স্বরূপ গোস্বামী
ধরা যাক, কারও সর্বাধিক রান তিরিশ। তিনি একদিন হঠাৎ করে সেঞ্চুরি করে বসলেন। বা, আগে কোনওদিন দেশের হয়ে বোলিং করেননি, নিয়মিত বোলারও নন। তিনি একদিন পাঁচ বা ছয় উইকেট পেয়ে গেলেন। বা ক্রিকেট ছেড়ে ফুটবলে আসুন। কারও হয়তো একটিও গোল নেই। তিনি হঠাৎ একদিন পাঁচ গোল করে বসলেন।
এবার ক্রিকেট বা ফুটবল ছেড়ে অ্যাথলেটিক্সে আসুন। কেউ কুড়ি ফুট লং জাম্প দেন। হঠাৎ করে দেখা গেল তিরিশ ফুট লাফ দিয়ে ফেলেছেন। ব্যাপারটা কেমন দেখাবে? কেউ হয়তো কুড়ি সেকেন্ডে একশো মিটার ছুটছেন। হঠাৎ, একদিন দেখা গেল, দশ সেকেন্ডেই ফিনিশিং মার্কে পৌঁছে গেলেন। কিছুটা অবাক করে দেওয়ার মতোই ঘটনা।
ক্রিকেট বা ফুটবলে এই জাতীয় ঘটনা যতটা স্বাভাবিক, অ্যাথলেটিক্সে মোটেই তেমন নয়। সাপ লুডোর মতো হঠাৎ কোনও সিড়িকাঠ বেয়ে লম্বা লাফ দেওয়ার তেমন সুযোগ নেই। এখানে উন্নতি হয় ধাপে ধাপে। কিন্তু সম্প্রতি এমনই এক অবাক করার মতোই ঘটনা ঘটেছে জ্যাভেলিনের দুনিয়ায়। উনিশ বছরের এক তরুণ জ্যাভেলিন থ্রোয়ার। নাম ম্যাক্স ডেনিং। এতদিন পর্যন্ত তাঁর সেরা স্কোর ছিল ৭৮.০৭ মিটার। যুব বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে দু’বার রুপো জিতেছেন এই জার্মান তরুণ। কিন্তু আশি মিটারের গন্ডি কখনই টপকাতে পারেননি। হঠাৎই জার্মানির উইন্টার চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি কিনা পেরিয়ে গেলেন ৯০ মিটারের মাইলস্টোন। ছুঁড়লেন ৯০.২০ মিটার। একেবারে চমকে দেওয়ার মতোই ঘটনা। পরের রাউন্ডে ছুঁড়লেন ৮৫.৪৫ মিটার। আগের থেকে হয়তো অনেকটা কম। কিন্তু এটুকু অন্তত বুঝিয়ে দিলেন, আগের থ্রো–টা নেহাত ফ্লুক ছিল না।
নব্বই মিটার। জ্যাভেলিনের দুনিয়ায় বিরাট কঠিন বাধা বলা যাবে না। এই নিয়ে তেইশজন এই মাইলস্টোনে পৌঁছে গেছেন। বছর চারেক আগেও আমরা ছিলাম নেহাত আদার ব্যাপারী। আমরা বলতেই পারতাম, ৯০ মিটারের জাহাজে কে চড়েছে, সেসব খবর নিতে আমাদের বয়েই গেছে। কিন্তু টোকিও অলিম্পিকের একটা জাতীয় সঙ্গীতের সুর যেন অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। জ্যাভেলিনের দুনিয়ায় এখন মুকুটহীন সম্রাট আমাদেরই নীরজ চোপড়া। এশিয়ান গেমসে সোনা, কমনওয়েলথে সোনা— এসব আগেই এসেছিল। আপামর ভারতীয়রা তেমন পাত্তা দিইনি। কিন্তু টোকিও অলিম্পিকের সোনা যেন রাতারাতি আমাদের কুলীন বানিয়ে দিয়েছে। পানিপথের যুবকের দৌড় অলিম্পিকে থেমে যায়নি। কখনও ডায়মন্ড লিগ, কখনও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ— একের পর এক শৃঙ্গে পৌঁছে গেছেন নীরজ।
কিন্তু এত শৃঙ্গ জয়ের পরেও ‘নব্বই মিটার’ যেন ‘অধরা মাধুরী’ হয়েই থেকে গেছে। আন্তর্জাতিক সার্কিটে যাঁদের সঙ্গে তাঁর লড়াই, সেই জ্যাকুব ভাদলেচ, অ্যান্ডার্সন পিটার্স, জুলিয়ান ওয়েবার— এঁরা সবাই একবার না একবার সেই নব্বই মিটারের সীমানা পেরিয়ে এসেছেন। কবে হবে নব্বই মিটার? গত সাড়ে তিন বছরে নীরজ যেখানেই গেছেন, এই একটা নাছোড়বান্দা প্রশ্ন যেন বারেবারেই তাড়া করে বেড়িয়েছে নীরজকে। এত সাফল্যের মাঝেও এই দুটো শব্দ যেন দীর্ঘশ্বাস হয়েই থেকে গেছে।
সেখানে জার্মানির এই অখ্যাত তরুণ! কী অবলীলায় পেরিয়ে গেলেন সেই মাইলস্টোন। কীভাবে পারলেন? অকপট জবাব, ‘আসলে, আমার সামনে তো কোনো লক্ষ্য ছিল না। তাই চাপও ছিল না। নব্বই মিটারের ওই থ্রোয়ের ভিডিও দেখিনি। ইচ্ছে করেই দেখিনি। আশা করছি, ভবিষ্যতেও দেখব না। ওটা ভাবতে গেলেই অহেতুক চাপ বেড়ে যাবে। এখনই এত চাপ ঘাড়ে চাপাতে রাজি নই।’ চাপ নেব না বললেই কি আর রেহাই আছে! ওই একটা থ্রোয়ের পরই যেন রাতারাতি তারকা হয়ে গেছেন, ‘আগে কেউ তেমনভাবে চিনত না। এখন ঘনঘন ফোন বেজে উঠছে। লোকে মেসেজ পাঠাচ্ছে। বুঝতে পারছি, আমাকে ঘিরে একটা অন্যরকম প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমি বাধ্য হয়ে ফোন সাইলেন্ট করে দিয়েছি। কারণ, এখন ভেসে গেলেই মুশকিল।’
কিন্তু এবার তো সামনে প্যারিস অলিম্পিক। সেই ছাড়পত্রও পেয়ে গেছেন। এবার তো প্রত্যাশার পাহাড়প্রমাণ চাপ! তরুণ অ্যাথলিটের কথায়, ‘অলিম্পিক আমার স্বপ্নেরও বাইরে ছিল। তাই প্রাণভরে উপভোগ করব। তারপর যা হওয়ার, হবে।’
ভিনদেশের কত হাজার হাজার তরুণ অলিম্পিকে নামবেন, যে যার মতো করে প্রস্তুতি নিচ্ছেন, স্বপ্নও দেখছেন। কিন্তু ম্যাক্স ডেনিং নামটার সঙ্গে ভারতও কোথাও একটা জড়িয়ে গেছে। তাঁর স্বপ্নপূরণই যে ভারতের স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়ে উঠতে পারে!
