মানস মাইতি
রাশিয়ায় বিশ্বকাপের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। এই বাংলায় বসেও শোনা যাচ্ছে। টিভিতে, কাগজে, সোশাল মিডিয়ায়, চায়ের আড্ডায় শুরু হয়ে গিয়েছে বিশ্বকাপের জোরদার আলোচনা।
আমরা নাইবা খেললাম। কিন্তু আমাদের জীবনের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে বিশ্বকাপ। সেই স্মৃতিগুলোকেই যেন উস্কে দিচ্ছে বেঙ্গল টাইমস। মনে হল, আমার জীবনের একটা ছোট্ট ঘটনা বলা যাক। শুধু আমার নয়, এটা হয়ত অনেকের জীবনেই ঘটেছে।
আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা মেদিনীপুর জেলায়। শহর বা আধা শহর নয়। একেবারেই গ্রামে। তখনও গ্রামে বিদ্যুৎ আসেনি। কিন্তু কয়েকটা বাড়িতে টিভি এসে গিয়েছিল। ব্যাটারিতেই টিভি চলত। এগরা থেকে চার্জ দিয়ে আনা হত। সেই চার্জেই বেশ কয়েকদিন চলে যেত।

নব্বইয়ের বিশ্বকাপ। আমার তখন ক্লাস ইলেভেন। স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের মুখে মারাদোনা, গুলিট, বাস্তেন, কারেকাদের কথা শুনছি। মনে হল, ইস, আমাদের বাড়িতেও যদি টিভি থাকত! কিন্তু বাবাকে বললে রাজি হবে না, সেটাও জানতাম। বলত, আগে উচ্চ মাধ্যমিক দে, তারপর দেখা যাবে।
তাহলে উপায়? বাবার বন্ধু ছিল সমীর কাকু। মাঝে মাঝেই আমাদের সঙ্গে গল্প করত। লেখাপড়ার খোঁজখবর নিত। খেলার কথাও আলোচনা করত। মনে হল, সমীর কাকুকে বলা যাক। সমীরকাকু হয়ত বাবাকে বুঝিয়ে বলতে পারবে। তাই হল। সমীর কাকুকেই সবটা বুঝিয়ে বললাম। বললাম, আবার চার বছর পর বিশ্বকাপ। তখন কি আর মারাদোনা থাকবে? তাছাড়া, বিশ্বকাপ তো রাতে। পড়তে পড়তেও তো দেখা যায়।
সমীরকাকু বাবাকে বুঝিয়ে বলার দায়িত্ব নিল। বাবা প্রথমে একটু চিৎকার–চেঁচামেচি করেছিল। কিন্তু পরে রাজি হয়ে গেল। তবে একেবারে শুরু থেকে দেখতে পাইনি। যতদূর মনে আছে, বিশ্বকাপ শুরুর ৬–৭ দিন পর বাড়িতে টিভি এসেছিল। সঙ্গে ব্যাটারি। বাবা নিজে ছোটবেলায় ফুটবল খেলেছে। তাই একটা দুর্বলতা তারও ছিল। শুধু আমার পড়াশোনার কথা ভেবেই রাজি হচ্ছিল না। টিভি এল। বাবার ফুটবল প্রেম যেন নতুন করে জেগে উঠল। রাত জেগে খেলা দেখতে লাগলাম। সমীর কাকু আসত খেলা দেখতে। পাড়ার আরও অনেকে আসত। বেশিরভাগই আর্জেন্টিনার সাপোর্টার। বুরুচাগা বা ক্যানিজিয়ার নাম জানলেও মূলত মারাদোনার কারণেই সবাই আর্জেন্টিনা। একটা মানুষ কীভাবে অন্যদের প্রভাবিত করতে পারে!

ফাইনালে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। মনে আছে, চিতুকাকু হাউ হাউ করে কেঁদেছিল আর্জেন্টিনা হেরে যাওয়ায়। এত রাতেও মা বড়দের জন্য চা করে দিত। আর আমাদের জন্য থাকত চানাচুর। দূর থেকে মা–কাকিমাও দেখত। হয়ত কিছুই বুঝত না, কিন্তু দেখত। সবমিলিয়ে খুব আনন্দই হত। একটা পিকনিক পিকনিক ব্যাপার। কীভাবে যে রাতগুলো পেরিয়ে যেত!
আলো নেই, রাস্তা নেই। এত নেই–এর মাঝেও কত আনন্দে কেটেছিল রাতগুলো। আমরা সবাই তখন হয়ে উঠেছিলাম বিশ্ব নাগরিক। পরের বিশ্বকাপ চুরানব্বইয়ে। ততদিনে গ্রামে ইলেকট্রিক চলে এসেছে। প্রায় সব বাড়িতেই টিভিও এসে গেছে। তখন আর একসঙ্গে খেলা দেখার রোমাঞ্চটা রইল না। তারপর টিভিটাও বদলে গেল। ছোটর বদলে বড়, সাদা–কালোর বদলে রঙিন। কিন্তু জীবন থেকে রঙগুলো কেমন যেন হারিয়ে গেল।
তাই বিশ্বকাপ বললেই আমার কাছে ভেসে ওঠে সেই নব্বই সাল। ভেসে ওঠে আমাদের নতুন কেনা সেই ছোট্ট টিভিটা। ভেসে ওঠে ওই সুন্দর রাতগুলো।
