, অতএব হয়নি। বঙ্কিমচন্দ্রের কোনও উপন্যাস আমি পড়িনি, অতএব তিনি কোনও উপন্যাস লেখেননি, ব্যাপারটা এইরকম। কুণাল ঘোষ তাঁর মতো করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন, স্পিকার তাঁর মতো করে ব্যবস্থা নিয়েছেন। এর মধ্যে কোনও নতুনত্ব নেই। এবং এটা মোটেই নজিরবিহীনও নয়। কুণাল ঘোষের প্রতিবাদের পন্থা নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে, সমালোচনা থাকতে পারে। শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও হতে পারে।

কিন্তু একজন নির্বাচিত বিরোধী বিধায়কের নাম রোজ রোজ কেটে ফেলা হবে, এটা আরও বেশি লজ্জার। এবং এর দায় অবশ্যই স্পিকারের। বিরোধী হুইপ বক্তার তালিকা জমা দেবেন, এটাই প্রথা। কিন্তু কোন দলের কে বলবেন, সেটা তিনি ঠিক করতে পারেন না। অতীতে যখন তৃণমূল মূল বিরোধী দল ছিল, কখন বিরোধী বেঞ্চে কংগ্রেস, এসইউসিআই, জিএনএলএফ, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার মতো বিরোধী দলও ছিল। তাঁরাও বলতেন। প্রতিটি বাজেটেই তাঁদের জন্যও সময় বরাদ্দ হত। জিএনএলএফের কে বলবেন, তা তৃণমূল হুইপ ঠিক করতেন না। ঠিক যেমন ফরওয়ার্ড ব্লক বা আরএসপির পক্ষ থেকে কে বলবেন, সেটা সিপিএমের হুইপ ঠিক করতেন না।

এত বছরের প্রথা। স্পিকার মশাই জানেন না বলেই এই জটিলতা তৈরি হচ্ছে। আগে কীভাবে সময় বণ্টন হত, সেটা জানার চেষ্টাও করেছেন বলে মনে হয় না। এক তো মার্শাল দিয়ে বের করে দেওয়া হল। এতেই শেষ নয়। পরের দিন তাঁর বিরুদ্ধে প্রিভিলেজ মোশন আনা হল। আনলেন স্বয়ং পরিষদীয় মন্ত্রী। এবং কোনও আলোচনা ছাড়াই সেই মোশন গ্রহণ করা হল। বিধানসভাকে কোন নর্দমায় নামাতে চাইছেন?‌ তিনি কুণাল ঘোষকে পরামর্শ দিচ্ছেন, এটা আপনাদের ব্যাপার। নিজেদের মধ্যে মেটান। তাহলে তিনি সভার অভিভাবক হয়েছেন কেন?‌ কে বিরোধী দলনেতা হবেন, সেটাও তো তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারই ছিল। সেখানে স্পিকারকে এত তৎপর হয়ে দিল্লি ছুটতে হল কেন?‌ অতীতে কোনও স্পিকারকে বিরোধী দলে ভাঙন ধরাতে এমন তৎপরতা দেখাতে হয়নি। পরিষদীয় রাজনীতিতে এমন নির্লজ্জতার নজির ভারতবর্ষে আর একটা আছে?‌ এটা যদি কলঙ্কজনক না হয়ে থাকে, তার থেকে বেশি কলঙ্কজনক আচরণ অন্তত কুণাল ঘোষ করেননি।

যাকে তাকে রাজার পার্ট দিলে মাঝখান থেকে যাত্রাটাই পণ্ড হয়।

Previous post ভাল করে পোস্টার দেখুন, আগে সুচিত্রা, পরে উত্তম
Next post হোম স্টের নামে রিসর্ট কালচার বন্ধ হোক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *