স্নেহা সেন
বাঙালির জীবনে একটা ফেলুদা ছিল। বাঙালির জীবনে একটা ব্যোমকেশও ছিল। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ বা শরৎচন্দ্ররা হয়তো কোনও ডিটেকটিভ চরিত্র তৈরি করেননি। এমনকি পরবর্তী প্রজন্মের তিন বন্দোপাধ্যায় অর্থাৎ বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, মানিকরাও গোয়েন্দাদের দিকে সেভাবে হাত বাড়াননি।
কিন্তু তারপর থেকে অধিকাংশ সাহিত্যিকই কোনও না কোনও গোয়েন্দা চরিত্র তৈরি করেছেন। কেউ ফেলুদা, কেউ কাকাবাবু, কেউ ব্যোমকেশ, কেউ কিরীটী রায়, কেউ শবর, কেউ মিতিন মাসি। এই তালিকায় গোগোল বা অর্জুনকেও অনায়াসেই রাখা যায়। সেইসব সাহিত্য থেকে পরবর্তীকালে ছবিও হয়েছে।
কিন্তু একেন বাবু একেবারেই অন্য ঘরানার গোয়েন্দা। বাঙালি আগে তাকে পর্দায় দেখেছে, পরে সাহিত্যে পড়েছে। যাঁরা পর্দায় দেখেছেন, তাঁদের শতকরা এক শতাংশ টেকেনবাবু সংক্রান্ত উপন্যাস পড়েছেন কিনা সন্দেহ। বা তার স্রষ্টার নাম জানেন কিনা সন্দেহ।
একেন্দ্র সেন কলকাতা পুলিশের এক গোয়েন্দা। কিন্তু দেখতে শুনতে হাগাগোবা। অনেকটা জটায়ু স্টাইলে। মনে হয় রহস্যের কিনারা তো দূরের কথা, তিনি নির্ঘাত ছড়িয়ে লাট করবেন। সারাক্ষণ খাই খাই। আর ভুলভাল প্রবাদ আউড়ে যাওয়া। কিন্তু শেষ বেলায় এসে দেখা যায় আপাত বোকামির আড়ালে ক্ষুরধার বুদ্ধির মালিক। তাঁর গল্পের অনুষঙ্গ হিসেবে যেমন খাওয়া-দাওয়ার কথা আসে, তেমনই আসে বেড়ানোর কথা। তার দুই সঙ্গী বাপি বাবু এবং প্রমথ বাবু। প্রথমে এই দুজনকে অনেক বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ মনে হয়। কিন্তু যত সময় গড়ায়, দেখা যায় তাঁদের টেক্কা দিয়ে একেন বাবু পৌঁছে গেছেন সমাধানের এন্ডিং মার্কে।
কখনও তিনি শান্তিনিকেতনে, কখনও রাজস্থানে, কখনও দার্জিলিঙে। এবার তিনি পাড়ি দিয়েছেন পুরুলিয়ায়। নিছকই বেড়াতে যাওয়া। কিন্তু ঢেঁকির যা কপাল। স্বর্গে গেলেও ধান ভানার অ্যাসাইনমেন্ট ঠিক জুটে যায়। এক্ষেত্রেও তাই। তিনি হাজির পুরুলিয়ার এক আশ্রমে। সেখানেই ঘটে গেল চুরির ঘটনা। ব্যস, অমনি হাত গুটিয়ে নেমে পড়লেন একেন বাবু। গোয়েন্দা গল্পের একটা চেনা ফর্মুলা আছে। যেখানেই তিনি যান, পুলিশ কর্তারা তাঁকে ঠিক চিনে ফেলেন। তখন পুলিশের কাজ হয়ে দাঁড়ায় গোয়েন্দার ফাই ফরমাস খাটা। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ঠিক এক ব্যাচমেট জুটে গেছে। একেন বাবুর যা যা ফাই ফরমাস, ইনি তার জোগান দিচ্ছেন। চুরি থেকে খুন। রহস্যের জট যথারীতি আরও বাড়ছে। বাড়তে বাড়তে সন্দেহের তীর ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক।
এক্ষেত্রে বাড়তি আকর্ষণ এক ক্ষুদে গোয়েন্দা। যেমন ডেপো, তেমনি বুদ্ধিমান। কিছুটা জয় বাবা ফেলুনাথের আদল পাওয়া যাবে। একেন বাবু সিরিজের একটা বাড়তি পাওনা হল কমিক রিলিফ। যা এই সিরিজেও আছে। এবং সেই হাস্যরসকে কখনই তেমন ভাঁড়ামিও মনে হয় না। একেন বাবুর চরিত্রের সঙ্গে দিব্যি মানিয়ে যায়।
পুরুলিয়ায় গেলে একবার অযোধ্যা না গেলে হয়! পাশাপাশি পুরুলিয়ার নিজস্ব একটা ভাষা ও সংস্কৃতি আছে। কলকাতার বাবুরা, বাঁকুড়া বা পুরুলিয়ায় গেলে সেই এলাকার ভাষা চিত্রনাট্যে আনতে গিয়ে ব্যাপক বিকৃতির আমদানি করেন। এক্ষেত্রেও তার ব্যাতিক্রম ঘটেনি। কলকাতার লোক জোর করে পুরুলিয়ার ভাষা বললে বড্ড বেশি কানে লাগে। পরিচালক পুরুলিয়ার পটভূমি বোঝাতে গিয়ে এত জটিল না করলেও পারতেন।
সহজ সরল গোয়েন্দা গল্পকে অকারণ জটিল বানাতে গিয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর হারিয়ে যাচ্ছে। চিত্রনাট্যে অনেক স্তর ও অনেক বাঁক আনতে গিয়ে মাঝে মাঝেই তা খেই হারাচ্ছে। সিনেমা হলে তবু দু’ঘণ্টার মধ্যে শেষ করার একটা তাড়া থাকে। ওয়েব সিরিজের ক্ষেত্রে সেই দায় নেই। ফলে জোর করে কিছু চরিত্র তৈরি করা ও রাবারের মতো টেনে তাকে প্রায় সিরিয়াল বানানোর একটা চেষ্টা প্রায়শই দেখা যায় । যা গল্পের স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করে।
একেন বাবু একজন সহজ সরল মানুষ। তাঁর চরিত্রের সঙ্গে অহেতুক থ্রিলার বা অহেতুক জটিলতা, কোনওটাই ঠিক যায় না।
