অজয় নন্দী
সেই সাতাত্তরে এসেছিলেন পেলে। পঞ্চাশ বছর পার হতে চলল। এখনও সেই স্মৃতির ঢেঁকুর তোলে কলকাতা। যাঁরা সেই ম্যাচে খেলেছিলেন, তাঁরা যে অনুষ্ঠানেই যান, ঘুরেফিরে সেই পেলে ম্যাচের প্রসঙ্গ এসেই যায়। প্রায় সবার বাড়ির ড্রয়িংরুমেই বেশ বড় করে বাঁধানো সেই ম্যাচের ছবি। যাঁরা খেলেছিলেন, তাঁদের সুখস্মৃতিতে থাকবে, সেটা স্বাভাবিক। যাঁরা দেখেছিলেন, তাঁরাও এখনও সুযোগ পেলেই সেই ম্যাচের গল্প শোনান। আর যাঁদের তখনও জন্মই হয়নি, যাঁরা এখনও পঞ্চাশের নীচে, তাঁরাও এতবার শুনেছেন, সব ঘটনাই বলে দিতে পারবেন। ফুটবল সম্রাট পরেও এই শহরে এসেছেন। কিন্তু তাঁকে ঘিরে সেই উন্মাদনা আর তৈরি হয়নি।
এবার আসছে আস্ত ব্রাজিল দল। সেবার কসমস ক্লাবকে নিয়েই যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল, এবার খোদ ব্রাজিলকে ঘিরে তো উন্মাদনা আরও ছাপিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু কেন জানি না, মনে হচ্ছে, এই ম্যাচ সুপার ফ্লপ হতে চেলেছে। এমন একটা ম্যাচে যদি গ্যালারি ফাঁকা থেকে যায়, সেটা শহরের পক্ষে কম লজ্জার হবে না। কিন্তু আয়োজকদের অদূরদর্শিতায় হয়তো সেটাই হতে চলেছে।
প্রথমত, কলকাতার মোহনবাগান বা ইস্টবেঙ্গলকে ঘিরে যে আবেগ, জাতীয় দলকে ঘিরে কখনই সেই পর্যায়ের আবেগ নেই। তাই কলকাতায় যখন জাতীয় দলের ম্যাচ হয়, অধিকাংশ সময়ে গ্যালারি ফাঁকাই থাকে। একমাত্র দুই দশক আগে ভারত–জাপান ম্যাচকে ঘিরে একটা উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এবার সেটাও চোখে পড়ছে না। কিন্তু এই সহজ সত্যিটা উদ্যোক্তারা বুঝতেই পারছেন না। তাঁরা এমন লাগামছাড়া টিকিটের মূল্য রেখেছেন, যা মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্তের আয়ত্বের বাইরে। গত বছর যখন মেসি এসেছিলেন, তখন দর্শকরা অনেক চড়া দামের টিকিট কেটেছিলেন। কী নিদারুণ স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল, তা আর কারও অজানা নয়। মেসিকে ঘিরে যে উন্মাদনা, ভিনিসিয়াস জুনিয়রদের ঘিরে সেই উন্মাদনা কখনই সেই পর্যায়ে পৌঁছোবে না। নেইমার এলে তবু কথা ছিল। কিন্তু এই ব্রাজিলের ম্যাচ দেখতে ছয় হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটে বাঙালি যাবে, এটা একটু বেশিই আশা করা হয়ে যাচ্ছে।
সরকার খেলার উন্নয়নে যতটা তৎপর, গিমিকের আগ্রহ তার থেকে ঢের বেশি। এসেই যুবভারতীর মুখ থেকে সরিয়ে দেওয়া হল সেই ফুটবলারের মূর্তি। এবার মনে হল, গোটা স্টেডিয়ামকে গেরুয়া করে দিলে কেমন হয়! তাই হল। যুবভারতীর টানেলে ঢোকার মুখে পেলের একটা মস্তবড় ছবি ছিল। কিন্তু সেই ছবি ঢেকে দেওয়া হল। কারণ, পেলের পাশে মমতা ব্যানার্জি ছিলেন। সেই ছবি সরিয়ে কোন ছবি আনা হল? নরেন্দ্র মোদি আর শুভেন্দু অধিকারীর ছবি। খুব ঘটা করে বলা হয়েছিল, মেসি ম্যাচের যে কেলেঙ্কারি, তার তদন্ত হবে। কিন্তু খোদ অরূপ বিশ্বাস শিবির বদলে ঢুকে পড়েছেন অন্য শিবিরে। ছবি তোলার ব্যাপারে নতুন ক্রীড়ামন্ত্রীর আগ্রহ কম নয়। তিনি যেভাবে ভিডিও আর রিলস করায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, নিশ্চিতভাবেই আগের ক্রীড়ান্ত্রীকে ছাপিয়ে গেছেন।
মোদ্দা কথা, একটা ম্যাচ সফলভাবে আয়োজন করতে গেলে যে অভিজ্ঞতা থাকা দরকার, তা এই সরকারের নেই। যে সদিচ্ছা দরকার, সেটাও নেই। কিছু পেটোয়া লোকের ভুলভাল পরামর্শেই চলছেন। ভাবছেন, ব্রাজিলের নামেই হুহু করে টিকিট বিক্রি হয়ে যাবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত যা খবর, তিরিশ হাজার টিকিটও বিক্রি হয়নি। বলা হল, এই ম্যাচের টিকিট কিনলে উরুগুয়ে ম্যাচ ফ্রি। বোঝাই যাচ্ছে, উরুগুয়ে ম্যাচের অবস্থা আরও খারাপ। ক্লাবগুলিকেও টিকিট দেওয়া হয়নি। প্রাক্তন ফুটবলাররাও ব্রাত্য। শেষদিন হয়তো ঢালাও টিকিট বিলি হবে। কিন্তু তাতেও মুখরক্ষা হবে না।
মেসি কাণ্ডে এই শহরের মুখ পুড়েছিল। ব্রাজিল ম্যাচেও মুখ পোড়া শুধু সময়ের অপেক্ষা।
