১৫ আগস্টের আড়ালে এক কিশোর কবির আগমনবার্তা

শরিফুল ইসলাম

১৫ আগস্ট মানেই পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, লালকেল্লা, স্বাধীনতার স্মৃতি। সেই বিপুল জাতীয় উৎসবের আড়ালে প্রায় নিঃশব্দে থেকে যায় আর একটি জন্মদিন—সুকান্ত ভট্টাচার্যের। ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট জন্মেছিলেন তিনি। অথচ এই দিনটির সঙ্গে তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ের একটি অদ্ভুত, করুণ যোগও রয়েছে। স্বাধীনতা দেখার কয়েক মাস আগেই, মাত্র কুড়ি বছর বয়সে, থেমে গিয়েছিল তাঁর জীবনের স্পন্দন।

শেষ কয়েকটি সপ্তাহ কেটেছিল যাদবপুর টিবি হাসপাতালে। ১৯৪৭ সালের ১ এপ্রিল সেখানে ভর্তি হন সুকান্ত। ছিলেন ‘লেডি মেরি হারবার্ট’ ব্লকের এক নম্বর বেডে। ৮ এপ্রিল বন্ধু অরুণাচলকে লেখা চিঠিতে হাসপাতালের ঠিকানার সঙ্গে যেন নিজের নিঃসঙ্গতার ঠিকানাটিও লিখে দিয়েছিলেন—‘‌সাতদিন কেটে গেল এখানে এসেছি। বড় একা একা ঠেকছে এখানে। সারাদিন চুপচাপ কাটাতে হয়।’‌ বিকেলের অপেক্ষায় থাকতেন, কেউ যদি আসে।

কী আশ্চর্য—একজন কবি, যার কবিতার কেন্দ্রে ছিল জনতা, মিছিল, শ্রমিক, কৃষক, ক্ষুধার্ত মানুষ, যুদ্ধবিরোধী স্বপ্ন; সেই মানুষটিই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে লিখছেন একা থাকার কথা। হাসপাতালের ঘর যেন তাঁকে হঠাৎ পৃথিবীর কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। অথচ মন তখনও বাইরে। বন্ধুদের কথা মনে পড়ছে, কিশোর বাহিনীর কথা মনে পড়ছে, কাজের কথা মনে পড়ছে, পৃথিবীর কথা মনে পড়ছে।

তাঁর কৈশোরের কলকাতা দেখেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, সাইরেন, জাপানি বোমার আতঙ্ক, রাতের ব্ল্যাকআউট। ১৯৪২ সালে অরুণাচলকে লেখা এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন কলকাতা যেন ধীরে ধীরে ‘‌ধ্বংসের সমুদ্রে’‌ তলিয়ে যাচ্ছে। লিখেছিলেন, ‘‌বাঁচতে ইচ্ছা করে, কিন্তু নিশ্চিত জানি কলকাতার মৃত্যুর সঙ্গেই আমিও নিশ্চিহ্ন হব।’‌

সেই চিঠি লেখা হয়েছিল মৃত্যুর বহু আগে। কিন্তু পরে ফিরে তাকালে মনে হয়, তরুণ কবির ভিতরে মৃত্যুচেতনার বীজটি তখনই জন্ম নিয়েছিল। যুদ্ধ, ধ্বংস, মানুষের মৃত্যু—এসব তাঁর কাছে কখনও দূরের ইতিহাস ছিল না। কলকাতার আকাশে সাইরেন বাজলে যে আতঙ্ক নামত, সেটিও তাঁর কবিসত্তার অংশ হয়ে উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, ব্ল্যাকআউট, বোমার ভয়—এই সমস্তই তাঁর সাহিত্যিক পৃথিবীকে নির্মাণ করে।

কিন্তু ১৯৪৭-এর যাদবপুরে এসে যুদ্ধ যেন অন্য রূপ নিল। বাইরে তখন স্বাধীনতার প্রস্তুতি, দেশভাগের অশনি, দাঙ্গার ক্ষত। আর হাসপাতালের এক নম্বর বেডে শুয়ে থাকা সুকান্ত নিজের শরীরের ভিতরেই লড়ছেন অন্য এক যুদ্ধে। রোগ তাঁকে ক্রমশ গ্রাস করছে। ডিসেম্বরের এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘‌আমার রোগ এমন একটা বিশেষ সন্দেহজনক অবস্থায় পৌচেছে’‌—তারপর সম্পূর্ণ শয্যাগত থাকার কথা জানিয়েছিলেন।

কিন্তু অসুস্থ শরীরেও তাঁর কৌতুক আছে, বন্ধুর প্রতি অভিমান আছে, বাইরে পৃথিবীর প্রতি টান আছে। মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া মানুষটির সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা যেন মৃত্যু নয়—জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া। ৯ মে তিনি লিখেছিলেন তাঁর শেষ কবিতা, ‘হে মহাজীবন’। আর মাত্র চার দিন পর, ১৩ মে ১৯৪৭-এর ভোরে থেমে গেল সেই জীবন। বয়স তখন কুড়ি।

স্বাধীনতার জন্মের মাত্র তিন মাস আগে মৃত্যু হয়েছিল তাঁর। তাই ১৫ আগস্টের আলোয় দাঁড়িয়ে সুকান্তকে মনে করলে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য চোখে পড়ে—যে কবি নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই পৃথিবীর স্বাধীনতার সূর্যোদয় তিনি দেখে যেতে পারেননি।

১৫ আগস্ট তাই শুধু স্বাধীন ভারতের জন্মদিন নয়। এক তরুণ কবির জন্মদিনও। যে কবি লিখেছিলেন মানুষের জন্য, ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য, ভবিষ্যতের জন্য। তাঁর জীবন থেমেছিল যাদবপুরের হাসপাতালের এক নিঃসঙ্গ ঘরে; কিন্তু তাঁর স্বপ্ন থামেনি।

আজও ১৫ আগস্টের পতাকার নীচে কোথাও যেন শোনা যায় সেই তরুণ কণ্ঠ—
হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়—
এবার কঠিন, কঠোর গদ্যে আনো।

সুকান্তের জীবনের শেষ দিনগুলির দিকে তাকালে বোঝা যায়, সেই ‘কঠিন গদ্য’-এর ভিতরেই তিনি নিজের মৃত্যুকেও রেখে গিয়েছিলেন—নিঃশব্দে, নির্ভয়ে, মানুষের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে।

Previous post হিটলারকে প্রত্যাখ্যানের সেই দিনটাও কিন্তু ১৫ আগস্ট
Next post বেঙ্গল টাইমস। ই ম্যাগাজিন। স্বাধীনতা সংখ্যা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *