উত্তম জানা
কালিম্পং শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয় কাফের গাঁও। অথচ সেখানে পৌঁছনোর পর মনে হয়, শহরটা যেন বহু দূরে কোথাও পড়ে আছে। মোবাইলের ব্যস্ততা, গাড়ির হর্ন, মানুষের তাড়া—সবকিছু একে একে পিছনে ফেলে পাহাড়ের কোলে এসে দাঁড়িয়েছি। সামনে সবুজের ঢেউ, চারদিকে পাহাড়, আর তার মাঝখানে ছোট্ট এক গ্রাম। কাফের গাঁও।
মাঝবয়সে এসে বুঝেছি, বেড়ানোরও বয়স হয়। একসময় ভ্রমণ মানেই ছিল যত বেশি জায়গা দেখা যায়। সকালে বেরিয়ে সারাদিন ছুটে বেড়ানো, একের পর এক দর্শনীয় স্থান, ছবি তোলা, ফিরে এসে আবার পরের দিনের পরিকল্পনা। এখন আর সেসব ভালো লাগে না। এখন বরং এমন একটা জায়গা চাই, যেখানে কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। যেখানে অলস হয়ে বসে থাকা যায়। কিংবা কোনও নির্দিষ্ট গন্তব্য ছাড়াই হাঁটা যায়। কাফের গাঁও ঠিক তেমনই।
জায়গাটার কথা কয়েক বছর আগেও শুনিনি। লাভার কথা জানতাম, লোলেগাঁওয়ের কথাও জানতাম। বেশ কয়েক বছর আগে লোলেগাঁও গিয়েওছি। কিন্তু তার কাছেই যে এমন একটা নির্জন গ্রাম রয়েছে, তা তখন শুনিনি। কিন্তু ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়ার সুবাদে পাহাড় আর অচেনা পাহাড় নেই। ফেসবুকে বেড়ানোর বিভিন্ন গ্রুপ যেমন আছে, তেমনই ইউটিউবেও নানা ভিডিও আপনার হাতের নাগালে। আপনি একটু ভ্রমণপিপাসু হলে, ভ্রমণের কয়েকটা ভিডিও দেখলে, এমন কত অজানা ঠিকানার হদিশ আপনার মোবাইল বেয়ে এসে যাবে!
কয়েক মাস আগে থেকেই একটা প্রাথমিক পরিকল্পনা। সঙ্গে নিলাম অফিসেরই এক সহকর্মীকে। পাহাড়ি গ্রামে ঘোরার ব্যাপারে তারও আগ্রহ বেশ ভালই। ট্রেনে এনজেপি। সেখান থেকে শিলিগুড়ি জংশন হয়ে শেয়ারে লোলেগাঁও। বাকি পথটুকু নিয়ে গেল হোম স্টে থেকে পাঠানো গাড়ি। হোম স্টেও ছিল যথার্থ হোম স্টের মতোই। অর্থাৎ, ঝাঁ চকচকে বিলাশ বহুল ব্যাপার নয়। বরং, পাহাড়ি আন্তরিকতায় মোড়া। তাঁদের বাড়িতে, তাঁদেরই একজন হয়ে তিনটে দিন কাটিয়ে দেওয়া।
সকালে ঘুম ভাঙল পাখির ডাকে। শহরের অ্যালার্মের সঙ্গে এই ডাকের কোনও তুলনাই হয় না। জানলা খুলতেই ঠান্ডা বাতাস এসে মুখে লাগল। দূরের পাহাড় তখনও মেঘের পাতলা চাদরে ঢাকা। কোথাও কোনও ব্যস্ততা নেই। চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় বসে মনে হল, এতদিন ধরে আমরা আসলে কীসের জন্য এত ছুটেছি? সেদিন কোনও পরিকল্পনা করিনি। শুধু হাঁটতে বেরিয়েছিলাম।
পাহাড়ি গ্রামের রাস্তা ধরে হাঁটার মধ্যে অদ্ভুত এক আনন্দ আছে। রাস্তা কখনও উঠছে, কখনও নেমে যাচ্ছে। দু’পাশে ঘাস, গাছপালা, ছোট ছোট বাড়ি। কোথাও পাহাড়ের ঢালে চাষের জমি, কোথাও বাঁশঝাড়। মাঝেমধ্যে দু-একজন স্থানীয় মানুষের সঙ্গে দেখা। তাদের মুখে তাড়াহুড়োর চিহ্ন নেই। মনে হয়, সময় এখানে অন্যভাবে চলে।
এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখি, নীচে গভীর খাদ। তার ওপারে আরও পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে রোদ আর ছায়ার খেলা। একটু পরেই মেঘ এসে ঢেকে দিল সব। আবার কয়েক মিনিটের মধ্যে মেঘ সরে গিয়ে খুলে গেল সবুজের বিশাল ক্যানভাস। প্রকৃতি যেন নিজের মতো করে ছবি আঁকছে, আবার মুছেও দিচ্ছে।
হাঁটতে হাঁটতে বুঝলাম, এই পথের আসল সৌন্দর্য কোনও নির্দিষ্ট দৃশ্যে নয়। সৌন্দর্যটা লুকিয়ে আছে হাঁটার মধ্যেই। একা হাঁটতে হাঁটতে নিজের সঙ্গে কথা বলার মধ্যে। পাখির ডাক শুনতে শুনতে হঠাৎ কোনও পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে যাওয়ার মধ্যে। কিংবা কোনও কারণ ছাড়াই ভালো লেগে যাওয়ার মধ্যে।
বিকেলের দিকে পাহাড়ের আলো বদলে গেল। দূরের আকাশে কমলা রং ছড়িয়ে পড়ছে। আমি তখন গ্রামের এক নির্জন পথের ধারে দাঁড়িয়ে। আশপাশে কেউ নেই। শুধু বাতাসে পাতার শব্দ। সেই মুহূর্তে মনে হল, জীবনে আসলে খুব বেশি কিছু লাগে না। একটু সময়, একটু নির্জনতা আর সামনে ছড়িয়ে থাকা প্রকৃতি—এই তো!
কাফের গাঁও থেকে ফিরে আসার সময় তাই মনটা অদ্ভুত ভারী হয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল, জায়গাটা শুধু দেখে এলাম না; কিছু একটা সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি। হয়তো নিজের জন্য একটু সময়। হয়তো ভুলে যাওয়া কিছু প্রশ্নের উত্তর।
শহরে ফিরে আবার ব্যস্ততা শুরু হবে। ফোন বাজবে, কাজ জমবে, মানুষ তাড়া দেবে। তবু জানব, পাহাড়ের কোলে এমন একটি গ্রাম আছে, যেখানে একদিন আমি কোনও গন্তব্য ছাড়াই হেঁটেছিলাম।
আর সেই হাঁটায়, অনেকদিন পর, নিজেকেই যেন নতুন করে খুঁজে পেয়েছিলাম।
