রক্তিম মিত্র
একটা চালু কথা আছে, সিপিএম–কে রাস্তায় পাওয়া যায় না, ফেসবুকে পাওয়া যায়। কথাটা মূলত বিরোধীরাই বলে থাকেন। আসলে, রাস্তার আন্দোলন গণমাধ্যমে সেভাবে উঠে আসে না। আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় এলেও যাঁরা বাম অনুরাগী, মূলত তাঁরাই দেখতে পান।
কিন্তু এই ফেসবুকে থাকাটা দলকে কতটা এগিয়ে দিচ্ছে, আর কতটা পিছিয়ে দিচ্ছে? কোনও সন্দেহ নেই, অনেক যথার্থ বাম মনস্ক, চিন্তাশীল মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়। তাঁদের একেকটি পোস্ট সত্যিই বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত রুচির পরিচয় বহন করে। মনে হয়, সত্যিই চিন্তা চেতনায় এঁরা অনেক অগ্রণী। এঁরা সমাজকে নতুন দিশা দেখাতে পারেন।
এটা মু্দ্রার একটা পিঠ। কিন্তু অন্য পিঠটা বেশ ভয়ঙ্কর। এবং বলাই বাহুল্য, তাঁরাই সংখ্যায় ভারী। তাঁদের পোস্ট বা কমেন্ট পড়লে সত্যিই করুণা হয়, কখনও কখনও আবার রাগও হয়। মনে হয়, এমন সমর্থক থাকলে সেই দলের শূন্যই হওয়া উচিত। এমন সমর্থক দলের সম্পদ নন, বিরাট এক বোঝা। এই মস্ত ‘বোঝা’কেও বয়ে চলতে হয়।
শরিক দল সম্পর্কে এঁদের এতটাই বিদ্বেষ, তৃণমূল বা বিজেপি সম্পর্কেও এতটা নেই। এঁরা বিশ্বাস করেন, শরিকরা আছে বলেই সিপিএম ক্ষমতায় আসছে না। শরিকরা না থাকলেই ধেই ধেই করে সিপিএম একাই ক্ষমতায় চলে আসত। এঁরা বিশ্বাস করেন, কোনও শরিকের পায়ের তলায় মাটি নেই। সংগঠন বলে কিচ্ছু নেই। সব শরিকরা তৃণমূলকে ভোট দেয়।
মাঝে মাঝে ভাবি, এঁদের এই চিন্তার উৎসটা কী? যখন ফেসবুক ছিল না, তখনও এমন কথা বলা লোকের অভাব ছিল না। এখন ফেসবুকে জ্ঞান দেওয়ার সুযোগ বেড়েছে, যা খুশি লিখে দেওয়া যাচ্ছে। কোনও সন্দেহ নেই, সিপিএম নেতৃত্ব অনেক সংযত। অন্তত প্রকাশ্যে বেফাঁস কথা তেমন বলেন না। প্রকাশ্যে বাম ঐক্যের কথাই বলেন। কিন্তু যেটা টিভির ব্যুমের সামনে বলছেন, দলের অভ্যন্তরেও তেমনটাই বলেন তো! মনে হয় না। নইলে, এই ফেবু পন্থীরা এমন বেলাগাম হওয়ার ‘কুশিক্ষা’ পেতেন না। এইসব কথা তাঁরা তৃণমূল বা বিজেপির কাছ থেকে শেখেননি। টিভি থেকেও শেখেননি। তাঁরা দলীয় স্তরে কোথাও একটা এইসব কথা অনর্গল শুনেছেন। সেভাবেই নিজেদের মস্তিষ্ককে নির্মাণ করেছেন। নেতাদের মতো সংযম হয়তো নেই। তাই ফেবুকে লিখে বসছেন। খুব সহজ কথা, এঁদের অধিকাংশের মধ্যে বামপন্থী চেতনাই নেই। আদৌ এঁরা শরিকদের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন কিনা সংশয় থেকেই যায়।
সম্প্রতি রেজিনগর উপনির্বাচনকে ঘিরে সেটা আবার প্রকাশ্যে এল। এই আসনটি আগে নওদা বিধানসভার মধ্যে ছিল। সেখান থেকে দীর্ঘদিন আরএসপি লড়াই করে এসেছে। দীর্ঘদিন বিধায়ক ছিলেন প্রবাদপ্রতিম জয়ন্ত বিশ্বাস। ২০১১ থেকে রেজিনগর আলাদা কেন্দ্র। পরের তিনবারও আরএসপি–ই লড়েছে। এবার সিপিএম দাবি করে বসল, এই আসনে তারা লড়বে। আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হতেই পারত। কিন্তু বোঝাপড়ায় কোথাও একটা ঘাটতি থেকে গেল। দুপক্ষই প্রার্থী দিল। পরে প্রতীক নিয়ে সমস্যা হওয়ায় আরএসপি সরে দাঁড়াল।
কিন্তু তারপরেও নানা আক্রমণ ধেয়ে আসছে। আরএসপি–র হয়ে যিনি মনোনয়ন জমা করেছিলেন, সেই প্রার্থীর একটা ইন্টারভিউ দেখছিলাম। বেশ দায়িত্বশীল নেতার মতোই কথা বলছিলেন। বাম ঐক্যের পক্ষেই বলছিলেন। অধিকাংশ কথাই বেশ ইতিবাচক। সিপিএম মনস্ক লোকেদেরও খারাপ লাগার কথা নয়। কিন্তু ইন্টারভিউ দেখার বা শোনার সময় কোথায়? একের পর এক গালাগাল কমেন্ট বক্সে ভেসে এল। গোটা ইন্টারভিউ শোনার পর বুঝতে পারলাম না, গালাগাল খাওয়ার মতো তিনি কী এমন কথা বলেছেন। এক–দুটো বাক্যে হয়তো একমত না হতে পারেন, তাই বলে এমন নিম্নস্তরের আক্রমণ?
কমেন্টগুলো পড়লে মনে হবে, আরএসপি–কে ছাড়া হত হলেই এই সিট নাকি জিতত না। এবার সিপিএমের প্রতীকে লড়াই। জয় অনিবার্য। এঁরা কোন জগতে বাস করেন? রাজ্যে কটা কেন্দ্রে আরএসপি বা ফরওয়ার্ড ব্লক ছিল? অধিকাংশ আসনেই তো সিপিএম লড়াই করেছে। সেই তো একটি আসন এসেছে। অধিকাংশ জায়গায় গড় ভোট সেই দশ হাজারের আশেপাশে। পাঁচ থেকে ছয় পারসেন্ট। লোকসভাতেও সিপিএম অর্ধেকের বেশি আসনে লড়েছে। জেতা তো দূরের কথা। কটা আসনে দশ পারসেন্টের বেশি ভোট এসেছে?
এই সহজ সত্যিটা এই ফেবু পন্থী বাম কর্মীরা বুঝতেই চান না। শরিকদের গালমন্দ করেই যত আনন্দ। সেটাও যদি তথ্যের ভিত্তিতে হত, তাহলেও বুঝতাম, কিছুটা পড়াশোনা আছে। এঁরা অশোক ঘোষ বা ত্রিদিব চৌধুরির নামটুকুও শোনেননি। এমনকী বিনয় চৌধুরির নামটুকুও শুনেছেন বলে মনে হয় না। এঁদের কাছে কলকাতাও যা, কোচবিহারও তাই। এঁদের কাছে বর্ধমানও যা, বালুরঘাটও তাই। এই কুপমণ্ডূকদের জগৎ ফেসবুকেই শুরু, ফেসবুকেই শেষ।
একটা ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া যাক। কোচবিহার জেলা বরাবরই ফরওয়ার্ড ব্লকের দুর্গ। এমনকী, ২০১১ তেও এই জেলায় চারটি আসনে ফব প্রার্থীরা জিতেছিলেন (কোচবিহার উত্তর, কোচবিহার দক্ষিণ, দিনহাটা, মেখলিগঞ্জ)। অনেকে বলতেই পারেন, সিপিএমের জন্যই জিতেছিলেন। অবশ্যই সিপিএমের অবদান ছিল। কিন্তু যে চারটি আসনে সিপিএম নিজে লড়াই করেছে, সেই মাথাভাঙা, শীতলকুচি, নাটাবাড়ি, তুফানগঞ্জে কিন্তু সিপিএমকে বড় ব্যবধানেই হারতে হয়েছিল। সিপিএম অন্যদের জেতাতে পারে, নিজেরা জিততে পারে না কেন? কারণ, ওই চার জায়গায় ফব ভোট আর সিপিএম ভোট যোগ হয়েছিল। ওই চার জায়গায় ফব–র একটা নিজস্ব ভোট ব্যাঙ্ক ছিল। ২০১৬তে জেলায় একটি আসনেই বামেরা জয়ী হয়েছিল, কোচবিহার উত্তর। ২০১৮–র পঞ্চায়েতে এই বিধানসভার দুটি অঞ্চলে ফব সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। জেলায় আর কোথাও বামেরা পঞ্চায়েত দখল করতে পারেনি। সিপিএম অন্য চারটি আসনের মধ্যে যে কোনও একটি নিতেই পারত। কিন্তু জেলা নেতৃত্বের জেদ, তাঁরা কোচবিহার উত্তরই নেবেন। কিছুটা জেদ করে এবার কোচবিহার উত্তরে নিজেদের প্রার্থী দাঁড় করাল সিপিএম। ফল কী হল? সেই পাঁচ হাজার ভোট। আসনটা ফবকে ছাড়লে অন্তত দশ হাজার ভোট আসতে পারত। এমনকী ফব যদি নিজেদের সিম্বলে এককভাবে লড়ত, তাহলেও অন্তত পাঁচ হাজারের বেশি ভোট পেত।
কোনও সন্দেহ নেই, শরিকদের সেই আগের শক্তি নেই। সংগঠন অনেকটাই দুর্বল। কর্মীরা আগের মতো সক্রিয় নন। সেটা তো সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সিপিএমের প্রভাব ও সংগঠন যে জায়গায় ছিল, এখন কি তার দশ শতাংশ আছে? জেলায় জেলায় যদি খোঁজ নিয়ে দেখেন, শরিক দলের কর্মীরা হয়তো কিছুটা নিষ্ক্রিয়, হয়তো মিটিং মিছিল আগের মতো হয় না। কিন্তু তাঁদের অধিকাংশই কিন্তু ঝান্ডা বদল করেননি। দলের নীরব সমর্থক হয়ে আছেন। অন্তত বাম প্রার্থীকে ভোটটুকু দেন। কিন্তু বিভিন্ন ব্লকে খোঁজ নিন। সিপিএমের যাঁরা একসময়ের দোর্দন্ডপ্রতাপ জোনাল কমিটি, লোকাল কমিটি আলো করে থাকতেন, তাঁদের অনেকেই অন্য শিবিরে ভিড়ে গিয়েছেন। এক সময় মার্কস কপচানো সেই নেতা হাতে চারটি, পাঁচটি আঙটি পরে দিব্যি জয় শ্রীরাম বলছেন। কুড়ি বছর আগে যাঁরা জোনাল স্তরে ছিলেন, এখন তাঁরা কোথায় আছেন, একটা সমীক্ষা হোক, তাহলেই ছবিটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। শরিক দলের শক্তিহ্রাস হয়েছে, কিন্তু এতটা অধঃপতনও হয়নি।
প্রশ্নটা খুব সহজ, রেজিনগরে যদি আরএসপি দাঁড়াত, কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত? ফেসবুক দেখে মনে হচ্ছে, এতদিনে নিজেদের প্রতীক পেয়ে সিপিএম দারুণ উজ্জীবিত। জয় যেন সময়ের অপেক্ষা। দশ হাজার পেরোয় কিনা, দেখার অপেক্ষা রইল।
