তারুণ্যের জয়গান এখননা হয় মুলতুবিই থাক

স্বরূপ গোস্বামী

সময়টা ২০০৭। ঠিক কয়েক মাস আগেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে বিশ্বকাপ থেকে শোচনীয় বিদায় হয়েছে ভারতের। শুরুতে বাংলাদেশ, পরে শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে একেবারে গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকে গিয়েছিল ভারত। এবার টি২০ বিশ্বকাপ। বোর্ডের মনে হল, এই টি২০ বিশ্বকাপে মহেন্দ্র সিং ধোনির মতো জুনিয়র কাউকে নেতৃত্বে আনলে কেমন হয়!‌

অঙ্কটা সহজ। শচীন বহুকাল আগেই নেতৃত্বকে গুডবাই করেছেন। সৌরভ নেতা হিসেবে প্রাক্তন। দীর্ঘদিন বাইরে থাকার পর দলে ফিরেছেন ঠিকই, কিন্তু নতুন করে তাঁকে নেতৃত্বে ফেরানোয় বোর্ডের সায় ছিল না। রাহুলের নেতৃত্বে বিশ্বকাপে দল চূড়ান্ত ব্যর্থ। তাছাড়া, টি২০ ঘরানায় রাহুলের দলে থাকা নিয়েই সংশয়, সেখানে নেতৃত্ব কিছুটা বাড়াবাড়ি। তাই নেতৃত্বের প্রশ্নে সামনের দিকে তাকাতেই হত।  

ধোনি অধিনায়ক হয়ে শুরুতেই কী করলেন?‌ দাবি করে বসলেন, তিনি শচীন, সৌরভ, রাহুল, কুম্বলে–‌এঁদের কাউকেই দলে চান না। যে ছোকরা সবে আড়াই‌ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছে, যে ছোকরা সবে অধিনায়ক হয়েছে, সে কিনা শুরুতেই এমন দাবি করে বসছে!‌ নির্বাচকদের পক্ষে ব্যাপারটা হজম করা বেশ কঠিনই ছিল। কিন্তু এটা ঘটনা, শচীন, সৌরভ, রাহুলদের ছাড়াই দক্ষিণ আফ্রিকায় উড়ে গিয়েছিল ভারত। ফিরেছিল চ্যাম্পিয়ন হয়েই।

সুভাষ ভৌমিক প্রায়ই একটা কথা বলতেন, ‘‌চললেই পঞ্চানন, না চললেই পাঁচু’‌। ধোনির ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল। ভারত হেরে গেলে বলা হত, বেশি পাকামি, চরম ঔদ্ধত্য। কিন্তু জিতে যাওয়ায় সেটাই হয়ে দাঁড়াল ‘‌মাস্টারস্ট্রোক’‌। সত্যিই কি ধোনি সরাসরি এই তিন সিনিয়রকে বাদ দেওয়ার দাবি তুলেছিলেন?‌ কিছুটা জল্পনা তো ছিলই। কিন্তু ধোনির বায়োপিকের পর এটা অন্তত পরিষ্কার। কারণ, সেই অপ্রিয় সিদ্ধান্তের দায় ধোনি নিজের কাঁধেই নিয়েছিলেন।

টি২০ আসলে তারুণ্যের জয়গান, এখানে বৃদ্ধরা ‘‌অচল পয়সা’‌— এই মিথটা তখন থেকেই জোরালো হয়েছিল। কিন্তু এই ২০২৪ এ এসে হয়তো উল্টো সুরেই গাইতে হবে ভারতীয় বোর্ডকে। ‘‌পুরনো চাল ভাতে বাড়ে’‌ এই প্রবাদকে আবার টেনে আনার তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে। বছর দুই আগে থেকেই বলা হচ্ছিল, বিরাট কোহলি–‌রোহিত শর্মা নয়, টি২০–‌র নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হোক হার্দিক পান্ডিয়ার হাতে। পুরো ২০২৩ জুড়েই কোহলি–‌রোহিতদের ব্রাত্য করেই রাখা হয়েছিল। ধরেই নেওয়া হয়েছিল, তাঁদের আর ফেরানো হবে না।  

কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে আবার যেন উল্টো সুর। আবার দাবি উঠছে, টি২০ তে বিরাট–‌রোহিতদের সামনে রেখেই লড়াই হোক। কারণ, যে হার্দিকের ওপর বাজি ধরা হয়েছিল, সেই ঘোড়া আদৌ কতটা লম্বা রেসের ঘোড়া, তা নিয়েই সংশয়ের মেঘ। শুরুতেই কেউ কেউ তাঁকে কপিলদেবের উত্তরসূরি ভেবে বসেছিলেন। দেখা গেল, কদিন যেতে না যেতেই তিনি টেস্টের আঙিনা থেকে আলোকবর্ষ দূরে। এতটাই চোটপ্রবণ, কখন তিনি সুস্থ হচ্ছেন, সেটাই চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বকাপ চলাকালীন সেই যে চোট পেলেন, কবে ফিরবেন, তা নিয়ে নানা ধোঁয়াশা চলতেই লাগল। প্রথমে শোনা গেল, তিন–‌চার ম্যাচ পরেই ফিরবেন। পরে শোনা গেল, সেমিফাইনালে ফিরবেন। গোটা বিশ্বকাপেই তাঁকে পাওয়া গেল না। ঘটনা হল, তারপর দেশে–‌বিদেশে আরও হাফডজন সিরিজ হয়ে গেল। এখনও ফেরা হয়নি। এমনকী ঘরোয়া ক্রিকেটের বৃত্তেও তিনি নেই। এরই মাঝে বড় চমক দিয়ে আইপিএলের জার্সি বদল। গুজরাট থেকে আবার মুম্বই শিবিরে। কিন্তু দু’‌মাসের এই ম্যারাথন টুর্নামেন্টের পর কতটা ছন্দে থাকবেন, বলা মুশকিল। ফের চোট পেতে পারেন, এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ, এই ঘোড়ার ওপর বাজি রাখতে গেলে সত্যিই সমূহ বিপদ। অন্য কার ওপর ভরসা রাখবেন?‌ যশপ্রীত বুমরা, শুভমান গিল, সূর্য কুমার যাদব— এইসব নামগুলো স্টপগ্যাপ হিসেবে চলতে পারে। রাম না থাকলে সিংহাসনে তাঁর খড়ম চাপিয়ে টুকটাক রাজ্যশাসন করতে পারেন। কিন্তু এখনই এত বড় মাপের টুর্নামেন্টে তাঁদের ওপর ভরসা রাখা কঠিন।

মোদ্দা কথা, সতেরো বছর আগে ধোনির ওপর যে ভরসাটা রাখা গিয়েছিল, এঁদের ওপর সেই ভরসা রাখা সম্ভব নয়। তাই, সতেরো বছর আগে শচীন, সৌরভ, রাহুলদের বাইরে রাখার যে ঝুঁকিটা বোর্ড নিতে পেরেছিল, এখন বিরাট–‌রোহিতদের বাইরে বসিয়ে সেই ঝুঁকি বোর্ড নিতে চাইবে না। একে, একদিনের বিশ্বকাপ হাতছাড়া। এবার টি২০–‌ও যদি হাতছাড়া হয়, বোর্ডের কর্তৃত্ব ও বাণিজ্যে টান পড়বেই। বিরাট–‌রোহিতদের বাদ দিয়ে আনকোরাদের পাঠানো হল কেন, এই প্রশ্ন উঠবেই। তার থেকে বিরাট–‌রোহিতরা থাকা অনেকটা নিরাপদ। জিতলে বলা হবে, বোর্ড বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিল। আর হারলে তার দায়টা সরাসরি বোর্ড বা নির্বাচকদের ওপর পড়বে না। দায়টা বিরাট–‌রোহিতদেরই নিতে হবে।  

তাই তারুণ্যের জয়গান মুলতুবি রেখে বৃদ্ধতন্ত্রে ভরসা রাখা ছাড়া আর উপায় কই!‌ 

Previous post কোয়েস–‌ইমামি বুঝি সর্বহারা!‌
Next post স্মৃতির সরণি:‌ আমাদের সেই সরস্বতী পুজো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *