বাপরে কি ডানপিটে ছেলে!‌

স্বরূপ গোস্বামী

‌কোন গোকুলে এই ছেলে বাড়ছিল, কে জানে!‌
বছর দেড়েক আগের কথা। ছেলেটির বয়স তখন সবে তের বছর। হঠাৎ করে এমন একজন আনকোরা ছেলের জন্য এক কোটি দশ লাখ টাকা হেঁকে বসল রাজস্থান রয়্যালস। মুম্বইয়ের ছেলে নয়। দিল্লি বা কলকাতার ছেলে নয়। এই ছেলের বাড়ি কিনা বিহারের সমস্তিপুরে।
হাতে অঢেল টাকা থাকলে কতভাবেই না অপচয় করা যায়!‌ যাঁরা আইপিএলের গতিবিধি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তাঁদের এমনটা মনে হওয়াই স্বাভাবিক। ভস্মে ঘি ঢালার এমন কত উদাহরণ রয়েছে এই ফ্র‌্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের দুনিয়ায়।
কিন্তু এই দলের সঙ্গে তো জড়িয়েছিলেন রাহুল দ্রাবিড়!‌ ধুর, কে রাহুল দ্রাবিড়। ফ্র‌্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে মালিকরা যা চাইবেন, তাই হবে। তাঁরা যাকে খুশি রাখবেন, যাঁকে খুশি ছেঁটে ফেলবেন। কোচের কথার মূল্য কতটুকু‌!‌ কোচের পরামর্শকে কে পাত্তা দেয়!‌
কিন্তু আসল ঘটনা একটু অন্যরকম। তের বছরের এই কিশোরকে নেওয়ার পরামর্শটা নাকি একদা ‘‌মিস্টার ডিপেন্ডেবল’‌ নামে পরিচিত রাহুল দ্রাবিড়েরই। নিলামে যত দরই উঠুক, রাজস্থান রয়্যালস যে এই ছেলেটির জন্য অলআউট ঝাঁপাবে, এটা নাকি রাহুল দ্রাবিড়ই পইপই করে বলে দিয়েছিলেন।
ছেলেটি কে, এটা বোঝাতে দেড় বছর পর আর কোনও ক্লু দেওয়ার দরকার নেই। বৈভব সূর্যবংশী নামটার সঙ্গে আসমুদ্র হিমাচল আজ পরিচিত। শুধু ভারত কেন, তামাম ক্রিকেট বিশ্বেই ছড়িয়ে গেছে নামটা। জিওফ্রে বয়কট থেকে ভিভ রিচার্ডস, ইয়ান বথাম থেকে অ্যালান বর্ডার। এই ছেলের তাণ্ডবের সঙ্গে সবাই অল্পবিস্তর পরিচিত। কেউ উচ্ছ্বসিত, কেউ আশাবাদী, কেউ আরও একটু দেখে নিতে চান, কেউ আবার ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়ী।
সময়টা ১৯৮৯। ক্রিকেটবিশ্বে এভাবেই আবির্ভাব ঘটেছিল ১৬ বছরের এক বিস্ময় বালকের। ইমরান খান, ওয়াসিম আক্রাম, আব্দুল কাদিরদের সামলাতে পাকিস্তানগামী বিমানে তুলে দেওয়া হয়েছিল শচীন তেন্ডুলকার নামের এক কিশোরকে। সেই ষোল বছরেই কী অবলীলায় ইমরান বা আক্রামকে পুল মেরে বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে দিচ্ছিলেন। আব্দুল কাদিরকে স্টেপ আউট করে পরপর তিন বলে ছক্কা হাঁকাচ্ছিলেন। ওয়াকার ইউনিসের বাউন্সারে মুখ রক্তাক্ত হওয়ার পরেও কী অসীম সাহসে বুক চিতিয়ে ব্যাট করছিলেন। ক্রিকেট বিশ্ব মুগ্ধ না হয়ে পারে!‌ সেই ছোট্ট চারাগাছ ২৪ বছরের ক্রিকেটজীবনে কী প্রকাণ্ড এক মহীরুহ হয়ে উঠেছিলেন, ক্রিকেট দুনিয়া জানে।
বিহারের একেবারে প্রান্তিক এলাকা থেকে উঠে আসা এক কিশোর যদি হঠাৎ করে কোটিপতি হয়ে যায়, মাথা ঘুরে যাওয়ারই কথা। এক কোটি লিখতে গেলে একের পিছনে কটা শূন্য বসাতে হয়, সেটাও এই কিশোর ঠিকঠাক জানে না। দরকার ছিল আগলে রাখা, সামলে রাখা। আড়াল থেকে সেই কঠিন কাজটাই সেদিন করেছিলেন রাহুল দ্রাবিড়। জানতেন, শুরু থেকেই তাকে নামিয়ে দিলে বিপদ হতে পারে। কয়েকটা ম্যাচে ব্যর্থ হলে মনোবল ভেঙে যেতে পারে, ক্রিকেটজীবনই শেষ হয়ে যেতে পারে। তাই এই মোক্ষম অস্ত্রটায় গোপনে শান দিয়ে গেছেন। দলের পরিবেশের সঙ্গে, সাজঘরের সঙ্গে, ভরে ওঠা গ্যালারির সঙ্গে, গ্ল্যামারের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সময় দিয়েছেন। নামালেন আইপিএলের একেবারে বিদায়বেলায়। প্রথম ম্যাচে সামনে লখনউ। কী আচর্য। প্রথম বলেই কিনা ছেলে ছক্কা হাঁকিয়ে বসল!‌ দিনটা ছিল ১৯ এপ্রিল। এই তারিখের কথা উঠে এলে ঋতুপর্ণ ঘোষের সেই জাতীয় পুরস্কার পাওয়া ছবিটার কথা মনে পড়ে। কিন্তু এই দিনটা একইসঙ্গে আইপিএলের দুনিয়ায় বৈভবের পথ চলার দিন।
