স্নেহা সেন
শুরুতে নাম ছিল নেগেটিভ। কিন্তু নাম বদলে হয়ে গেল ছবিওয়ালা। একটা ছোট্ট বদল আসলে অনেককিছুই বদলে দিল।
কিছু ছবি শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও পর্দা থেকে নামতে চায় না। ‘ছবিওয়ালা’ তেমনই একটি ছবি। তার একটা কারণ অবশ্যই রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু শুধু রাহুলের শেষ ছবি বলেই ছবিটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। একজন শিল্পীর স্বীকৃতির লড়াই, সংসারের টানাপড়েন এবং নিজের প্রতিভাকে প্রমাণ করার মরিয়া চেষ্টা—এই কয়েকটি সরল উপাদান মিলিয়ে ছবিটি তৈরি করেছে এক অদ্ভুত বিষণ্ণ আবহ।
ছবির কেন্দ্রে বিশ্বকর্মা। পেশায় চিত্রগ্রাহক। ছবি তোলেন, কিন্তু তাঁর ছবির নান্দনিকতা কেউ বুঝতে চায় না। বড় কাজ জোটে না। শেষ পর্যন্ত মৃত মানুষের ছবি তোলাই তাঁর জীবিকার প্রধান অবলম্বন হয়ে ওঠে। অন্য দিকে স্ত্রী মালা সংসারের অভাব সামলাতে কারখানায় কাজ করেন। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসা আছে, কিন্তু অভাব এবং বিশ্বকর্মার নিজের শিল্পীসত্তাকে প্রতিষ্ঠা করার জেদ সেই সম্পর্ককে ক্রমশ কঠিন করে তোলে।
এখান থেকেই গল্পটি অন্য দিকে মোড় নেয়। বিশ্বকর্মার মনে হয়, ভাল ছবি তুলতে গেলে তাকে এমন কোনও মুহূর্ত ধরতে হবে, যা সাধারণ চোখে ধরা পড়ে না। সেই খোঁজ তাকে নিয়ে যায় অন্ধকার এক জগতের দিকে। মৃত্যুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ক্রমশ গভীর হতে থাকে। শিল্পের সন্ধান কখন যে আত্মধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, বিশ্বকর্মা নিজেও বুঝতে পারেন না। এই জায়গাতেই ছবির কাহিনিতে থ্রিলারের উপাদান ঢুকে পড়ে, যদিও ‘ছবিওয়ালা’ শেষ পর্যন্ত কোনও সরল থ্রিলার নয়।
গল্প ও চিত্রনাট্য লিখেছেন শান্তনু নাথ। চিত্রনাট্যের সবচেয়ে বড় সাফল্য, একটি অস্বাভাবিক ভাবনাকে মানবিক সম্পর্কের ভিতর ধরে রাখা। বিশ্বকর্মার শিল্পীসত্তা এবং মালার সংসারী বাস্তবতার সংঘাত ছবিটিকে শুধু ‘একজন শিল্পীর গল্প’ হয়ে থাকতে দেয় না। তবে কোথাও কোথাও গল্পের গতি একটু ধীর, কিছু অংশ আরও সংক্ষিপ্ত হলে ছবির টান বাড়তে পারত। তবু ছবিটি যে প্রশ্নটি তোলে—শিল্পীর স্বীকৃতি না পাওয়ার যন্ত্রণা কত দূর পর্যন্ত একজন মানুষকে ঠেলে দিতে পারে—সেটি মনে থেকে যায়।
আর রাহুল? এখানে আবেগকে সরিয়ে রেখে তাঁকে দেখা কঠিন। বড় প্রিয় এক চরিত্র। তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত ‘সহজ কথা’ বাঙালির অনেক জটিলতাকে ঢেকে দিয়েছিল সারল্যের চাদরে। পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে বড্ড তাড়াতাড়িই যেন চলে গেলেন। কিন্তু শিল্পীর মাহাত্ম্য এখানেই, শিল্পী হারিয়ে গেলেও শিল্প থেকে যায়। রাহুলের এই কাজটাও থেকে যাবে। বিশ্বকর্মার চরিত্রটি যেন তাঁর জন্যই তৈরি। একদিকে জেদ, অন্য দিকে অসহায়তা। বাইরে থেকে খানিক অগোছালো, ভিতরে প্রবল সংবেদনশীল। রাহুল খুব বেশি অভিনয় করেননি; বরং চরিত্রটির একাকিত্বকে নিজের মধ্যে ধরে রেখেছেন। চোখের দৃষ্টি, চুপ করে থাকা, স্ত্রীর সঙ্গে ছোট ছোট মুহূর্ত—এই জায়গাগুলিতে তাঁর অভিনয় বেশি মনে থাকে।
সবচেয়ে অদ্ভুত সমাপতন, পর্দায় তিনি এমন এক শিল্পীর চরিত্রে, যিনি স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য লড়ছেন। বাস্তবেও রাহুল চলে গেলেন কাজের মধ্যেই। তাই ‘ছবিওয়ালা’ দেখতে বসলে কোথাও কোথাও চরিত্র আর অভিনেতার মধ্যে সীমারেখাটা অস্পষ্ট হয়ে যায়। দেবলীনা দত্তও মালার চরিত্রে বিশ্বাসযোগ্য। তাঁর অভিনয়ে সংসারের চাপ, ক্লান্তি এবং স্বামীর প্রতি টান—সবটাই সহজ ভাবে এসেছে। রাহুল–দেবলীনার সম্পর্কের দৃশ্যগুলিই ছবির আবেগের মূল জায়গা।
চিত্রনাট্যের কিছু জায়গায় আরও মসৃণতা দরকার ছিল। কিন্তু ছবিটির আন্তরিকতা অস্বীকার করা যায় না। আর শেষ দৃশ্যের পর যখন আলো জ্বলে ওঠে, তখন মনে হয়—আমরা শুধু বিশ্বকর্মাকে দেখলাম না, রাহুলকেও যেন আরও একবার দেখলাম। রাহুল নেই। কিন্তু ছবিওয়ালা রয়ে গেল। পর্দায়, স্মৃতিতে।
