অশ্রুতে মিশে ছিল পাহাড়ের হাসি

অজয় নন্দী

কখনও কখনও একটি সোনা শুধু একটি সোনা নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটা শৈশব, একটা পরিবার, একটা মাটির গন্ধ, অসংখ্য না-পাওয়া, অজস্র ত্যাগ আর ফিরে আসার এক অসম্ভব জেদ। গ্লাসগোর মঞ্চে যখন মীরাবাই চানুর গলায় উঠল সোনার পদক, তখন তাই শুধু একজন ভারোত্তোলক জিতলেন না—জিতে গেলেন মণিপুরের এক প্রত্যন্ত প্রান্ত থেকে উঠে আসা এক মেয়ে।

তারপর বাজতে শুরু করল ‘জনগণমন’।

মীরাবাই দাঁড়িয়ে রইলেন মঞ্চে। সামনে তেরঙ্গা। চারপাশে আলো। আর দু’চোখ বেয়ে নেমে এল জল। সেই কান্না আনন্দের, কিন্তু শুধু আনন্দের নয়। নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকালে হয়তো সেখানে দেখা যায় কত দীর্ঘ একটা পথ। কতবার শরীরকে হার মানাতে হয়েছে, কতবার মনকে বোঝাতে হয়েছে—আরও একবার, আরেকটু। মীরাবাই নিজেই বলেছেন, জাতীয় সঙ্গীত বাজতেই গত কয়েক বছরের সব লড়াই, সব যন্ত্রণা, সব ত্যাগ একসঙ্গে মনে পড়ে গিয়েছিল।

মণিপুরের প্রান্তিক এলাকা থেকে উঠে আসা মেয়েটির কাছে ভারোত্তোলন কখনও সহজ ছিল না। কিন্তু একটা সময় সেই ছোট্ট শরীরটাই যেন হয়ে উঠল অসীম শক্তির প্রতীক। ২০১৪-তে কমনওয়েলথে রুপো, ২০১৮-তে সোনা, ২০২২-তে আবার সোনা। তারপর ২০২৬। গ্লাসগো। ৪৮ কেজি বিভাগ। তৃতীয়বারের মতো সোনা। ইতিহাস বলছে, কমনওয়েলথ গেমসে তিনটি সোনা জেতা প্রথম মহিলা ভারোত্তোলক তিনি।

কিন্তু এই সোনার সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশটি হয়তো ওজনের অঙ্কে নেই। আছে পতাকার দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলার সেই মুহূর্তটায়।

টোকিওতে রুপো জেতার পর মীরাবাইয়ের জীবন বদলে গিয়েছিল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন দেশের ঘরে ঘরে পরিচিত নাম। কিন্তু সাফল্যের পরের পথ কখনও মসৃণ হয় না। প্যারিসে ২০২৪-এ মাত্র এক কেজির জন্য ব্রোঞ্জ হাতছাড়া করে চতুর্থ হয়েছিলেন তিনি। ১৯৯ কেজি তুলেও মঞ্চে উঠতে পারেননি। সেই চতুর্থ স্থানটি হয়তো পদকহীন ছিল, কিন্তু মীরাবাইকে ভেঙে দিতে পারেনি। বরং আরও একবার গড়ে দিয়েছে।

চোট ছিল। ৫০ কেজি বিভাগ থেকে নেমে আসতে হয়েছিল ৪৮ কেজির ইভেন্টে। অর্থাৎ, আসল লড়াই ছিল নিজের ওজনের বিরুদ্ধে। বয়সও যে আর পাশে নেই, সেটাও তিনি জানতেন। তবু ফিরে এসেছেন। নিজেকে আবার তৈরি করেছেন। আর গ্লাসগোতে ৪৮ কেজি বিভাগে মোট ১৯০ কেজি তুলে শুধু সোনা জেতেননি, স্ন্যাচে ৮৫ কেজি এবং ক্লিন অ্যান্ড জার্কে ১০৫ কেজি তুলে নতুন কমনওয়েলথ গেমস রেকর্ডও গড়েছেন।

একজন মানুষকে আমরা সাধারণত তাঁর পদক দিয়ে মাপি। মীরাবাইকে বোধহয় মাপা উচিত তাঁর ফিরে আসার ক্ষমতা দিয়ে। হারার পর আবার দাঁড়ানোর ক্ষমতা দিয়ে। ব্যর্থতার পর নিজের সঙ্গে আবার লড়াই করার সাহস দিয়ে।

গ্লাসগোর মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন তাঁর চোখের জল গড়িয়ে পড়ছিল, তখন হয়তো সেই জলের মধ্যে ছিল মণিপুরের পাহাড়, শৈশবের দিন, পরিবারের মুখ, কোচের পরিশ্রম, চোটের যন্ত্রণা, প্যারিসের হতাশা—আর ছিল এক অদম্য মেয়ের নিজের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি।

আজ সেই অশ্রু আসলে পরাজয়ের নয়। সেই অশ্রু বলে দিচ্ছিল, আমি ফিরেছি।

আর তাই মীরাবাই চানুর এই সোনা শুধু ভারতের পদকতালিকায় আর একটি সোনার সংখ্যা নয়। এটি এক পাহাড়ি মেয়ের জেদ, যন্ত্রণাকে জয় করার গল্প, আর বারবার প্রমাণ করে যাওয়ার গল্প—কিছু মানুষ হারলেও শেষ হয়ে যান না। তাঁরা আবার ওঠেন।

আর উঠে দাঁড়িয়ে পৃথিবীকে জানান—‘‌আমি এখনও আছি।’‌

Previous post প্রশ্নগুলো সহজ, কিন্তু সহজ কাজটাই এতদিন বেশ কঠিন ছিল
Next post পথের বাঁক বদলে দিতে পারে বাঁকিপুর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *