সরল বিশ্বাস
যে যাই বলুন, হুমায়ুন কবীরকে আমার কিন্তু বেশ লাগে। না, আইপিএস হুমায়ুন নন, ইনি মুর্শিদাবাদের হুমায়ুন। বাংলার রাজনীতিতে যদি হাতে গোনা পাঁচজন মাস লিডার থেকে থাকেন, তাঁদের একজন অবশ্যই এই হুমায়ুন।
কে কত জনপ্রিয়, ভোট এলে বোঝা যায়। দলের টিকিট পেয়ে যিনি এক লাখ ভোটে জিতছেন, তিনি একবার নির্দল হয়ে দাঁড়ান। পাঁচ হাজার ভোটও পাবেন কিনা সন্দেহ। সেখানে হুমায়ুন দলের পরোয়া করেন না। প্রতীকের পরোয়া করেন না। তিনি একাই রাজা।
এবারের নির্বাচনের কথাই ধরুন। একসঙ্গে দুটি কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে পড়লেন। নওদা আর রেজিনগর। দুটিতেই বিরাট ব্যবধানে জয়ী। কারও সঙ্গে জোট করার দরকার পড়েনি। বিজেপি, তৃণমূল, কংগ্রেস, বাম— সবাইকেই অনেক পিছনে ফেলে তিনি জয়ী। পুলিশের আনুকূল্য পেয়েছেন, এমনটাও বলা যাবে না। বরং, পুলিশের কাছ থেকে বারবার হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে।
রাজনীতির আঙিনায় এই হুমায়ুন প্রায় সব ঘাটেই জল খেয়েছেন। কংগ্রেসের টিকিটে বিধায়ক হয়েছেন, তৃণমূলের টিকিটেও বিধায়ক হয়েছেন, নির্দল হয়ে দুটি কেন্দ্রে জয়ী, বিজেপির হয়ে লোকসভাতেও লড়েছেন। যাননি শুধু বামে। কিন্তু মহম্মদ সেলিমকেও তাঁর ‘মন বুঝতে’ যেতে হয়েছিল।
হুমায়ুনের ক্যারিশ্মা বুঝতে গেলে ফিরে যেতে হবে দশ বছর আগে। ২০১৬–র নির্বাচনে তিনি সবার কাছেই ব্রাত্য। তৃণমূল টিকিট দিল না। কংগ্রেসও ফিরিয়ে নিল না। কী করবেন? একাই দাঁড়িয়ে পড়লেন নির্দল হয়ে। হেরেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সবার বিপক্ষে লড়ে প্রায় ৭৫ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। বাংলায় আর কোন নির্দল প্রার্থী ৭৫ হাজার ভোট পেতে পারেন? দূরবিন লাগিয়েও এমন কাউকে দেখা যাচ্ছে?
বাংলায় নির্দল হয়ে জেতার নজির কম নেই। তাঁর জেলা মুর্শিদাবাদেই অধীর চৌধুরি মাঝে মাঝেই নির্দল দাঁড় করাতেন। কখনও নিয়ামত শেখ, কখনও মনোজ চক্রবর্তী, কখনও অপূর্ব সরকারকে জিতিয়ে এনেছে। কিন্তু তাঁদের পিছনে অধীর ছিলেন। কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি ছিল। কিন্তু হুমায়ুনের পিছনে কেউ ছিল না।
এবার শুভেন্দু অধিকারী দুটি জায়গায় জিতেছেন। ভবানীপুরে হারিয়েছেন মমতা ব্যানার্জির মতো হেভিওয়েট প্রার্থীকে। কিন্তু বিজেপির দলীয় প্রতীক আর কেন্দ্রের আনুকূল্য না থাকলে? জেতা তো দূরের কথা, তিরিশ হাজার ভোট পেতেন কিনা সন্দেহ। সেখানে হুমায়ুন একাই দেখিয়ে দিচ্ছেন, তাঁর কলজের জোর কতটা।
হয়তো বলতে পারেন, মুসলিম ভোট। হয়তো বলতে পারেন, সাম্প্রদায়িক প্রচারের ফল। কিন্তু ওই দুই কেন্দ্রের অধিকাংশ প্রার্থীই তো মুসলিম। কই, তাঁরা তো মুসলিম সমাজের আস্থা অর্জন করতে পারলেন না! তাঁরাও তো সাম্প্রদায়িক তাস কম খেলেননি। আসলে, হুমায়ুনের মধ্যে কিছু একটা আছে, যা বাকিদের মধ্যে নেই।
এবার নির্বাচনের আগে তিনি বলে বসলেন, ‘মমতা ব্যানার্জি যদি বিধানসভায় যেতে চান, তিনি যদি রেজিনগর থেকে লড়তে চান, আমি সিট ছেড়ে দিতে পারি। তাঁকে জিতিয়ে বিধানসভায় পাঠানোর দায়িত্ব আমার।’ কজনের এই বুকের পাটা আছে? সত্যিই, মমতার কী দুর্দিন। হুমায়ুন কবীর কিনা বলছেন, তাঁকে জেতানোর দায়িত্ব আমার! হাতি কাদায় পড়লে এমন কতকিছুই না হজম করতে হয়!
নন্দীগ্রামে বিজেপি একতরফা জিতবে। কিন্তু রেজিনগর! লড়াইটা খুব সহজ হবে না। পুলিশকে শাসকদল যেভাবে ব্যবহার করছে, তা মোটেই সুস্থ প্রশাসনের লক্ষণ নয়। একের পর এক পুরনো মামলায় যেভাবে হুমায়ুনের সঙ্গীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, ভয় দেখানো হচ্ছে, অন্তত নৈতিকভাবে বিজেপি হেরে বসে আছে। রাজ্যে দুশোর বেশি আসন। বিরোধী বলে কার্যত কিছু নেই। তারপরও শাসক দল হুমাযুনকে যেভাবে ভয় পাচ্ছে, তা শাসকদলের দৈনতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। যদি হুমায়ুন পুত্র নাও জেতেন, নিশ্চিতভাবেই দ্বিতীয় স্থানে থাকবেন। বাকি সব দল অনেক পিছিয়ে থাকবে।
যাই বলুন, হুমায়ুন একটা চরিত্র। যাঁর কাছে বাকিদের অনেক ম্লান মনে হয়।
