সরোজ চক্রবর্তী
সময়টা ১৯৫১। কয়েক বছর আগে স্বাধীন হয়েছে দেশ। এমন সময় এশিয়ান গেমসের আয়োজন! সত্যিই, বড়সড় ঝুঁকিই নিয়ে ফেলেছিলেন জওহরলাল নেহরু। এত বড় এক মহাযজ্ঞের দায়িত্ব নিতে গেলে যে ধরনের পরিকাঠামো দরকার হয়, তখন তা গড়ে ওঠেনি। গড়ে তোলার মতো সময়ও পাওয়া যায়নি। শুধু আয়োজন করলেই তো হবে না। ঘরের মাঠে পদক জয়ের লড়াইয়েও মোটামুটি সামনের সারিতে থাকতে হবে। সব ইভেন্টের যে দারুণ প্রস্তুতি হয়েছিল, এমনও নয়। তারপরও সেবার ভারত কিন্তু হতাশ করেনি। সবমিলিয়ে পেয়েছিল ৫১টি পদক। তার মধ্যে ১৫ টি সোনা, ১৬টি রুপো, ২০টি ব্রোঞ্জ।
সবচেয়ে অবাক করার মতো ফল ছিল ফুটবলে। তখনও আমরা খালি পায়েই ফুটবল খেলি। ওই খালি পায়ে খেলেই শৈলেন মান্নার নেতৃত্বে ভারত সোনা জিতেছিল। আগে সেই সোনা জয়ের ধাপগুলো একটু দেখে নেওয়া যাক। ভারতের অভিযান শুরু হয়েছিল কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে। ইন্দোনেশিয়াকে হারিয়েছিল ৩–০ গোলে। গোলদাতা মেওয়ালাল, সিরেগার, বেঙ্কটেশ। পরের ম্যাচে সেই একই ব্যবধানে হারাল আফগানিস্তানকে। এবারও গোলদাতা বেঙ্কটেশ, মেওয়ালাল। সঙ্গে সন্তোষ নন্দী। এবার ফাইনাল। সামনে ইরান। এবার জয় এল ১–০ তে। গোলদাতা মেওয়ালাল। খালি পায়ে ভারতের দুরন্ত ফুটবল সেবার সবাইকেই মুগ্ধ করেছিল। তিনটি ম্যাচেই গোল করেছিলেন শাহু মেওয়ালাল। অ্যান্টনি, শৈলেন মান্না, চন্দন সিং, লতিফ, নুরমহম্মদ, সন্তোষ নন্দী, বেঙ্কটেশ, ব্রুনো, আমেদ খান, মেওয়ালাল, বেঙ্কটেশ। কাকে ছেড়ে কার দিকে তাকাবেন!
এরপর এশিয়ান গেমসে বড় মাপের সাফল্য বলতে সেই ১৯৬২–র জাকার্তা এশিয়ান গেমসে সোনা। সেই দলটাও ছিল তারকাখচিত। সামনে পিকে, চুনী, বলরাম। ভারতীয় ফুটবলের ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর। এর বাইরে এথিরাজ, অরুময় নৈগম। মাঝমাঠে ইউসুফ খান, ফ্র্যাঙ্কো, প্রশান্ত সিনহা, রাম বাহাদুর। আর ডিফেন্সে চন্দ্রশেখর, অরুণ ঘোষ, জার্নেল সিং, আফজল। গোলে থঙ্গরাজ, প্রদ্যোৎ বর্মন। সেবার কিন্তু শুরুতেই ভারত ২–০ তে হেরে গিয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে। কিন্তু তারপরই ঘুরে দাঁড়ানোর শুরু। পরের ম্যাচেই থাইল্যান্ডকে হারাল ৪–০ তে। পিকের জোড়া গোলের পাশাপাশি গোল করেছিলেন চুনী ও বলরাম। পরের ম্যাচে জাপানকে ২–০। গোলদাতা পিকে, বলরাম। সেমিফাইনালে ভিয়েতনামকে ৩–২। চুনীর জোড়া গোলের পাশাপাশি একটি গোল জার্নেলের। এবার ফাইনালে সামনে সেই দক্ষিণ কোরিয়া। প্রথম ম্যাচে যাদের কাছে হারতে হয়েছিল, ফাইনালে তাদের বিরুদ্ধেই মধুর প্রতিশোধ। ভারত জিতেছিল ২–১ গোলে। একটি গোল পিকের, অন্যটি জার্নেল সিংয়ের।
