মাটির গন্ধ মাখা, অন্য এক নানা

অরিন্দম সরকার

প্রিয় নানা,

গত কয়েকদিনে তোমার বেশ কিছু ভিডিও দেখে ফেললাম। ইউটিউবের দৌলতে অন্তত একটা সুবিধা হয়েছে। চাইলেই পুরনো ছবি দেখা যায়। চাইলেই পুরনো কোনও ইন্টারভিউ শোনা যায়। কেউ চলে গেলে তাঁর ফেলে আসা জীবনে আরও বেশি করে উঁকি দিতে ইচ্ছে করে। হয়তো এটাও একধরনের শ্রদ্ধার্ঘ্য।

তোমার সঙ্গে আমার কোনও ব্যক্তিগত পরিচয় নেই। থাকার কথাও নয়। কোনও দিন তোমার সঙ্গে এক কাপ চা খেতে খেতে গল্প করিনি। কোনও অনুষ্ঠানে তোমাকে সামনে থেকে দেখেছি, এমন স্মৃতিও নেই। অথচ তোমাকে নিয়ে লিখতে বসলে বারবার নিজের জীবনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। ছেলেবেলার কথা, বাবার কথা, মায়ের কথা, এমনকী আমার নিজের ছেলেমানুষির কথাও। না থেকেও পরতে পরতে তুমি থেকে গেছ।

আমার বেড়ে ওঠা মফস্বলে। সেই বেড়ে ওঠার দিনগুলোয় অমিতাভ কিছুটা যেন দূরে। ভিডিও হলে রমরম করে চলছে মিঠুন চক্রবর্তীর ডিস্কো ড্যান্সার, ওয়াক্ত কি আওয়াজ, ডান্স ডান্স। কখনও আবার অমিতাভের পুরনো ছবি— দিওয়ার, মর্দ, শোলে। এরই ফাঁকে মাঝে মাঝে উঁকি মারেন জিতেন্দ্র, ধর্মেন্দ্ররা। নয়ের দশকে উঠে এলেন তিন খান— আমির, সলমন, শাহরুখ। তারও পরে অক্ষয় কুমার, সুনীলরা শেঠিরা। নায়ক বলতেই কতগুলো চেনা ফর্মুলা ভেসে উঠত। ঢিসুম ঢিসুম মার, নায়িকার কোমর জড়িয়ে নাচ, আরও কত কী। কিন্তু তুমি আমাদের চেনা নায়কের সংজ্ঞাটাই বদলে দিয়েছ। বুঝিয়ে দিয়েছ, নায়ক হওয়ার জন্য সুঠাম শরীর, ঝকঝকে চেহারা কিংবা নায়িকার কোমর জড়িয়ে নাচার প্রয়োজন নেই। সত্যি কথা বলতে কী, প্রথম প্রথম তোমাকে যে খুব গুরুত্ব দিতাম, তাও নয়। মনে হত, এ নাচতে পারে না, দেখতে সুন্দর নয়। একে দিয়ে বেশিদিন চলবে না।

বাবা খুব একটা সিনেমার পোকা ছিলেন না। কিন্তু ভালো অভিনয় দেখলে তাঁর চোখমুখ বদলে যেত। সিনেমা দেখে ফেরার পথে তিনি চরিত্রগুলো নিয়ে কথা বলতেন। কে ভালো অভিনয় করল, কে শুধু সংলাপ বলল, আর কে চরিত্রটাকে সত্যি করে তুলল—এসব নিয়ে তাঁর নিজস্ব মতামত ছিল। তখন বুঝিনি, এখন বুঝি, বাবা আসলে অভিনয়ের চেয়ে মানুষকে খুঁজতেন। পর্দায় যে চরিত্রটা দেখছেন, তার মধ্যে কোনও সত্যি আছে কি না, সেটাই ছিল তাঁর কাছে বড় কথা। তোমাকে দেখলে আজও বাবার কথা মনে পড়ে।

ক্রান্তিবীর–‌এর সেই রাগী মানুষটা যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে, তখন তোমার অভিনয় আমাকে মুগ্ধ করে ঠিকই। কিন্তু তোমার চোখেমুখের সেই যন্ত্রণা, সেই অসহায় রাগের মধ্যে আমি অন্য কিছুও খুঁজে পাই। মনে হয়, এই লোকটা শুধু অভিনয় করছে না। সে আমাদের চেনা পৃথিবীর জমে থাকা ক্ষোভগুলোকে ভাষা দিচ্ছে। ‘‌পরিন্দা’‌ ছবিতে তোমার অভিনয়ের মধ্যে যে অন্ধকার, যে হিংস্রতা, যে মানসিক টানাপোড়েন দেখেছি, তা সহজে ভোলা যায় না। ‘‌প্রহার’‌–‌এ তোমার কঠিন মুখের আড়ালে যে শৃঙ্খলা আর যন্ত্রণা ছিল, সেটাও মনে থেকে যায়। আবার ‘‌অব তক ছপ্পন’‌–‌এ তোমার উপস্থিতি একেবারে অন্য রকম। চরিত্রগুলোকে তুমি এমনভাবে জীবন্ত করে তুলতে যে, দর্শক হিসেবে আমরা শুধু তাদের কাজকর্ম দেখি না, তাদের ভিতরের মানুষটাকেও বোঝার চেষ্টা করি। আর ‘‌ওয়েলকাম’‌–‌এর উদয় শেট্টি! সেই রাগী অথচ অদ্ভুত রকমের হাস্যকর মানুষটাকে মনে পড়লে এখনও হাসি পায়। একই অভিনেতা যে এত সহজে দর্শককে ভয় দেখাতে পারেন, আবার হাসাতে পারেন, সেটা তোমাকে না দেখলে হয়তো এতটা বুঝতাম না।

তোমার অভিনয়ের সবচেয়ে বড় গুণ বোধ হয় এই যে, তুমি কখনও শুধু নায়ক হওয়ার চেষ্টা করোনি। তুমি চরিত্র হয়ে উঠতে চেয়েছ। চরিত্রটা সুন্দর কি না, তাকে সবাই ভালোবাসবে কি না, সে পর্দায় কতটা আকর্ষণীয় দেখাবে—এসবের চেয়ে তার ভিতরের সত্যিটা তোমার কাছে বেশি জরুরি বলে মনে হয়েছে।

আমাদের চারপাশে অবশ্য তার উল্টো ছবিটাই বেশি দেখি। সবাইকে সুন্দর দেখাতে হবে। সফল দেখাতে হবে। সুখী দেখাতে হবে। নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করা যাবে না। ব্যর্থতার কথা বলা যাবে না। অথচ জীবন তো এমন নয়। জীবনে ব্যর্থতা আছে, অপমান আছে, ভুল আছে, আবার নিজেকে শুধরে নেওয়ার চেষ্টাও আছে। তোমার চরিত্রগুলো আমাকে সেই অসম্পূর্ণ জীবনটার কথাই মনে করিয়ে দেয়।

আমাদের পাড়ায় একসময় একজন মানুষ ছিলেন। খুব সাধারণ জীবন। সামান্য রোজগার। অথচ পাড়ার কারও বিপদ হলে তিনিই সবার আগে হাজির হতেন। কারও মেয়ের বিয়ে, কারও ছেলের পড়াশোনার খরচ, কারও অসুখবিসুখ—যতটুকু পারতেন সাহায্য করতেন। নিজের বাড়িতে কতটা অভাব, তা নিয়ে কোনও দিন মুখ খুলতেন না। ছোটবেলায় তাঁকে খুব বড় মানুষ বলে মনে হত না। বরং বেশ সাদামাটা, একটু একঘেয়ে ধরনের মানুষ বলেই মনে হত। বড় হয়ে বুঝেছি, লোকটা আসলে কত বড় ছিলেন।

নানা, তোমার গ্রামে ফিরে যাওয়া, কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর কথা যখন পড়ি, তখন সেই মানুষটার কথাই মনে পড়ে। মনে হয়, পর্দার বাইরেও তুমি এমন একটা জীবন বেছে নিতে চেয়েছ, যেখানে মানুষকে তার প্রয়োজনের সময়ে পাওয়া যায়।

আমাদের সময়টা বড্ড অদ্ভুত। একটা ভালো কাজ করার আগেও এখন আমরা অনেক সময় ভাবি, তার ছবি তোলা যাবে কি না। কোথাও সাহায্য করতে গেলে মনে হয়, সেটা জানানো দরকার। না জানালে মানুষ বুঝবে কী করে যে আমি ভালো কাজ করেছি! সোশ্যাল মিডিয়া খুললে তো এমন ছবিরই ছড়াছড়ি। তারকারা আবার এইসব ছবি তোলানোর জন্য লোক ভাড়া করে সর্বক্ষণ তাকে সঙ্গে নিয়ে ঘোরেন। এই অভ্যাসটা আমাদের অজান্তেই বদলে দিয়েছে। আমরা সাহায্যের চেয়ে সাহায্য করার ছবিটাকে বেশি গুরুত্ব দিতে শিখছি। কিন্তু তোমার সেই স্বপ্নের গ্রামের ছবি!‌ সেখানে কীভাবে তোমার দিন কেটেছে?‌ গুগল বাবাজীবনের কাছে অনেক সার্চ করলেও সে কিন্তু খুব বেশি ছবি দেখাতে পারল না। একটা জিনিসই পরিষ্কার, সেই গ্রামে কাটানোটা তোমার বিপণন কৌশল নয়। অন্য কেউ একদিন গ্রামে কাটালে কয়েক হাজার ছবি, রিলস ঘুরঘুর করত।

সেই জায়গায় তোমার জীবনযাপনের কথা আমাকে বিস্মিত করে। এত বড় মাপের মানুষ হয়েও এত সাধারণ থাকা যায়!‌ মুম্বইয়ের ঝলমলে জগৎ ছেড়ে মহারাষ্ট্রের গ্রামের পরিবেশে ফিরে যাওয়া, কৃষক পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, নিজের সঞ্চয়ের বড় একটা অংশ মানুষের প্রয়োজনে বিলিয়ে দেওয়া। রিল নয়, তুমি যেন রিয়েল হিরো। তোমার সব কাজের খবর আমার জানা নেই। জানার কথাও নয়। কারণ, তুমি আড়াল রাখতে জানো। তুমি শিখিয়েছো, সব কাজের বিজ্ঞাপন করতে নেই। তোমার ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গেও আমার পরিচয় নেই। যেটুকু চিনেছি, তাতে এটুকু বুঝি, তুমি মানুষটা আর দশজনের থেকে আলাদা, একেবারেই আলাদা।

আমিও তো চাকরি করি। মাসের শেষে হিসেব মেলাই। বাড়ির খরচ, ভবিষ্যতের চিন্তা, নানা দায়দায়িত্ব—সব মিলিয়ে নিজের জীবনটাই কখনও কখনও বেশ ভারী হয়ে ওঠে। রাস্তায় কোনও অসহায় মানুষকে দেখলে মন খারাপ হয়। খবরের কাগজে কৃষকের আত্মহত্যার খবর পড়লে বুকের মধ্যে একটা চাপা অস্বস্তি তৈরি হয়। কিন্তু পরের দিন আবার নিজের কাজে বেরিয়ে পড়ি। তোমাকে নিয়ে ভাবলে তাই নিজের কাছেই একটা প্রশ্ন ফিরে আসে—আমি কি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু করছি? খুব বড় কিছু নয়। হয়তো কারও পাশে দাঁড়ানো, কোনও অসহায় ছাত্রের বই কেনার ব্যবস্থা করা, বিপদে পড়া কোনও পরিবারের জন্য কয়েকজনকে একজোট করা। হাসপাতালে গিয়ে কোনও চেনা বা অচেনা মানুষকে রক্ত দেওয়া!‌ পাড়ার কোনও বৃদ্ধ মানুষের কাছে গিয়ে তাঁর গল্প শোনা‌!‌ কাজগুলো ছোট হতে পারে। কিন্তু একেবারে কিছুই না করার চেয়ে তো ভালো।

মানুষের সাফল্যের হিসেব করতে বসলে আমরা তার পদবি, বাড়ি, গাড়ি, ব্যাঙ্কের টাকা গুনি। কিন্তু সে জীবনে ক’জন মানুষের কাজে লেগেছে, বিপদের দিনে ক’জন তার নাম মনে করেছে, সেই হিসেবটা করি না। আমার মনে হয়, জীবনের শেষ পর্যন্ত ওই হিসেবটাই বেশি জরুরি।

তাই তোমাকে নিয়ে আমার মুগ্ধতা তোমার তারকাখ্যাতির জন্য নয়। তুমি কত বড় অভিনেতা, কত পুরস্কার পেয়েছ, কত বিখ্যাত মানুষের সঙ্গে কাজ করেছ—এসবের বাইরেও তোমার একটা পরিচয় আছে। তুমি এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের সাফল্যের মধ্যেও গ্রামের মাটি, সাধারণ মানুষের জীবন আর তাঁদের অভাবের কথা ভুলে যেতে চাননি। তবে তোমাকে দেবতা বানাতে চাই না, নানা। তোমারও নিশ্চয়ই ভুল আছে, রাগ আছে, এমন অনেক সিদ্ধান্ত আছে, যার সঙ্গে সবাই একমত হবেন না। মানুষকে ভালোবাসার জন্য তাকে নিখুঁত হতে হয় না। বরং তার অসম্পূর্ণতার মধ্যেও যে ভালো কিছু বেঁচে থাকে, সেটাকেই চিনতে হয়।

তোমার অভিনয় আমাকে আনন্দ দিয়েছে। তোমার চরিত্রগুলো আমাকে ভাবিয়েছে। কিন্তু তোমার জীবন থেকে যে শিক্ষা নিতে চাই, তা খুব সাধারণ। নিজের চারপাশের মানুষের দিকে একটু বেশি করে তাকানো। নিজের সামর্থ্যের মধ্যে অন্যের পাশে দাঁড়ানো। সাফল্যকে এমনভাবে গ্রহণ করা, যাতে তার ভারে মাটির সঙ্গে সম্পর্কটা হারিয়ে না যায়। এই পৃথিবীতে সবাই বড় অভিনেতা হতে পারে না। সবাই বিখ্যাতও হতে পারে না। কিন্তু মানুষ হয়ে ওঠার সুযোগটা সবারই আছে।

আমার বয়স বিয়াল্লিশ। এই বয়সে এসে আর খুব বেশি বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখি না। চাই, জীবনের শেষে ফিরে তাকিয়ে যেন মনে না হয়, শুধু নিজের জন্যই বেঁচে রইলাম। চাই, অন্তত কয়েকজন মানুষ বলতে পারেন, বিপদের সময়ে লোকটা পাশে দাঁড়িয়েছিল। তোমাকে দেখে এই ইচ্ছেটা আরও জোরালো হয়।

তোমার কাছে কখনই কিছু চাওয়ার ছিল না। আজ তো তুমি সব চাওয়া–‌পাওয়ার ঊর্ধ্বে। আপাতত কয়েকদিন তোমাকে নিয়ে বিভিন্ন কাগজে লেখালেখি হবে। অনেক স্মৃতিচারণায় তোমার কথা ফিরে আসবে। তোমার টুকরো টুকরো কথা রিলস হয়ে ঘুরে বেড়াবে। কিন্তু এটাও জানি, সময়ের স্বাভাবিক নিয়মে এই চর্চা একসময় হারিয়েও যাবে। আমরা নতুন কিছু নিয়ে, নতুন কাউকে নিয়ে মেতে উঠব। কিন্তু মন থেকে চাই, তোমার চরিত্রগুলো বেঁচে থাক। তোমার ওই সহজ সরল অনাঢ়ম্বর জীবন বেঁচে থাক। রিলস গুলো হয়তো থাকবে না। কিন্তু এখনও সময় পেলেই যেন তোমার ভিডিওগুলো খুঁজে বেড়াই। পরের প্রজন্মের কাছে তোমার জীবনের কাহিনি রূপকথা হয়ে ফিরে আসুক। তারাও জানুক গ্ল্যামার সর্বস্ব দুনিয়ায় এমন একজন তারকা ছিল, যে মাটির কাছাকাছিই থাকত।

‌‌‌

Previous post বেঙ্গল টাইমস। ই ম্যাগাজিন। ১ অক্টোবর সংখ্যা
Next post বেঙ্গল টাইমস। শারদ সংখ্যার সম্পাদকীয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *