হোম স্টের নামে রিসর্ট কালচার বন্ধ হোক

রজত সেনগুপ্ত

‌কয়েকমাস আগে গিয়েছিলাম পাহাড়ে। বছরে দুই থেকে তিনবার উত্তরবঙ্গে যাওয়াটা বহুদিনের অভ্যেস। শহর নয়, পাহাড়ি গ্রামগুলোই আরও বেশি করে টানে। গ্রামের স্নিগ্ধতা, নির্জন প্রকৃতি যেন মন ভাল করে দেয়। ঝাঁ চকচকে হোটেল বা রিসর্ট নয়, পাহাড়ি মানুষদের আতিথেয়তা যেন মন ছুঁয়ে যায়।

কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে অদ্ভুত একটা প্রবণতা লক্ষ করছি। হোম স্টের নামে গজিয়ে উঠেছে বিশাল ইমারত। সেগুলি হোম স্টে না বলে হোটেল বলাই ভাল। একটু খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, সেইসব হোম স্টের সঙ্গে পাহাড়ি মানুষের তেমন সংযোগ নেই। যাঁরা সেগুলিতে বিনিয়োগ করেছেন, তাঁরা কলকাতা বা আশেপাশের লোক। হাতে অঢেল পয়সা। ব্যাঙ্কে রাখা যাবে না। পাহাড়ের জমি লিজ নিয়ে সেখানে একটা হোটেল বানিয়ে দাও। পর্যটনের সঙ্গে বা পাহাড়ি সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁদের কোনও যোগসূত্রই নেই। তাঁরা সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢালাও প্রচার করছেন। অনেকে বুঝে হোক না বুঝে হোক, চলেও যাচ্ছেন। পর্যটকদের মনোরঞ্জনের জন্য কোথাও ডিজে বাজছে। কোথাও সুইমিং পুলের ধারে উদ্দাম নৃত্য চলছে। কোথাও ঢালাও সুরাপানের আয়োজন। এছাড়াও এমন কিছু কর্মকাণ্ড চলছে, যা শালীনতার মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এমনকী খাদ্যতালিকায় পাহাড়ি খাবার নয়। বিরিয়ানি, মোগলাই ঢুকে পড়ছে।

মোদ্দা কথা, পাহাড়ের যে পরিবেশ, তা নষ্ট হচ্ছে। এই সব পর্যটকদের আচরণে স্থানীয় মানুষেরা বেশ বিরক্তই হচ্ছেন। স্থানীয় পাহাড়ি মানুষদের সেখানে কেয়ারটেকার বা রাঁধুনি রাখা হয়েছে। কলকাতার বিভিন্ন ট্যুর অপারেটররা লোক পাঠাচ্ছেন। তাঁরা সেখানে গিয়ে হুল্লোড় করছেন। কখনও শিলিগুড়িতে নেমে বাসভর্তি পর্যটক ডিজে বাজিয়ে পৌঁছে যাচ্ছেন সেইসব গ্রামে। এমনকী পাহাড়ি খাবারের বদলে বিরিয়ানি, মোগলাই, কাবাব— এসব মেনুতে ঢুকে পড়ছে।

গত কয়েক বছরে বিভিন্ন গ্রামেই এমন ছবি দেখা যাচ্ছে। এতে সেইসব গ্রামের নির্জনতা, স্নিগ্ধতা নষ্ট হচ্ছে। পাহাড়ের নিজস্বতাই হারিয়ে যাচ্ছে। নতুন পর্যটন মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ একজন শিক্ষিত ও উদ্যমী মানুষ। পাহাড়ের পর্যটনকে আরও সুন্দর করে তুলতে নিশ্চয় তিনি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন। হোম স্টের নামে শহুরে পর্যটন ব্যবসায়ীরা যে বেলেল্লাপনার আয়োজন করেছেন, আশা করি তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে তিনি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। পাহাড়ি গ্রাম পাহাড়ি মানুষের হাতেই থাকুক। তাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়ে, প্রয়োজনে সরকারি অনুদান বা ঋণ দিয়ে হোম স্টে কে আরও আকর্ষণীয় করা হোক। কিন্তু শহুরে ট্যুর অপারেটর ও হোটেল মালিকদের প্রবেশ সেখানে বন্ধ হোক।

Previous post কুণাল ঘোষ আর কতটুকুই বা ‘‌কলঙ্কিত’‌ করলেন!‌
Next post ই–‌ম্যাগাজিন। উত্তম কুমার বিশেষ সংখ্যা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *