অন্তরা চৌধুরি
বছর কয়েক আগে এমনই এক শীতের দিনে গিয়েছিলাম রাজাভাতখাওয়া। শান্ত, নির্জন, নিশ্চুপ গাছগাছালিতে ভরা ডুয়ার্সের এক অন্যতম ছোট্ট জনপদ। ছায়ায়-মায়ায় ঘেরা এই জায়গাটার এমনই মাহাত্ম্য, যে একবার যায় তার মনের গহীনে অরণ্য স্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করে। চারিদিকে বিশাল বিশাল গাছের জঙ্গল। সেই সব বড় গাছের গায়ে পরজীবী জড়িয়ে তার ঝুরি নেমে এসেছে একদম নীচ পর্যন্ত। সারা জঙ্গল আলো করে ফুটে রয়েছে নাম না জানা অসংখ্য সাদা সাদা ফুল। রাস্তাঘাটে জনাকয়েক লোক। চারিদিকে অফুরন্ত সবুজ। একটা তিতির এক মনে ডেকে চলেছে। ছবির মতো সাজানো সুন্দর ছোট্ট এক রেলস্টেশন। যেন বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে আছে। সারা দিনে হাতে গোনা ক’টা মাত্র ট্রেন যায়। লোকজন কম। ব্যস্ততা আরও কম।
শীতের পড়ন্ত রোদ গায়ে মেখে দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর বেরিয়ে পড়েছিলাম জঙ্গল ঘুরতে। জঙ্গলের মাঝে মাঝে একটা দুটো করে স্থানীয় মানুষজনের কাঠের বাড়ি। একঝলক দেখলে মনে হবে চেনা পৃথিবী থেকে অচেনা কোনও এক রূপকথার জগতে চলে এসেছি। পাশ দিয়ে ছোট্ট একটা ঝোরা বয়ে চলেছে। জঙ্গলের পথে ঘুরতে ঘুরতে চোখে পড়ল মলীন হয়ে যাওয়া একটা জীর্ণ একটা বাড়ি। কাছে গিয়ে দেখলাম বাড়ি নয়। ওটা আসলে রাজাভাতখাওয়া পোস্ট অফিস। সেদিন সন্ধে হয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পাহাড় বা জঙ্গলের এমন নির্জন পুরীতে সন্ধে থেকে তেমন কিছুই করার থাকে না। মনে মনে ভাবলাম আগামিকাল ওই পোস্টঅফিস থেকে বেশ কিছু পোস্টকার্ড আর ইংল্যান্ড লেটার কিনব। জেন-জি-র যুগে সকলেই এখন ফোন, হোয়াটসঅ্যাপে ব্যস্ত। চিঠি আর কজন লেখে? এই প্রজন্মের সেই ফুরসত কোথায়! অথচ তেমন সংবেদনশীল মানুষের কাছে চিঠির চেয়ে ভালো উপহার আর কিছুই হয় না।
রাত্রি বেলায় সামনের একটা ছোট্ট ঝুপড়ি হোটেলে আমরা খেতে যেতাম। সেই হোটেল যিনি চালাতেন তিনি নিপাট সহজ সরল এক মানুষ। পাহাড় জঙ্গলের অজানা গল্প শোনাতে তিনি বড় ভালবাসেন। কথায় কথায় পোস্ট অফিসের কথা উঠলে তিনি বললেন,
‘আপনারা কি জানেন যে ওই পোস্টঅফিসে এখনও রানার আছে?’
আমাদের খাওয়া থেমে গেল। অবাক সুরে বললাম, ‘রানার? মানে সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেই রানার? এই যুগে এখনও রানার আছে!’
আমাদের বিস্ময়ের ঘোর কাটে না। ওঁর কাছে জানা গেল, দুর্গম বক্সা পাহাড়ে চারটে গ্রাম আছে। সেখানে অনেক মানুষজন থাকেন। তাঁদের কাছে প্রয়োজনীয় চিঠিপত্র পৌঁছে দিতে ওই রানারই একমাত্র ভরসা। কারণ পায়ে হেঁটে যাওয়া ছাড়া ওই পাহাড়ে পৌঁছোনোর আর কোনও উপায় নেই। তাই রাজাভাতখাওয়া পোস্টঅফিসে এখনও রানার আছে। পরের দিন পোস্টঅফিস খোলার কিছুক্ষণ পরেই আমরা গেলাম। বেশ ফাঁকা পোস্টঅফিস। গুটিকয়েক লোকজন আপন মনে কাজকর্ম করে চলেছেন। ইতি উতি তাকিয়ে কাউন্টারে গিয়ে কিছু পোস্টকার্ড আর ইংল্যান্ড লেটার চাইতেই সেই ভদ্রলোক আমাদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চাউনি দেখে মনে হল চিঠি লেখার এই সব সামগ্রী চেয়ে ভয়ানক অপরাধ করে ফেলেছি। তারপর আমাকে একটু ইতস্তত করতে দেখে ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কিছু বলবেন?’ একটু সাহস পেয়ে ওঁকে চুপিচুপি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আচ্ছা আপনাদের এখানে নাকি এখনও রানার আছে?’
ভদ্রলোক খুব স্বাভাবিক ভাবে ঘাড় নেড়ে কোনের দিকে আঙুল দেখিয়ে এক ব্যক্তিকে দেখালেন। মানেটা হল- উনিই রানার। আর পাঁচজন সাধারণ পোস্টম্যানের মতোই এক কোনে উনি বসে বসে পেপার পড়ছেন। মনে পড়ে গেল কবি সুকান্তের সেই ‘রানার’ কবিতার কথা। ছোটবেলায় রানারের যে ছবিটা মনের মধ্যে আঁকা হয়ে গিয়েছিল তার সঙ্গে চোখের সামনে বাস্তবের রানারকে দেখে একটু ধাক্কা লাগলেও সামলে নিয়েছিলাম। কাছে গিয়ে আলাপ করতেই উনি খুব খুশি হলেন। বেশ বিনয়ী মানুষ। আমরা ওঁর অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে জানালেন যে, দুপুরে কয়েকটা চিঠি বিলি করার পর উনি ফাঁকা থাকবেন।
দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর জঙ্গলের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে কবি সুকান্ত বর্ণিত সেই রানারের কথা ভাবছিলাম। যখন কবিতাটা পড়েছিলাম তখন প্রতীকী তাৎপর্য বোঝার মতো বয়স হয়নি। তবুও কবিতাটা পড়তাম, আর নিজের মতো করে রানারের দুঃখকে উপলব্ধি করতাম। কেমন যেন হৃদয় নিংড়ানো একটা দলাপাকানো কান্না বুকের ভেতর জমাট হয়ে থাকত। কবিতাটা পড়তে পড়তে মনের মধ্যে রানারের ছবি আঁকা হয়ে গিয়েছিল। আমরা যে সময়ে বড় হয়েছি সেই সময় আমাদের জীবনটা প্রযুক্তি পরিচালিত ছিল না। ছিল মানুষ পরিচালিত। প্রিয়জনের খবরটুকু নিতে বা কাউকে প্রিয়জন বানাতে চিঠিই ছিল একমাত্র মাধ্যম। সেই সময় মানুষ বড় মূল্যবান ছিল। এখনকার মতো এত অবহেলার পাত্র মানুষ সে সময় ছিল না।
প্রেম-অপ্রেম, ভালবাসা, শুভ-অশুভ সমস্ত খবর, এবং মানুষজনের বহু কষ্টার্জিত উপার্জনের টাকা- সব কিছু থাকত রানারের পিঠের ঝোলায়। এক হাতে লাঠি আর তার প্রান্ত বাঁধা থাকত একটা লন্ঠন। সেই নিয়ে কত গ্রাম কত জনপদ পেরিয়ে রাত্রির বুক চিরে রানার ছুটে চলত একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত। রাত্রির নীরবতাকে ভেঙে খানখান করে দিত ঝুমঝুম করে বাজতে থাকা রানারের ঘণ্টা। ক্লান্তি, ঘুম, ভয় সমস্ত কিছুকে উপেক্ষা করে শুধু মাত্র জীবনের দাবির কাছে হার না মেনে রানার ছুটে চলে। ভোরের অপেক্ষা, আলো ফোটার অপেক্ষা আমরা করি। কিন্তু সেই ভোরই ছিল রানারের কাছে সব থেকে ভয়ের। কারণ আলো ফোটার আগেই সেই চিঠি ও টাকার বোঝা নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে যেতে হবে। আর ফেরার পথে নিয়ে আসতে হবে নতুন খবর।
দিনের পর দিন এভাবেই কেটে যায়। বাড়িতে তার প্রিয়জন রাতের পর রাত প্রতীক্ষার প্রহর গোনে, আর আশায় বুক বাঁধে যে রানারের জীবনে সেই দুর্গম অভিশপ্ত রাত হয়তো একদিন শেষ হয়ে যাবে। আর তার পরেই নতুন দিনের সূর্য উঠবে। রানারের ঘরে অভাবের কোনও অভাব ছিল না। পিঠে অঢেল টাকার বোঝা থাকা সত্ত্বেও সততা ছিল ষোলয়ানা। সামান্য কিছু অর্থের পরিবর্তে এমন হাড়ভাঙা পরিশ্রমকে জীবিকা হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল সেই রানার। জঙ্গলের পথে যেতে যেতে এসব কথাই আনমনে ভাবছিলাম।
আচ্ছা, এখন যিনি রানার রয়েছেন তাঁর জীবনও কি এমন দুর্বিষহ! এখন তো প্রযুক্তি কত উন্নত। নিশ্চয়ই আগের মতো অত কষ্ট এখনকার রানারকে করতে হয় না। সাধারণ পোস্টম্যানের সঙ্গে রানারের পার্থক্যটা ঠিক কোথায়? এসব নানারকম হাবিজাবি চিন্তা যখন মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে তখন দেখি সেই রানার আমাদের দিকে হনহন করে এগিয়ে আসছেন। বুঝলাম এখন তাঁর হাতে বেশ কিছুটা সময় আছে। আমরাও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গলের পথে হাঁটতে শুরু করলাম। আলাপী মানুষ। একটু একটু করে তাঁর জীবনের গল্পগুলো উঠে আসতে লাগল।