একটা বিস্ময় যেন আরেকটা বিস্ময়কে ছাপিয়ে যায়। আসল চমকটা তোলা ছিল ২৮ এপ্রিলের জন্য। সেদিন ১৪ বছরের কিশোরের ব্যাটে সত্যিই তাণ্ডব দেখেছিল ক্রিকেট বিশ্ব। ছেলে কিনা সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে বসল!‌ যেমন তেমন সেঞ্চুরি নয়, একলহমায় একের পর এক রেকর্ড ভেঙে দেওয়া সেঞ্চুরি। ১)‌ আইপিএলের ইতিহাসে সবথেকে কম বয়সে সেঞ্চুরি, ২)‌ ভারতীয় হিসেবে দ্রুততম সেঞ্চুরি (‌মাত্র ৩৫ বলে)‌, ৩)‌ একটি ইনিংসে ভারতীয় হিসেবে সবথেকে বেশি ছক্কা (‌১১টি)‌। আরও কত খুচরো রেকর্ড যে সেদিন হয়েছিল, তার হিসেব করা মুশকিল।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, বৈভব কি তার আগে কিছুই করেনি!‌ তার আগেই তার রনজি ট্রফিতে অভিষেক হয়ে গেছে। এমনকী ভারতের অনূর্ধ্ব দলেও খেলে ফেলেছে। কিন্তু এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই, এই বিস্ময় বালককে আসমুদ্র হিমাচল চিনল আইপিএলের সুবাদেই। গতবারের আইপিএলে যে স্বপ্নের উড়ানের শুরু, তা চষে বেড়াচ্ছে বিশ্ব ক্রিকেটের মহাকাশে। অনূর্ধ্ব ১৯ দলের হয়ে তিন ঘরানাতেই নিজের দাপট দেখিয়েছে। যখন যে দেশে গেছে, সেই দেশের মিডিয়া আকূল হয়েছে তাকে ঘিরে। একবছর আগে থেকেই দাবি উঠে গেছে, বৈভবকে জাতীয় দলের আঙিনায় এবার আনা হোক। কিন্তু আইসিসির নিয়মে পনের বছর বয়স না হলে সিনিয়র আন্তর্জাতিক দলে নেওয়া যায় না। এবার আইপিএল শুরুর ঠিক আগেই সেই পনেরোর গন্ডি পেরিয়ে গেল সমস্তিপুরের এই কিশোর। তার ভারতীয় দলে নির্বাচন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
কিন্তু এবারের আইপিএলেও সেই ঝড় দেখা যাবে তো!‌ নাছোড়বান্দা প্রত্যাশা যেমন ছিল, তেমনই সংশয়ের চোরাস্রোতও ছিল। প্রথম চার ম্যাচেই তার রান দুশো। এর মধ্যে যশপ্রীত বুমরার প্রথম বলে ছক্কাও আছে। এক বল যেতে না যেতেই ফের ছক্কা। যে বুমরাকে টুপি খুলে কুর্নিশ জানায় ক্রিকেট বিশ্ব, তাঁর বোলিংয়ে এমন বেপরোয়া ছক্কা!‌ মনে পড়ে যায় সুকুমার রায়ের সেই বিখ্যাত ছড়া, ‘‌বাপরে কি ডানপিটে ছেলে!‌’‌
ঠিক তিনদিন পরেই গুয়াহাটিতে বেঙ্গালুরু বনাম রাজস্থানের লড়াই। মিডিয়া সবসময় বাইনারি খোঁজে। এর সঙ্গে ওকে লড়িয়ে দিতে পারলেই যত আনন্দ!‌ বেঙ্গালুরু বনাম রাজস্থান ম্যাচ মিডিয়ার ভাষায় হয়ে উঠল বিরাট কোহলি বনাম বৈভব সূর্যবংশীর ম্যাচ। একদিকে বিরাট কোহলি ১৯ বছর ধরে আইপিএলে খেলছেন। আর এদিকে বৈভবের বয়সই সবে ১৫। কোনও তুলনা হয়!‌ বিরাট বা বৈভব, দুজনের কাছেই এই তুলনা নিশ্চিতভাবেই বিড়ম্বনার। কিন্তু শুনছেটা কে?‌ মশলা চাই। মশলা ক্রিকেটে আরও বেশি করে মশলা চাই। সেদিন বেঙ্গালুরুকে কার্যত তুড়ি মেরেই উড়িয়ে দিল রাজস্থান। সৌজন্যে সেই বৈভব। বিরাটের ব্যাট থেকে এসেছিল ৩২। সেখানে বৈভবের ব্যাটে মাত্র ২৬ বলে ৭৮। বিরাট যখন ছক্কাহীন, তখন বৈভবের ব্যাটে সাত ছক্কা। পনেরোর ঝড়ের কাছে সেদিন সত্যিই যেন ম্লান মনে হয়েছিল মহাতারকা বিরাটকেও।
গাভাসকারের ব্যাটন উঠে এসেছিল শচীনের হাতে। শচীনের ব্যাটন এসেছিল বিরাটের হাতে। কে বলতে পারে, সেদিন গুয়াহাটিতে বিরাটের ব্যাটনও হয়তো উঠে এসেছিল বৈভবের হাতে।‌

Previous post আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম
Next post এই সমাজকে আমরা কতটুকুই বা চিনি!‌

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *