অজয় কুমার
এমন ভোট শেষ কবে দেখেছেন? কেউ কেউ স্মৃতি হাতড়ে ২০১১ সালের কথা বলবেন। কিন্তু তারপর থেকে, অর্থাৎ গত ১৫ বছরে এমন ভোট সত্যিই দেখা যায়নি। বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্ত কিছু অশান্তি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই রাজ্যের মানুষ ভোট বলতে যে হিংসা ও সন্ত্রাসের সঙ্গে পরিচিত, তার সঙ্গে এবারের ছবি অনেকটাই আলাদা। এত বড় রাজ্য, এতগুলো জেলা, এত হাজার হাজার বুথ, তার ওপর গত কয়েক বছরের ভোট লুঠের ট্র্যাডিশন। ফলে বিক্ষিপ্ত হিংসা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু যে অশান্তি ও হিংসার আশঙ্কা ছিল, তাকে অমূলক প্রমাণ করতে পেরেছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। এর জন্য তাঁদের কুর্নিশ।
ধন্যবাদ দিতে হবে নির্বাচন কমিশনকেও। অন্তত পশ্চিমবঙ্গে অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁরা অত্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। উৎসবের মেজাজে হয়তো ভোট হয়নি, চারিদিকে একটা থমথমে আবহ হয়তো ছিল। হয়তো পরিস্থিতির সাপেক্ষে সেটা দরকারও ছিল। নির্বাচনে হিংসা ও অশান্তি হলে তার সমালোচনা যেমন নির্বাচন কমিশনের প্রাপ্য, তেমনই শান্তিপূর্ণ ভোট হলে তার কৃতিত্ব থেকে তাদের বঞ্চিত করা উচিত নয়।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ নিজের ভোট নিজে দিতে পেরেছেন। বিভিন্ন এলাকায় এমন কত মানুষ আছেন যাঁরা গত ১৫ বছরে নিজের ভোটটা নিজে দিতেই পারেননি। এই অনিবার্য পরিণতি তাঁদের মেনে নিতে হয়েছিল। এবার অন্তত নির্বাচন কমিশন এমন একটা পরিমণ্ডল তৈরি করতে পেরেছে, যে কারণে এই মানুষগুলো ভোটের লাইনে দাঁড়াতে সাহস পেয়েছেন। দূরদূরান্ত থেকে অনেকে এসেছেন নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে। ভোটদানের শতাংশ যেমন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে ভোটের সংখ্যাও। দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা ভোট বানচাল করে আসছিলেন, তাঁদের শুরুতেই দেওয়া হয়েছে কড়া বার্তা। ফলে ভোটের দিন সেই বীরপুরুষদের তেমন সক্রিয় হতে দেখা যায়নি। তারপরও যাঁরা পুরনো প্রতিভা মেলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন, তাঁরাও দ্রুত বুঝেছেন, এবার তেমন সুবিধে করা যাবে না। ফলে রণে ভঙ্গ দেওয়া ছাড়া তাঁদের সামনেও কিছু করার ছিল না। এই কারণেও নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাতে হবে।
অথচ, এস আই আর পর্বে এই নির্বাচন কমিশনকে মোটেই সফল বলা যাবে না। অনেক নাম বাদ পড়েছে ঠিকই। যাঁরা মৃত, যাঁরা স্থানান্তরিত, যাঁদের একাধিক জায়গায় নাম, এই নামগুলো বাদ পড়বে, সেটা স্বাভাবিক। এবং এইসব নাম বাদ দেওয়ার কাজটা খুব একটা কঠিনও ছিল না। একটা রুটিন সরকারি পদ্ধতি মেনে চললেই মসৃণভাবে এই কাজটা সম্পন্ন করা যেত। কিন্তু একদিকে বিজেপির হুংকার, সেই হুঙ্কারে মিশে আছে সাম্প্রদায়িক ইন্ধন, অন্যদিকে শাসকদলের অহেতুক জটিলতা তৈরি করার চেষ্টা। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা জটিল হয়ে গিয়েছিল। এই জটিলতাকে কাটাতে যে বিচক্ষণতা ও প্রশাসনিক দূরদর্শিতা দরকার ছিল, নির্বাচন কমিশন তা দেখাতে পারেনি।
এই পর্বের পর ছিল অ্যাড জুডিকেশন। এই পর্বেও নির্বাচন কমিশন সীমাহীন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের একের পর এক বিভ্রান্তিকর পদক্ষেপের জন্যই জল বারবার গড়িয়েছে আদালতে। আদালতকেও হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। এতেও জটিলতা বেড়েছে। প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার লিস্টের বাইরেই থেকে গেল। এঁদের অধিকাংশই বৈধ ভোটার। কিন্তু তারপরও তাঁরা ভোটদান থেকে বঞ্চিত হলেন। একদিকে এই বৈধ নাগরিকদের প্রতি চরম বঞ্চনা, অন্যদিকে এই বিরাট সংখ্যক মানুষ ভোট গ্রহণে অংশ নিতে না পারায় অনেক কেন্দ্রেই ফলাফল প্রভাবিত হবে। নির্বাচন কমিশন আগে সতর্ক থাকলে এমন পরিস্থিতি এড়ানো যেত। রাজ্যের শাসক ও বিরোধী দল বিভ্রান্তি ছড়ানোর বদলে আরও একটু দায়িত্বশীল হলে হয়তো এত মানুষকে ভোট দানের অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকতে হত না। এই দায় যতটা নির্বাচন কমিশনের, ততটাই শাসক ও বিরোধীর।
অতীতে নানা ব্যর্থতায় নির্বাচন কমিশনের অনেক সমালোচনা হয়েছে। সেই সমালোচনা তাঁদের প্রাপ্যও ছিল। কিন্তু তারপরও ভোট গ্রহণের পর মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করতেই হবে, এই রাউন্ডে তাঁরা যথেষ্ট সফল। শেষ বেলায় এসে অন্তত এই ধন্যবাদটুকু তাঁদের প্রাপ্য।