আমাদের মানস পটে তখন ভেসে উঠল সেই সুকান্তের সেই রানারের কথা। তাকে তো কখনও চোখে দেখিনি। শুধু কবিতা পড়তে পড়তে বা গান শুনতে শুনতে মনে মনে দৃশ্যকল্প রচনা করেছি। আজকের রানারকে হাতে লণ্ঠন নিয়ে জোনাকির দেওয়া আলোয় পথ চলতে হয় না ঠিকই, কিন্তু তার চলার পথটাও যে বেশ দুর্গম। পিঠে চিঠির বোঝা থাকলে তবু না হয় একটা রোমাঞ্চ থাকত। কিন্তু এই স্মার্ট ফোনের আবহে চিঠি লেখাও যেন এক লুপ্তপ্রায় শিল্প। সুখে, প্রেমে, আবেগে, স্মৃতিতে আজকাল আর কে চিঠি লেখে! কিন্তু তাই বলে তাঁর দুঃখের ভার লাঘব হল, এমনটা মোটেই নয়। নানা ঠিকানায় নানা সাইজের খাম ঠিক এসেই যায়। হতে পারে ইন্টারভিউয়ের চিঠি। হতে পারে ইলেকট্রিক বিল। হতে পারে সরকারি নিয়োগপত্র। কোনওটায় এটিএম কার্ড, কোনওটায় প্যানকার্ড। কোন খামের ভেতর কী আছে, তার পক্ষে জানাও সম্ভব নয়। আবার একদিন দেরিতে পৌঁছোলে বড়সড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
রাজাভাতখাওয়া থেকে সান্তালাবাড়ি পর্যন্ত তবু না হয় টুকটাক যানবাহন আছে। কিন্তু সান্তালাবাড়ি থেকে বক্সা, পুরো পথটাই হাঁটা পথ। বেশ খাড়া পাথরের উপর দিয়ে অনেক চড়াই উৎরাই পেরোতে হয়। এই বক্সা দুর্গের জেলেই একসময় বন্দি রাখা হত বিপ্লবীদের। প্রবল শীতের চোখরাঙানি যেমন আছে, তেমনি প্রকৃতি খামখেয়ালিপনায় ঝড় বৃষ্টিও আছে। আর একবার বৃষ্টি শুরু হলে মাথা গোঁজার কোনও ঠাঁই নেই। অসহায় ভাবে কাকভেজা হওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই। একে তো দুর্গম পথ, শ্যাওলা জমা পাথরে একটু পিছলে গেলেই গভীর খাদে তলিয়ে যাওয়ার হাতছানি। পথের মাঝে বন্য জন্তুদের আতিথেয়তা তো আছেই। চিতাবাঘ, হাতি, অজগর, বাইসন কে নেই! একবার দেখা হলে পোস্ট অফিসের রানার বলে রেয়াত করবে না বাবুরা। বক্সায় পৌঁছেই যে নিস্তার আছে এমন নয়। কারণ বক্সার থেকেও ওপরে রয়েছে লেপচা খা, চুনাভাটির মতো বেশ কিছু গ্রাম। শুনলে হয়তো অনেকে অবাক হবেন আস্ত একটা গ্রাম পঞ্চায়েতই রয়েছে ওই দুর্গম পাহাড়ের ওপর। সেইসব জনপদের মানুষের সঙ্গে সমতলের সভ্য পৃথিবীর যোগসূত্রের মাধ্যম একমাত্র এই রানার।
তবে মজা করে উনি বলছিলেন, ডিজিটাল ইন্ডিয়া হওয়ায় বলতে পারেন আমাদের কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়েছে। আগে দূর দূরান্ত থেকে অনেক মানি অর্ডার আসত। পাহাড়ের অনেক মানুষ ওই মানি অর্ডারের অপেক্ষায় হাপিত্যেস করে বসে থাকতেন। এখন অনেকেই গুগল পে, ফোন পে-র মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
তবে সেই রানার আর এই রানারের একটা তফাৎ আছে। তার ভয় ছিল ‘কখন সূর্য ওঠে’। আর এই রানারের ডেডলাইন ঠিক উল্টো। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ার আগেই তাকে ফিরে আসতে হবে। কারণ দিনের বেলায় জঙ্গলের ভেতর গা ঢাকা দিয়ে থাকলেও সন্ধে হলেও গজ মহারাজ বা চিতা বাবুরা সান্ধ্য ভ্রমণে বেরিয়ে পড়বেন।
সেই রানারের মতোই এই রানারের দুঃখের কথাও জানবে না কেউ শহরেও গ্রামে। এর কথাও ঢাকা পড়ে থাকবে কালো রাত্রির খামে।