কোন দলটা ভাল? একান্নর নাকি বাষট্টির? এই নিয়ে একটা সুস্থ তর্ক হতেই পারে। তখন আমরা যে জাপান, কোরিয়াকে হারাতাম, আজ তারাই বিশ্বকাপ ফুটবলে চুটিয়ে খেলছে। সেখানে আমরা! ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে সম্প্রতি আমরা একশোর এপারে এসেছি বলে নানা মহলে কত উচ্ছ্বাস। কিন্তু একটা সময় আমরা তো অলিম্পিকে চতুর্থও হয়েছিলাম। দু’বার এশিয়ান গেমসে সোনাও পেয়েছিলাম। ফ্লুকে নয়, বেশ দাপটের সঙ্গেই। এমনকী যদি সত্তরের এশিয়ান গেমসেও দাপটের সঙ্গেই খেলেছিল ভারত। সেবার সেমিফাইনালে হারলেও প্লে অফে জাপানকে হারিয়ে পিকে ব্যানার্জির কোচিংয়ে ব্রোঞ্জ জিতেছিল ভারত। সেই দলটার দিকেও যদি তাকান, একের পর এক সমীহ জাগানোর মতো নাম। সুধীর কর্মকার, নঈমুদ্দিন, আলতাফ, লতিফ, সাবির আলি, শ্যাম থাপা, মনজিৎ সিং, সুভাষ ভৌমিক, অমর বাহাদুর, মগন সিং।
এশিয়ান গেমসে ভারতের সাফল্য বলতে এই তিনবার। তার মধ্যে দু’বার এসেছিল সোনা। একবার ব্রোঞ্জ। কন্তু তারপরও বিরাশির এশিয়ান গেমসের কথা উল্লেখ করতেই হবে। সেবারও আয়োজক ছিল ভারত। যদি প্রস্তুতির নিরিখে দেখা যায়, তাহলে বলতে হবে, সেরা প্রস্তুতি কিন্তু ছিল বিরাশিতেই। পিকে ব্যানার্জি, অরুণ ঘোষ, বাসাদের নিয়ে ছিল টেকনিক্যাল টিম। হঠাৎ করে কয়েকদিনের শিবির করে নেমে পড়া নয়। ছিল দীর্ঘমেয়াদি, আধুনিক মানের প্রস্তুতি। সেবার নেহরু কাপ যেন এশিয়াডের প্রস্তুতিতে প্রাণ এনে দিয়েছিল। সেবার ভারত কোয়ার্টার ফাইনালে সৌদি আরবের কাছে হেরে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেবারের দলটাতেও ছিল চমৎকার ভারসাম্য। পিকে–অরুণ ঘোষ থাকায় দলে ছিলেন একঝাঁক বাঙালি ফুটবলার। ভাস্কর গাঙ্গুলি, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, অলোক মুখার্জি, প্রসূন ব্যানার্জি, প্রশান্ত ব্যানার্জি, সুদীপ চ্যাটার্জি, কার্তিক শেঠ, মিহির বসু, বিদেশ বসু, বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য..কাকে ছেড়ে কার দিকে তাকাবেন! মাঝমাঠ যেন সাজানো বাগান।
আচ্ছা, একান্ন বা বাষট্টির দলের সঙ্গে এই দলের তুলনা করা যাবে? এমনকী, সত্তরের সেই দলের থেকেও এই দলের কোনও তুলনাই চলে না। বিরাশির ধারেকাছেও কি আনা যায়! গোলসংখ্যার নিরিখে মেসি, রোনাল্ডোদের সঙ্গে সুনীল ছেত্রির নাম উচ্চারিত হয়। সুনীলের দীর্ঘ পরিশ্রম, অধ্যাবসায়কে ছোট করছি না। কিন্তু তাঁকে কখনই পিকে–চুনী–বলরামদের একশো মাইলের মধ্যে রাখা যায় না। এমনকী সাতের দশকে সুভাষ ভৌমিক, প্রসূন ব্যানার্জি, সুরজিৎ সেনগুপ্তদের পাশেও বসানো যায় না। বলা যায়, কেউ নেই, তাই সুনীলকে তারকা মনে হয়। আসলে, গত দু’দশকের বেশি সময় ধরে ভারতীয় ফুটবল কিছুটা ওপর চালাকির ওপরই চলছে। ২০০৭ এ দিল্লিতে নেহরু কাপের আসরে হাজির থাকার সুযোগ হয়েছিল। সেবার ভারত চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। কিন্তু কাদের হারিয়ে? এমন এমন দলকে ধরে আনা হয়েছিল, যারা সবদিক থেকেই অনেক পিছিয়ে। ভারত যেন চ্যাম্পিয়ন হতে পারে, সেই কথা ভেবেই এইসব দলকে ধরে আনা হয়েছিল। এখনও সেই চেষ্টার বিরাম নেই। সম্প্রতি ভারত পরপর তিনটে টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হল। চারিদিকে এমন প্রচার হচ্ছে, ভারতীয় ফুটবল বোধ হয় বিরাট উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ তো বটেই কোথা থেকে ভানুয়াতু না কী সব দেশ, যার নামটাও এতদিন শুনিনি, সেইসব দেশকে হারিয়ে প্রবল বিক্রম দেখানো হচ্ছে। বাঁশবনে শেয়াল রাজা হওয়ার এই প্রবণতাটা অনেকদিন ধরেই চলছে। বিদেশি কোচেরাও এমনটাই চাইছেন। ভারতের ফুটবল ফেডারেশনও এমনটাই চাইছে।
সত্যিই কি এবার এশিয়াড ফুটবলে ভারতের খেলার কথা ছিল? ক্রীড়ামন্ত্রকের নিয়ম অনুযায়ী, যেসব দলগত খেলায় এশীয় র্যাঙ্কিং আটের কম, সেইসব খেলাতেই ভারত অংশ নেবে। ফুটবলে এশিয়ায় আমাদের র্যাঙ্কিং এখন ১৮। সেই হিসেবে দল যাওয়ার কথাই নয়। কিন্তু কোচ ইগর স্টিমাক সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করে বসলেন, ভারতীয় দলকে পাঠানো হোক। একে পরপর তিন প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন। বিদেশি কোচ নিজে উদ্যোগী হয়ে সরকারের কাছে আবেদন জানালেন। সেইসঙ্গে ফেডারেশনও তদ্বির করতে শুরু করল। কেন্দ্রীয় সরকারের মনে হল, সবুজ সঙ্কেত দেওয়াই যাক।
সুনীল ছেত্রি এত দিন ধরে খেলছেন। এত এত গোল করেছেন। অথচ, কখনও এশিয়ান গেমসে খেলেননি! এমন একটা আক্ষেপ সুনীলের থাকতেই পারে। সুনীলের কেরিয়ারের দিক থেকে একটা এশিয়ান গেমসে খেলার সুযোগ তাঁর প্রাপ্য। তাই সুনীলের কাছে এটা একটা মাইলস্টোন হলেও হতে পারে। যেসব ফুটবলাররা খেলছেন, তাঁরাও গর্ব করে বলতে পারবেন, আমরা এশিয়ান গেমসে খেলেছি। কিন্তু যে স্বপ্ন হকিকে ঘিরে দেখা যায়, ফুটবলকে ঘিরে আদৌ কি তা দেখা যায়! অতীতে আচ্ছন্ন থাকা নয়। বর্তমানকে কটাক্ষও নয়। কিন্তু আশাবাদী হতে গেলেও বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়েই ভাবতে হয়। চোখে দূরবীন লাগিয়েও খুব উজ্জ্বল স্বপ্ন দেখা যাচ্ছে কি?
